অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ

৪ বছরে ১০ কোটি টাকার সম্পদের মালিক মেয়র নজরুল

রানা আহমেদ, সিরাজগঞ্জ
 | প্রকাশিত : ১২ নভেম্বর ২০১৯, ১৮:৫৪

সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া পৌরসভা নানা অনিয়ম-দুর্নীতি ও লুটপাটের আখড়ায় পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে পৌর মেয়র এস এম নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে। পৌর এলাকায় নানা প্রকল্প, এডিপি থেকে মসজিদ-মাদ্রাসা, কবরস্থান, মন্দির ও শ্মশানের নামে বরাদ্দ অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। মাত্র চার বছরের ব্যবধানে তিনি প্রায় ১০ কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। উল্লাপাড়ায় কিনেছেন তিন বিঘা জমি।

গত অক্টোবরে মেয়রের দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাৎ ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নজরে আসে। পরে তদন্তের স্বার্থে দুদক সমন্বিত পাবনা জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক আতিকুর রহমান স্বাক্ষরিত পত্রে মেয়রের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির রেকর্ড পাঠাতে উল্লাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়। এ ঘটনা উল্লাপাড়া উপজেলাজুড়ে টক অব দ্য টাউনে পরিণত হয়।

নজরুল ইসলাম এর আগে পৌরসভার ৪ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ছিলেন ২০০৪ সালে। ২০১৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের সমর্থন নিয়ে নৌকা প্রতীকে মেয়র নির্বাচিত হন পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি নজরুল ইসলাম। দায়িত্ব নেওয়ার চার বছরের মধ্যে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন তিনি। নামে-বেনামে কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন পৌর আওয়ামী লীগের এই সাধারণ সম্পাদক।

পৌরসভার আইনকানুনের কোনো তোয়াক্কা না করে মেয়র ক্ষমতার অপব্যবহার করছেন বলে অভিযোগ করে একাধিক কাউন্সিলর বলেন, কাউন্সিলরদের সঙ্গে কোনো বিষয়ে আলোচনা না করে মেয়র একাই সব কাজ করেন।

তাদের ভাষ্য, চার বছর আগেও সাধারণ জীবনযাপন নজরুল ইসলাম এখন বিলাসবহুল গাড়িতে চড়েন, অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত জমিতে গড়ে তুলছেন নানা প্রকল্প। ঢাকার মাদারটেক, বাসাবো ও আমিনবাজারে কিনেছেন প্লট। চার বছরে নিজ পরিবারের নামে-বেনামে কিনেছেন অসংখ্য জায়গা-জমি ও ফ্ল্যাট। যুক্ত হয়েছেন পরিবহন ব্যবসায়।

ক্যাডার নিয়ে ঘোরারও অভিযোগ উঠেছে মেয়র নজরুলের বিরুদ্ধে। মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি পৌরসভাসহ বিভিন্ন দলীয় অনুষ্ঠানে নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী নিয়ে চলাচল শুরু করেন। এদের ভয়ে পৌরসভার কাউন্সিলররা মুখ খুলতে সাহস পান না।

স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ থেকে জানা যায়, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এডিবি কর্তৃক পৌর এলাকার চর ঘাটিনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাটি ভরাট বাবদ ৫০ হাজার টাকা, ঘাটিনা পশ্চিমপাড়া আজাদ মসজিদের উন্নয়নে ৫০ হাজার টাকা, চর ঘাটিনা দক্ষিণপাড়া মসজিদের উন্নয়নে ৫০ হাজার টাকা ও চর ত্রিফলগাঁতি পশ্চিমপাড়া জামে মসজিদের উন্নয়নের জন্য ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দসহ অসংখ্য মসজিদ-মাদ্রাসা, কবরস্থান, শ্মশান ও মন্দিরে অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয়। কিন্তু এত দিনেও কোনো কাজ হয়নি। বরং বরাদ্দকৃত অধিকাংশ টাকাই পৌর মেয়র তুলে নিয়েছেন বলে অভিযোগ। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধানেরা বারবার ঘোরাঘুরি করেও বরাদ্দকৃত অর্থ তুলতে পারেননি।

একই অর্থবছরে ঘোষগাতি মৃধাবাড়ী জামে মসজিদের নামে ৫০ হাজার টাকা এডিপি থেকে বরাদ্দ হলেও গত ২ বছরে টাকা পরিশোধ করা হয়নি।

২০১৭-১৮ অর্থবছরে এডিপি থেকে ঘোষগাঁতি মহাশ্মশানের জন্য ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয় এবং এর আগে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে শিবমন্দিরের জন্য ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। দুই-তিন বছর অতিবাহিত হলেও বরাদ্দকৃত টাকা পায়নি প্রতিষ্ঠানগুলো।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কাউন্সিলর জানান, মেয়র কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা করেন না। কাউন্সিলরদের অন্ধকারে রেখে ইচ্ছেমতো রেজুলেশন তৈরি করে যাবতীয় অপকর্ম করছেন। পৌরসভার রাস্তাঘাটসহ বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়নকাজ তিনি গোপনে দরপত্র করে নিজের লাইসেন্স ছোট ভাই বা অনুগত ঠিকাদারদের দিয়ে বিল হাতিয়ে নিচ্ছেন। এ কারণেই পৌরসভায় সরকারের সব উন্নয়ন জনগণের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।

তার বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির কথা তুলে ধরে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, এর মাধ্যমে অর্জিত অর্থ দিয়ে মেয়র নজরুল ২০১৭ সালের ১৬ মে উল্লাপাড়া উপজেলার বাখুয়া মৌজায় আব্দুল জলিল সরকারের প্রায় তিন কোটি টাকা মূল্যের জমি সরকারি ভ্যাট-ট্যাক্স ফাঁকি দেয়ার জন্য গোপনে দলিলে ১ কোটি টাকা ক্রয় দেখিয়েছেন। একই বছরের ১৬ মে বাখুয়া মৌজায় আল মাহমুদের কাছ থেকে অর্ধ ডিসিমাল জায়গা কেনে ৮০ হাজার টাকা মূল্যে। মাস দুয়েক পর ১১ জুলাই মো. আব্দুল হান্নান সরকারের কাছ থেকে বাখুয়া মৌজায় জেসমিন আরার নামে ৪৩ একর জায়গা ১০ লাখ টাকায় কেনেন। 

তার দুই বছরের ব্যবধানে গত ২৫ জুন (২০১৯) বাখুয়া মৌজা থেকে আশরাফ আলীর কাছ থেকে ৫ শতক জায়গা মেয়র নজরুল তার বাবা চাঁদ আলীর নামে ২০ লাখ টাকায় কেনেন। ১৯ জুন একই ব্যক্তির কাছ থেকে বাবার নামে আরও ৫ শতক জায়গা কেনেন ২০ লাখ টাকায়। গত ২৮ আগস্ট নেওয়ারগছা মৌজার জাহাঙ্গীর হোসেন খানের কাছ থেকে ৫০ লাখ টাকায় কেনেন ৭৮ শতক জায়গা।

একই বছরের ১১ জুন বাখুয়া মৌজার রিমন হাসানের কাছ থেকে ১২ লাখ টাকায় ২ শতক, ২০ জুন ভট্টকাওয়াক মৌজায় আব্দুল মোমিন গংয়ের কাছ থেকে ১০ শতক জায়গা স্ত্রী জেসমিন আরার নামে ৭০ লাখ টাকা মূল্যে কেনেন মেয়র নজরুল।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, মেয়র নজরুল ইসলাম নির্বাচনের সময় হলফনামায় বসতভিটা, স্ত্রীর গহনা, ব্যাংক ব্যালেন্সসহ স্বল্পমূল্য কিছু টাকার সম্পদের হিসাব জমা দেন। বর্তমানে তার স্ত্রীসহ নিজ নামে ৮টি দলিলে ৩ বিঘা (১০১ ডিসিমাল) জমির মালিক তিনি, যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ১০ কোটি টাকা।

আওয়ামী লীগ সরকারের চলমান দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে জ্ঞাত আয়বর্হিভুত অর্থ আয় ও নানা অনিয়ম ও দুর্নীতিগুলো তদন্ত করে মেয়র এস এম নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন উল্লাপাড়াবাসী।

পৌর এলাকার চর ঘাটিনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘মসজিদের মাটি ভরাটের জন্য ১৬-১৭ অর্থবছরে ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। কিন্তু দীর্ঘ দুই বছরেও ওই টাকা পাইনি।’

ঘাটিনা পশ্চিমপাড়া আজাদ মসজিদের সভাপতি আব্দুল মান্নান, চর ঘাটিনা দক্ষিণপাড়া মসজিদের সভাপতি মঈনুল হক ও চর ত্রিফলগাঁতি পশ্চিমপাড়া জামে মসজিদের সভাপতি মিজানুর রহমান ২০১৬-১৭ অর্থবছরে তাদের মসজিদ উন্নয়নের জন্য এডিপি থেকে ৫০ হাজার টাকা করে দেওয়া বরাদ্দ অর্থ তারা পাননি বলে জানান। তারা বলেন, দীর্ঘ দুই বছর একাধিকবার পৌর মেয়রের কাছে ঘুরেছেন। কিন্তু টাকা তুলতে পারেননি। পরে মুনেছেন টাকাগুলো আত্মসাৎ করা হয়েছে।

ঘোষগাতি মৃধাবাড়ী জামে মসজিদের সভাপতি ফজলুল হক মৃধা বলেন, ‘অনেকবার পৌরসভায় গিয়েছি। বরাদ্দকৃত টাকা পাইনি। এখন শুনছি মেয়র নজরুল ইসলাম আমাদের মসজিদের টাকা তুলে নিয়েছেন।’

ঘোষগাতি শিবমন্দিরের জন্য এডিপি থেকে বরাদ্দ ৫০ হাজার টাকা না পাওয়ারকথা জানিয়ে মন্দির কমিটির সভাপতি মদন কুমার কর্মকার বলেন, সেই টাকা মেয়র নজরুল গোপনে তুলে আত্মসাৎ করেছেন। এ ঘটনায় মেয়রের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসক বরবার অভিযোগ দেবেন বলে জানান তিনি।

ঘোষগাঁতি মহাশ্মশান কমিটির সেক্রেটারি বাবলু কুমার ভৌমিক বলেন, ‘এডিপি থেকে ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়ার পর যথারীতি টেন্ডারও হয়। কিন্তু মেয়র নজরুল মহাশ্মশান কমিটিকে না জানিয়ে টাকা তুলে নিয়ে আত্মসাৎ করেন। আগামী সপ্তাহের মধ্যে মহাশ্মশানের নামে বরাদ্দ টাকা না দিলে মেয়রের বিরুদ্ধে স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর কাছে অভিযোগ দেওয়া হবে।’

এদিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আরিফুজ্জামান জানান, দুদক থেকে পৌর মেয়র নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাতের রেকর্ডপত্রসহ নির্বাচনী হলফনামা চাওয়া হয়েছিল, তা ইতোমধ্যে দুদক কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে।

তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে মেয়র এস এম নজরুল ইসলাম দাবি করেন, এডিপির বরাদ্দে কিছু সমস্যা হয়। তবে বরাদ্দকৃত প্রতিষ্ঠানগুলোতে অনুদানের অর্থ দেয়া হবে। তিনি বলেন, ‘অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে আমি জড়িত নই।’

চার বছরের ব্যবধানে আটটি জায়গা কেনার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার নামে কোনো জায়গা-জমি নেই। আমি ষড়যন্ত্রের শিকার।’

(ঢাকাটাইমস/১২নভেম্বর/মোআ)

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

বাংলাদেশ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :