কোনোভাবেই টাকা শেষ কথা হতে পারে না

সমাজ, রাষ্ট্র অর্থনীতি নিয়ে গতরাতে সেজো আপার সাথে কথা হচ্ছিল। অর্থনীতিতে অনার্স, মাস্টার্স করে শিক্ষকতা পেশাকে ভালোবেসে আমার বোন একজন স্কুলশিক্ষক হিসেবে তার পেশাগত জীবন পার করছেন! তার কথাতেই নতুন এক ভাবনা গতরাত থেকেই মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে।
সেজো আপা বলছিল, দেখ আমি একজন স্কুলশিক্ষক। এই দেশের নিয়ম অনুযায়ী আমার যে বেতন কাঠামো তাতে আমার কোনোভাবেই উচ্চ মধ্যবিত্ত কিংবা উচ্চবিত্ত হওয়ার কথা না! আমার সামাজিক মূল্যায়নের জন্য আমার পেশাটাই যথেষ্ট হওয়ার কথা ছিল, অর্থনৈতিক অবস্থান নয়!
কিন্তু যেহেতু আমাদের বর্তমান সামাজিক অবস্থায় টাকাটাই শেষ কথা, যে যেভাবে পারছে টাকা বানানোর চেষ্টা করছে! টাকা থাকলেই হলো। সে চুরি করে হোক আর বাটপারি, কেবল টাকা থাকার কারণে সে সম্মানিত হচ্ছে! টাকাওয়ালা চোরের সাথে সকলেই বিগলিত হয়ে কথা বলে, অসম্মান নিয়ে নয়। সাম্প্রতিক সব থেকে বড় উদাহরণ সাহেদ। গ্রেপ্তার হওয়ার আগ পর্যন্ত সম্মান-প্রতিপত্তি কিছুরই অভাব ছিল না সাহেদের!
একজন স্কুলশিক্ষকের যেমন কোনোভাবেই গাড়ি-বাড়ি হওয়া সম্ভব নয়, তেমনি অসংখ্য পেশা রয়েছে যেই পেশাতে গাড়ি-বাড়ি হওয়া সম্ভব নয়। এটা বলে কিন্তু আমি সামাজিক বৈষম্যের পক্ষে কথা বলছি না! গত পরশু একটা নিউজ দেখছিলাম ‘একজন তৃতীয় শ্রেণির সরকারি কর্মচারীর ডুপ্লেক্স বাড়ি, চড়েন প্রিমিও গাড়ি! ’ বুঝতেই পারছেন সেটা কীভাবে সম্ভব!
সেজো আপা বলছিল, আমার বাড়ি-গাড়ি নাই, কিন্তু আমি স্বাচ্ছন্দ্যের অভাব বোধ করি না, নিজেকে কারও থেকে পিছিয়ে পড়া মনে করি না। আমার এই জীবন আমি নিজে বেছে নিয়েছি এবং সেই জীবনে যথেষ্ট সন্তুষ্ট আমি।
জানি না বারবার নিজের বোনের উদাহরণ দেওয়াটা দৃষ্টিকটু লাগছে কি না, কিন্তু সে আমার সামনে দারুণ একটা উদাহরণ। শিক্ষাজীবন শেষ করে আমার বোন প্রথমে শিক্ষক হিসেবে একটা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেয়। কিছুদিন পর তার মনে হয় সমাজের সুবিধাভোগী শ্রেণির সন্তানদের শিক্ষা দিয়ে তার শিক্ষাকতা জীবন পরিপূ্র্ণ হচ্ছে না। তখন সে এর তিনভাগের এক ভাগ বেতনে বাসাবোর দক্ষিণ গাঁ নামের একটা জায়গায় একটা স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করে। এই স্কুলের অধিকাংশ শিক্ষার্থীর বাবা-মা তৃতীয় বা চতুর্থ শ্রেণি-পেশার মানুষ। এই স্কুল আর ছাত্রছাত্রীই আমার বোনের ধ্যানজ্ঞান, আনন্দ!
যা হোক, সকল প্রকার সামাজিক মূল্যবোধের বারোটা বেজে যাচ্ছে এই টাকা টাকা করে। সবাই সমহারে বিত্তবান হওয়ার চেষ্টা করছে। এটা এক ধরনের সামাজিক ব্যাধি। সকল পেশায় সমান অর্থ উপার্জন সম্ভব যে নয় , সেই সত্যটা মানতে হবে। যেকোনো উপায়ে বিত্তবান হওয়ার প্রবণতা দুর্নীতি এবং অসততাকে উৎসাহিত করে। এটা রোধ করতে হলে পেশাগত সম্মানটাকে নিশ্চিত করার জন্য কাজ করতে হবে।
সততা শব্দটার কোনো ধরণের চর্চা এই সমকালে আর নেই! আমার বাবা বিত্তবান ছিলেন না, কিন্তু পাটকলের স্বর্ণযুগের একজন কর্মকর্তা হিসেবে তিনি চাইলেই বিত্তবান হতে পারতেন!
আমার বাবার এই সততার পুরস্কার হিসেবে আমরা শৈশব-কৈশোরে সব খানে সম্মানিত হতাম ! সুতরাং সৎ মানুষ এবং সৎ পেশাকে সম্মান দিতে হবে, কোনোভাবেই টাকাটাই শেষ কথা হতে পারে না !
লেখক: চলচ্চিত্র নির্মাতা
ঢাকাটাইমস/২৬আগস্ট/এসকেএস
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













































