আ.লীগে সরকার ও দলের নেতৃত্ব আলাদা হওয়ার পথে!

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ২৯ ডিসেম্বর ২০১৯, ১১:০৯ | প্রকাশিত : ২৯ ডিসেম্বর ২০১৯, ১০:৪৮
২০ ডিসেম্বর পায়রা উড়িয়ে আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলনের উদ্বোধন করেন দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনা

সরকার ও দলের নেতৃত্ব আলাদা করার দিকে এগুচ্ছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ। দলের নেতারা বলছেন, এ প্রক্রিয়া চলতে থাকবে এবং এ বিষয়ে একটা নজির গড়তে চান তারা।

দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতারা সরকার পরিচালনায় ব্যস্ত থাকলে দল সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হওয়ার আশঙ্কায় পড়ে। দল দুর্বল হলে সরকারও দুর্বল হয় বলে মনে করেন আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা। তাই কমিটিতে পদ পাওয়া নেতাদের সার্বক্ষণিক সাংগঠনিক কাজে মনোনিবেশের সুযোগ করার জন্য তাদের মন্ত্রিপরিষদে ঠাঁই না দেওয়ার পক্ষে তারা।

এরই প্রতিফলন দেখা গেছে আওয়ামী লীগের সদ্য ঘোষিত পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে। মন্ত্রিপরিষদের প্রধান শেখ হাসিনাসহ মাত্র পাঁচ মন্ত্রী ঠাঁই পেলেন কমিটিতে।

তবে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার ক্ষমতাসীন দলের এই উদ্যোগ যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন। তার মতে, দুটি বিষয়কে আলাদা করার পদ্ধতি এটি নয়।

আওয়ামী লীগের নেতারা বলছেন, সরকার ও দলের নেতৃত্ব এখনই পুরোপুরি আলাদা করার মতো বাস্তবতা দেশে বিদ্যমান নেই। বিকল্প নেতৃত্ব্ তৈরির মাধ্যমে আগামী সম্মেলনে হয়তো সরকার ও দলের নেতৃত্ব পুরোপুরি আলাদা হতে পারে বলে ধারণা করছেন তারা।

আওয়ামী লীগে এর আগেও একবার দল ও সরকারের নেতৃত্ব আলাদা করা হয়েছিল। ১৯৭৪ সালের দশম সম্মেলনে মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা দলীয় পদে থাকতে পারবেন না সিদ্ধান্ত হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দলের সভাপতির পদ ছেড়ে দেন।

কয়েকজন নেতার ভাষ্য, প্রধানমন্ত্রীকে দলীয় সভাপতির পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার জন্য গত দুই সম্মেলনে কাউন্সিলরদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন শেখ হাসিনা, কিন্তু তা বারবার প্রত্যাখ্যাত হয়। দলে তার বিকল্প এখনো গড়ে ওঠেনি। সাংগঠনিক দক্ষতা আর মেধায় দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তিনি, একই সঙ্গে হয়ে উঠেছেন ঐক্যের প্রতীক। পাশাপাশি তার নেতৃত্বে দেশ এগিয়ে চলেছে উন্নয়নের মহাসড়কে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সদ্য অনুষ্ঠিত ২১তম সম্মেলনেও যোগ্য ও বিকল্প নেতৃত্ব তৈরির জন্য দলীয় নেতাদের তাগিদ দিয়েছেন।

সদ্য অনুষ্ঠিত সম্মেলনের আগে একটা আলোচনা উঠেছিল যে, সরকার ও দলের নেতৃত্ব আলাদা করা হতে পারে। যদিও সম্মেলনে তেমন কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি, কিন্তু আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির এখন পর্যন্ত ঘোষিত কমিটি দেখে বলা যায়, সেদিকেই এগুচ্ছে স্বাধীনতার নেতৃত্ব দেওয়া দলটি।

বর্তমান নতুন কমিটি ও গত দুই কমিটির সময়কার মন্ত্রিপরিষদের সদস্য সংখ্যা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০১৬ সালের ২০তম জাতীয় সম্মেলনের আগের কমিটিতে সভাপতি, কার্যনির্বাহী কমিটি ও উপদেষ্টা পরিষদ মিলে ২৩ জন মন্ত্রী, মন্ত্রী পদমর্যাদা, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন।

সদ্য অনুষ্ঠিত ২১তম জাতীয় সম্মেলনের আগে মন্ত্রিপরিষদে ছিলেন ১৪ জন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী। আর সম্মেলন শেষে নতুন ঘোষিত কমিটিতে সংখ্যাটি নেমে এসেছে পাঁচে। প্রধানমন্ত্রী ছাড়া অন্য চারজন হলেন সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের (সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী), সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আব্দুর রাজ্জাক (কৃষিমন্ত্রী), যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দীপু মনি (শিক্ষামন্ত্রী) ও হাছান মাহমুদ (তথ্যমন্ত্রী)।

আওয়ামী লীগের নেতারা বলছেন, সরকার থেকে দলের নেতৃত্ব পুরোপুরি সরিয়ে নেওয়ার মতো বাস্তবতা এখনো তৈরি হয়নি। তবে ক্ষমতাসীন দল ধীরে ধীরে সেই প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে।

গতকাল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের যেমন বললেন, দলকে সরকার থেকে আলাদা করার কাজ চলছে। আওয়ামী লীগ মনে করে, দল শক্তিশালী হলে সরকারও শক্তিশালী হবে।

এবারের সম্মেলনে মন্ত্রীদের দলীয় নেতৃত্বে রাখার রীতি থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করা হয়েছে বলে জানান আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফরউল্লাহ। তিনি বলেন, ‘অনেক সময় বলতে শুনেছি দল ও সরকার মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। তাই এবারের কমিটিতে মন্ত্রীদের দলের নেতা বানানোর রীতি থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করা হয়েছে। এবারের কমিটিতে মন্ত্রীদের আধিক্য না থাকায় দল ও সরকার একে অপরের সহায়ক হবে, কিন্তু একাকার হবে না।’

দলকে আলাদা করার প্রক্রিয়া চলতে থাকবে জানিয়ে সভাপতিমণ্ডলীর আরেক সদস্য ফারুক খান বলেন, ‘আমরা দল থেকে সরকারকে আলাদা করার নীতি নিয়েছি। দল দলের মতো চলবে, সরকার সরকারের মতো থাকবে। এবারের কমিটিতে যতটা সম্ভব এ নীতি বাস্তবায়িত হয়েছে। এ চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। দল ও সরকার আলাদা রাখার ক্ষেত্রে আমরা বিশ্বে একটা উদাহরণ হতে চাই।’

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘এই উদ্যোগ সরকার ও দলকে আলাদা করার জন্য যথেষ্ট নয়। কারণ দুটি বিষয়কে আলাদা করার জন্য এটাই একমাত্র পদ্ধতি নয়। দল সরকারকে দায়বদ্ধ করবে তার নির্বাচনী ইশতিহার বাস্তবায়নে। কিন্তু যখন দেশের প্রধানমন্ত্রী এবং ক্ষমতাসীন দলের প্রধান এক ব্যক্তি হবেন, তখন কে কাকে দায়বদ্ধ করবে?’

আওয়ামী লীগে সরকার ও দলের নেতৃত্ব পৃথক করার আলোচনা অবশ্য বেশ আগে থেকে চলে আসছে। ২০১৬ সালের মার্চে অনুষ্ঠিত ২০তম সম্মেলনের আগেও এ নিয়ে সংবাদ মাধ্যমে খবর হয়েছে। তখন জানা গিয়েছিল, তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুর ইসলাম দলে প্রস্তাব করেছিলেন, তাকে যদি সাধারণ সম্পাদক পদে রাখা হয় তাহলে যেন মন্ত্রিত্ব থেকে বাদ দেওয়া হয়, অথবা দপ্তরবিহীন মন্ত্রী করা হয়। ওই সম্মেলনে সাধারণ সম্পাদক হন ওবায়দুল কাদের।

ক্ষমতাসীন দলটির গত কমিটিতে ছিলেন কিন্তু এবার বাদ পড়েছেন ৯ মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী। সাত মন্ত্রীর মধ্যে গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম ছিলেন আইনবিষয়ক সম্পাদক। বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক সম্পাদক। তিন সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন নৌ প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, পানিসম্পদ উপমন্ত্রী এনামুল হক শামীম ও শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী। ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ ছিলেন ধর্মবিষয়ক সম্পাদক। মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফজিলাতুন্নেছা ইন্দিরা আগের কমিটিতে মহিলাবিষয়ক সম্পাদক ছিলেন।

এ ছাড়া শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ান আগের কমিটিতে সদস্য পদে ছিলেন।

৮১ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটির ৭৪টি পদে দায়িত্ব বণ্টন হয়েছে ইতিমধ্যে। শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক সম্পাদক, ধর্মবিষয়ক সম্পাদক, কোষাধ্যক্ষ, একজন সাংগঠনিক সম্পাদক ও তিনটি সদস্য- মোট সাতটি পদ এখনো ফাঁকা। এই সাত পদেও মন্ত্রিপরিষদের কারও স্থান পাওয়ার সম্ভাবনা কম বলে জানিয়েছেন নেতারা।

গত বৃহস্পতিবার ওই সাত পদ বাদে পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণার সময় সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের জানান, যেসব স্থানের কেউ কমিটিতে ঠাঁই পাননি, সেসব জায়গার নেতাদের দিয়ে ওই সাত পদ পূরণ করা হবে। ওবায়দুল কাদের ওই দিন ৩২ পদে নাম ঘোষণা করেন।

এর আগে ২০-২১ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত ২১তম জাতীয় সম্মেলনের দ্বিতীয় দিন কাউন্সিল অধিবেশনে সভাপতি পদে শেখ হাসিনা নবমবারের মতো ও সাধারণ সম্পাদক পদে ওবায়দুল কাদের দ্বিতীয়বার নির্বাচিত হন। ওই দিন শেখ হাসিনা আরও ৪০ পদে নাম ঘোষণা করেন।

(ঢাকাটাইমস/২৯ডিসেম্বর/মোআ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

রাজনীতি বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

রাজনীতি এর সর্বশেষ

এই বিভাগের সব খবর

শিরোনাম :