সাফরান জানে চুল কেটে ফিরবে বাবা

বোরহান উদ্দিন, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ১১ নভেম্বর ২০২০, ২২:১৮ | প্রকাশিত : ১১ নভেম্বর ২০২০, ২১:৫৭
বাবার কোলে সাফরান

রাজধানীর আদাবরের মাইন্ড এইড হাসপাতালের কর্মীদের মারধরে নিহত পুলিশের জ্যেষ্ঠ সহকারী কর্মকর্তা আনিসুল হকের পুত্র সাফরান জানে না তার বাবা আর কখনো ফিরবে না। বাসায় ফিরে আর বুকে জড়িয়ে আদর করবে না।

চার বছর বয়সী শিশুটি তার মা আর চাচা-ফুফুদের বারংবার করে বলে যাচ্ছে- বাবা চুল কাটতে গেছে, চুল কেটে ফিরবে।

পুলিশ কর্মকর্তা আনিসুলের মর্মান্তিক মৃত্যুতে একমাত্র সন্তান সাফরানকে কিভাবে বুঝ দেবে মা শারমিন সুলতানাও জানেন না। স্বামীর এমন মৃত্যুতে তিনিও দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। স্বামীকে নির্মমভাবে হত্যার বিচার করে দোষীদের কঠোর শাস্তিই এখন তার দাবি।

মানসিকভাবে অসুস্থবোধ করায় গত রবিবার রাতে ঢাকার উদ্দেশে বরিশাল ছাড়েন বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের সহকারী কমিশনার আনিসুল করিম। সহকর্মী ও ঘনিষ্ঠজনদের কাছে শিপন নামে পরিচিত ছিলেন তিনি। ঢাকায় আসার একদিন আগেও পেশাগত দায়িত্ব পালন করেছেন আনিসুল।

কিন্তু সোমবার ঢাকায় জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট হয়ে মোহাম্মদপুরের মাইন্ড এইড হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে প্রাণ গেল পুলিশের এই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার। এ ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে হত্যা মামলা হয়েছে। হাসপাতালের মালিকসহ গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১১জনকে।

এই ঘটনায় দায়িদের কাউকে ছাড় দেয়া হবে না বলে আশ্বাস দিয়েছে সরকার। অন্যদিকে পুলিশের পক্ষ থেকেও দ্রুত চার্জশিট দেয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।

এদিকে সহকর্মীকে হারিয়ে শোকাহত ৩১তম বিসিএস ক্যাডার অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যসহ পুলিশ বিভাগের সদস্যরা। বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ আনিসুলের বিচারের দাবিতে মৌন সমর্থন জানিয়েছেন। সর্বত্র যখন আনিসুলের মৃত্যুতে দায়িদের বিরুদ্ধে শাস্তির দাবি উঠেছে তখন তার পরিবার শোকে স্তব্ধ। আত্মীয় স্বজন ও আনিসুলের সহকর্মীরা অনেকেই পরিবারকে স্বান্ত্বনা দিতে যাচ্ছেন তার গাজীপুরের জয়দেবপুরে। কিন্তু বাবা হারা সাফ্রান এসবের কিছুই বুঝেন না। বরং বাড়িতে এত মানুষের আনাগোনা দেখে তার মনে কৌতুহল জেগেছে- ‘এত মানুষ কেন বাড়িতে আসছে?’

বুধবার আনিসুল করিমের বাড়ি গাজীপুরে গিয়েছিলেন তার ব্যাচমেট কিশোরগঞ্জ হোসেনপুর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. সোনাহর আলী। ঢাকা টাইমসকে তিনি বলেন, ‘আনিস ভাইয়ের পরিবারের মতো আমরাও শোকাহত। সব থেকে কষ্ট লেগেছে তার ছেলে সাফরানকে দেখে। সে এখনো বলে তার বাবা চুল কাটানোর জন্য গেছেন। চুল কাটা শেষে আসবেন।’ বাড়িতে অনেক মানুষের আসা-যাওয়ার কারণে সাফরান স্বজনদের কাছে জানতে চায়, ‘এত আঙ্কেল আন্টিরা আমাদের বাসায় আসতেছে কেন?’

পরিবারে খুব আদরের ছিলেন আনিসুল

জানা গেছে, আনিসুল করিমের বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা ফাইজুদ্দিন আহমেদও পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন। তার চার সন্তানের মধ্যে সবার ছোট ছিলেন আনিসুল। পরিবারের সবার আদরের ছিলেন চাপা স্বভাবের এই প্রয়াত পুলিশ কর্মকর্তা। শ্বশুর বাড়ির লোকজনেরও সে খুব আদরের ছিলেন বলে জানিয়েছেন আনিসুলের ভাই রেজাউল করিম।

ঢাকা টাইমসকে তিনি বলেন, ‘ও আমাদের খুব আদরের ছিলো। ছোট সময় থেকে সে চাপা স্বভাবের ছিলো। কোনো সমস্যায় থাকলেও কাউকে কিছু বলতো না সে। কিছুটা মানসিক অবসাদের মধ্যে ছিলো হয়তো।’

অসুস্থতার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘গত বৃহস্পতি-শুক্রবারের দিকে সে (আনিসুল) কেমন যেন চুপচাপ থাকতে দেখেন তার স্ত্রী। পরে বাবাকে ফোন করে বরিশালে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করলে আনিসুলের শ্বশুরকে নিয়ে বাবা বরিশাল যান। আনিসুলের সিনিয়র স্যাররা পরামর্শ দেন ঢাকায় মানসিক কোনো চিকিৎসকের কাছে চিকিৎসা নিলে আর পরিবারের সঙ্গে থাকলে হয়তো ভালো লাগবে। দশ দিনের ছুটিও নেয়। পরে সোমবার তাকে ঢাকায় এনে মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে ভর্তি করাই।’

সরকারি হাসপাতাল থেকে বেসরকারি হাসপাতালে নেয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সরকারি হাসপাতালে পরিবেশ খুব নোংরা ছিলো। করোনার কারণে ডাক্তাররাও ছিলেন না। নোংরা বেড দেখে আমার ভাই (আনিসুল) বলতেছিল ভাই আমারে তোমরা কোথায় নিয়ে আসছো? পরে কয়েকটা হাসপাতাল ঘুরে এইখানে ভর্তি করার চিন্তা করি। কিন্তু ভাইটাকে শেষ করে দিলো। এরপরই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

সহকর্মীরা যা বলছেন

স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে বরিশাল নগরীর বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে একটি ফ্লাটে ভাড়া থাকতেন আনিসুল করিম। তার সহকর্মীরা সৎ ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তা হিসাবে চিনতেন তাকে। তার এমন মৃত্যুকে কোনোভাবে মানতে পারছেন না সহকর্মীরা।

গত ১৫ সেপ্টেম্বর বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশে আসার পরই ট্রাফিক বিভাগের সহকারি কমিশনারের দায়িত্ব পান। তার সম্পর্কে জানতে চাইলে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের উপকমিশনার জাকির আলম মজুমদার গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমার কাছে কর্মরত অবস্থায় আনিসুলের কোনো অস্বাভাবিক আচরণ আমার চোখে পড়েনি। সে (আনিসুল) বেশ কর্মঠ ব্যক্তি ছিল। আমি তাকে ভালো অফিসার হিসেবে পেয়েছি।’

তিনি এই ঘটনার বিচার এবং অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।

(ঢাকাটাইমস/১১নভেম্বর/ডিএম)

সংবাদটি শেয়ার করুন

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :