আসলের হুবহু মোড়কে নকল ভোগ্যপণ্যে সয়লাব বাজার

কাজী রফিক, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ০৪ মার্চ ২০২১, ১৫:৩৯ | প্রকাশিত : ০৪ মার্চ ২০২১, ১৪:১৭

প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ভোগ্যপণ্যের মোড়কের হুবহু আদলে নকল ভোগ্যপণ্যে সয়লাব হয়ে পড়েছে বাজার। দেখতে একই রকম হওয়ায় তাৎক্ষণিক বুঝতে না পেরে ঠকার পাশাপাশি মানহীন এসব পণ্যে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন সাধারণ ক্রেতারা। যথাযথ পদক্ষেপে পণ্য নিয়ে ঠগবাজি বন্ধ করা না হলে জনস্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ঢাকা টাইমসের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিস্কুট, চানাচুর, কফি, শিশুদের চকোলেট, চিপস, আইসক্রিম, বোতলজাত তরল পানীয়, নুডলস, বোতলজাত সয়াবিন তেল, সরিষার তেল, মশার কয়েলসহ অনুমোদনহীন নানা পণ্য দেদার বিক্রি হচ্ছে বাজারে। দেশের নামি ব্র্যান্ডগুলোর মোড়কের আদলে কাছাকাছি নাম দিয়ে এসব পণ্য কিনতে গিয়ে বুঝতেও পারেন না ক্রেতা।

পণ্যের গুণগত মান নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা বিএসটিআই এবং পণ্যে ভোক্তা অধিকার বলছে এমন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযান চলমান রয়েছে। তবে পণ্যের গায়ে কোম্পানির সঠিক ও পূর্ণ ঠিকানা না থাকায় এদেরকে শনাক্ত করতে সমস্যা হচ্ছে সংস্থাগুলোর। আর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাজারে অবৈধ পণ্য থাকার দায় নিয়ন্ত্রণ সংস্থা এড়াতে পারে না। সমস্যা সমাধানে স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ তাদের।

বাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রাণের জুস, রূপচাঁদা সয়াবিন, তিব্বতের কাপড় কাঁচার সাবান, রিন, হুইল, কফিকো ক্যান্ডি, হারপিক, হাকিমপুরী জর্দার মোড়কের আদলে পণ্যের নাম ও উৎপাদক প্রতিষ্ঠানের নাম ছাড়া মোড়ক দেখতে একই রকম। বাজারে গিয়ে প্রতিষ্ঠিত এসব ব্র্যান্ডের পণ্য কিনতে গিয়ে ক্রেতা নকল পণ্যটি তাৎক্ষণিক বুঝতেও পারছেন না।

বিএসটিআইয়ের অনুমোদন না থাকা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তৈরি মানহীন এসব পণ্যে একদিকে ক্রেতা প্রতারণার শিকার হচ্ছে অন্যদিকে যেনতেনভাবে তৈরি এসব পণ্যে ঝুঁকিতে পড়ছে ক্রেতার স্বাস্থ্য। শহরের বাজারের পাশাপাশি মফস্বলের ক্রেতারা এসব পণ্যে প্রতারিত হচ্ছেন। ঢাকা টাইমসের এক সপ্তাহের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে রাজধানীর কামরাঙ্গীরচর, হাজারীবাগ, মোহাম্মদপুর, আদাবর, গাবতলী, মিরপুর, উত্তরখান, দক্ষিণখান এলাকায় এসব অবৈধ পণ্য উৎপাদনের কারখানা গড়ে উঠেছে।

রাজধানীর বেশ কিছু দোকানে দেখা গেছে, রোমা নামের একটি কোম্পানির প্যাকেটজাত টোস্ট, মটরভাজা, চানাচুরের প্যাকেটের গায়ে বিএসটিআইয়ের লোগো নেই। এ পণ্যগুলো বিক্রিতে লাভও বেশি হয় বলে দোকানিদের ভাষ্য।

এছাড়া অনুমোদনহীন মশার কয়েলেও ছেয়ে গেছে বাজার। ‘লামিয়া নিমপাতা’ নামের একটি কয়েলের প্যাকেট বা কার্টনের গায়ে উৎপাদক প্রতিষ্ঠানের কোনো নামই নেই। তবে লেখা আছে ট্রেড লাইসেন্স নম্বর, ভ্যাট নম্বর, ফায়ার লাইসেন্স ও টেড মার্ক। কিন্তু বিএসটিআই বা পিএইচপি সনদ নেই। পিএইচপির স্থানে উল্লেখ করা আছে ‘আবেদিত’। যদিও বিএসটিআই বলছে, কোনো পণ্যের অনুমোদনের জন্য আবেদন করে তা বাজারজাত করার কোনো সুযোগ নেই।

বিএসটিআইয়ের সহকারী পরিচালক রিয়াজুল হক ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘প্রোডাক্টের গায়ে যদি কারখানার পুরো ঠিকানা না থাকে তাহলে পণ্যটি ভুয়া। এদের কারখানা খুঁজে পাওয়া যায় না। আবেদিত বলতে কোনো শব্দ আমাদের কাছে নেই। আবেদন করে কেউ পণ্য বাজারে বিক্রি করতে পারে না। ঠিকানা পেলে আমরা ব্যবস্থা নিব।’

বাজারে ভোজ্যতেলের প্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ড ‘রূপচাঁদা’। এ ব্র্যান্ডটির বোতলের মোড়কের হুবহু দিয়ে বিক্রি হচ্ছে ‘গৃহিণী’ নামের ব্র্যান্ডের সয়াবিন তেল। পণ্যটির গায়ে বিএসটিআইর লোগো থাকলেও তা আসল কি না তা নিয়ে সন্দেহ খোদ বিক্রিকারী দোকানির।

এরপরও কেন বিক্রি করছেন জানতে চাইলে কামরাঙ্গীরচরের মুদি দোকানি মনির হোসেন ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘এসিআই, রূপচাঁদা কোম্পানি এক লিটার তেলে পাঁচ-ছয় টাকা লাভ দেয়। গৃহিণীর হাফ লিটারেই ছয়-সাত টাকা লাভ। সব কাস্টমার তো আর ব্র্যান্ড বোঝে না। আমরা রাখি লাভের আশায়।’

রাজধানীর মোহাম্মদপুর, গাবতলী, মিরপুর, কামরাঙ্গীরচরসহ বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে ছোট-বড় বেকারি। এসব বেকারি আশপাশের এলাকায় সরবরাহ করছে বিভিন্ন পাউরুটি, বিস্কুট, কেকসহ নানা খাদ্যপণ্য। তবে বেশিরভাগ বেকারির সরবরাহ করা পণ্যের গায়ে উৎপাদনের তারিখ নেই।

এ বিষয়ে বিএসটিআইয়ের সহকারী পরিচালক রিয়াজুল হক জানান, অবৈধ এমন অনেক কোম্পানি একাধিকবার সিলগালা করা হলেও তারা পুনরায় একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। তবে বিএসটিআই বারবার অভিযান চালাচ্ছে। এসব মানহীন পণ্য কেনার বেলায় ক্রেতাদেরও সতর্ক হতে হবে।

রিয়াজুল হক বলেন, ‘অভিযান চালানো আমাদের এটা চলমান প্রক্রিয়া। এমনও কোম্পানি আছে, যাদেরকে আমরা দুইবার-তিনবার সিলগালা করেছি। অপরাধীদের শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা হচ্ছে। কিন্তু সাজা শেষে তারা যে আবার একই অপরাধ করবে না, এ গ্যারান্টি তো আমরা দিতে পারব না। সে আবার অপরাধ করলে আবার তাকে শাস্তি দিব।’ দেশে পুরোনো খ্যাতিসম্পন্ন কোম্পানি তিব্বতের কাপড় কাঁচার সাবানের চাহিদা রয়েছে। ৫৭০ সাবানের আদলে বিক্রি হচ্ছে ‘৬৭০’ নামের সাবান। এছাড়া টয়লেট ধোয়ার অতিপরিচিত হারপিকের আদলে হারপুন, রিন ডিটারজেন্টের আদলে রিমসহ এমন অর্ধশতাধিক অবৈধ পণ্যের ছড়াছড়ি বাজারে।

আসল-নকল পণ্য নিয়ে সন্দেহ হলে বিএসটিআইয়ে অভিযোগ জানানোর পরামর্শ দিচ্ছেন প্রতিষ্ঠানটির সহকারী পরিচালক রিয়াজুল হক। ঢাকা টাইমসকে তিনি বলেন, ‘ভোক্তাদের প্রতি বার্তা হলো আমার নম্বরটা ওয়েবসাইটেই আছে। সন্দেহ হলেই অভিযোগ জানান। তথ্য পেলে আমরা অবশ্যই ব্যবস্থা নেবো।’

ভোক্তা স্বার্থ রক্ষায় সরকারি প্রতিষ্ঠান জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক মঞ্জুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার বলছেন, অবৈধ পণ্য বাজারে থাকার কোনো সুযোগ নেই। অনুমোদন ছাড়া পণ্য বিক্রি করা যাবে না।

ঢাকা টাইমসকে তিনি বলেন, ‘এমন অনেক প্রতিষ্ঠান সিলগালা করার পাশাপাশি পণ্য জব্দ করছি। দণ্ড দেয়া হচ্ছে। আমাদের নিয়মিত অভিযান চলেছে। যে সব প্রতিষ্ঠানের কাগজপত্র নেই এমন অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হয়েছে। আর যাদের কাগজপত্র আছে কিন্তু মানহীন পণ্যের জন্য তাদেরকে দণ্ড দেয়ার পাশাপাশি সতর্ক করা হয়েছে।’

বাজারে এমন মানহীন নকল পণ্যের ছড়াছড়িতে সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর দায় দেখছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ আবদুল হামিদ। এ স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদের মতে, যারা অনুমোদন দেয়, লাইসেন্স প্রদানকারী সংস্থা, বাজারে কি বিক্রি হচ্ছে না হচ্ছে তাদের অবশ্যই নজরদারি থাকতে হবে।

ঢাকা টাইমসকে সৈয়দ আবদুল হামিদ বলেন, ‘কারা লাইসেন্স নিয়ে পণ্য উৎপাদন করছে, কারা লাইসেন্স নিচ্ছে না এর তো একটা তালিকা থাকতে হবে। সে অনুযায়ী একটা প্রতিরোধ ব্যবস্থা থাকা দরকার। অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠানের পণ্যে বৈধ প্রতিষ্ঠান ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা ক্রেতা বা ভোক্তারা ঠকছেন।

পণ্য নিয়ে ঠগবাজির স্থায়ী সমাধানে জোর দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এ শিক্ষক বলেন, ‘যে কোনো পণ্য বিক্রি হচ্ছে দোকানে। যে সমস্ত পণ্যের লাইসেন্স নেই, সে পণ্য বিক্রি করা হলে দোকানদারকে জরিমানা করতে হবে। তাহলে দোকানদার পণ্য রাখার সময় সতর্ক থাকবে। মাসে দুই একবার দোকানগুলোতে অভিযান চালিয়ে দোকানদারকে যদি নিয়ন্ত্রণ করা যায় তাহলে এসব পণ্য বিক্রি বন্ধ হয়ে যাবে। পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ আছে। পণ্য উৎপাদন ও বিপণনের সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থা আছে। তাদের নিজস্ব টিম আছে। এগুলো দিয়ে খুঁজে বের করতে হবে কারা এ ধরনের পণ্য উৎপাদন করছে।’

এরপরও বিএসটিআইসহ সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার যদি ক্ষমতা না থাকে তাহলে সরকারের ভিন্নভাবে চিন্তা করতে হবে বলে মনে করছেন এ স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ। জনস্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দিয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগ এটাকে নজরদারি করার দায়িত্ব নিতে পারে বলেও পরামর্শ দিচ্ছেন সৈয়দ আবদুল হামিদ।

(ঢাকাটাইমস/৪মার্চ/ডিএম)

সংবাদটি শেয়ার করুন

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :