এসি মেকানিক থেকে ভয়ঙ্কর প্রতারক, আট বছরে গড়েছেন বিপুল ধনসম্পদ

লোকে মুখে তিনি কারো কাছে পরিচিত প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যদের প্রটোকল অফিসার। আবার কখনও মন্ত্রীর পিএস। বিভিন্ন সময় অভিনব সব প্রতারণার মাধ্যমে মাত্র ৮ বছরে হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। ময়মনসিংহে দুইকোটি টাকা ব্যয়ে গড়েছেন 'প্যারিস সুইমিং পুল এন্টারটেইনমেন্ট পার্ক'।
অভিনব সব প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া হরিদাসকে থামিয়েছে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) ও র্যাব-৩ এর একটি দল। সোমবার রাতে রাজধানীর বনানী থেকে সহযোগীসহ তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
বাহিনীটি জানিয়েছে, ২০১০ সালেও রাজধানীর উত্তরায় পুরাতন এসি মেকানিকের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন শ্রী হরিদাস চন্দ্র তরনীদাস ওরফে তাওহীদ। তার আগে সবজি বিক্রেতা ছিলেন। ২০১৯ সালে ধর্মান্তরিত হয়ে হরিদাস চন্দ্র থেকে তাওহীদ ইসলাম নাম ধারণ করেন। এরপর প্রতারণার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাত করে ধনী ও প্রভাবশালী বনে যান।
মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজার র্যাব মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে বাহিনীর আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকাল আল মঈন বলেন, এক শ্রেণীর প্রতারক চক্র স্পর্শকাতর ব্যক্তিদের অথবা সমাজের বিভিন্ন উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের নাম ব্যবহার করে বা তাদের প্রটোকল অফিসার, বা বিভিন্ন মন্ত্রীর ভুয়া এপিএস পদবী ব্যবহার করে মানুষের সাথে প্রতারণা করছে এবং অর্থ আত্মসাৎ করছে। এমনকি প্রতারক চক্র প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যদের ভুয়া প্রটোকল অফিসার পরিচয় দিয়েও বিভিন্ন স্থান থেকে অর্থ আত্মসাৎ করছিলো।
এমন তথ্যের ভিত্তিতে গোয়েন্দা কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রতারক চক্রের প্রতারণাসহ নানা অপকর্মের বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে এনএসআই ও র্যাব-৩ এর যৌথ অভিযানে রাজধানীর বনানী এলাকা হতে শ্রী হরিদাস চন্দ্র ওরফে তাওহীদ ও সহযোগী ইমরান মেহেদী হাসানকে গ্রেপ্তার করা হয়।
হরিদাস বগুড়া শিবগঞ্জের উথলী বাজারের শ্রী গোপীনাথের ছেলে। আর ময়মনসিংহের ত্রিশালের নওদারের সাইফুল ইসলামের ছেলে প্রতারণার সহযোগী ইমরান মেহেদী হাসান।
ছোট থেকেই ভয়ঙ্কর প্রতারক:
খন্দকার মঈন জানিয়েছেন, গ্রেপ্তার হরিদাস ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে অধ্যয়নকালে অবৈধ উপায়ে পাশ্ববর্তী দেশ ভারতে আত্মীয়ের বাসায় যায়। সেখানকার পঞ্চায়েত প্রধানের নিকট হতে এতিম সার্টিফিকেট নিয়ে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন ও ইলেক্ট্রনিক বিষয়ে দুই বছরের বিশেষ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে। ২০১০ সালে দেশে ফিরে রাজধানীর উত্তরায় পুরাতন এসি মেকানিকের কাজ শুরু করেছিল। এসময় সে সবজি বিক্রেতার সঙ্গে সাবলেট বাসা ভাড়া নেয়। সেখানেই বিয়ে ও ২০১৯ সালে ধর্মান্তরিত হয়ে তাওহীদ ইসলাম ধারণ করেন।
জিজ্ঞাসাবাদে হরিদাস জানান, তার শ্বশুরের পরিচয়ে ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া এলাকায় কিছু জমি ক্রয় করেন। তার শ্বশুরের মাধ্যমে এলাকার লোকের সাথে নিজেকে একজন বিত্তশালী লোক হিসেবে পরিচিত হন। পাশাপাশি প্রচার করতে থাকেন, তিনি প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যদের প্রটোকল অফিসার। দামি গাড়ি হাঁকিয়ে এবং পোশাক পরিধান করে স্থানীয় রাজনীতিবিদ, গণ্যমান্য বিত্তশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে পরিচয় ও সখ্যতা গড়ে তোলেন। প্রধানমন্ত্রীর নিকটাত্মীয়ের সহায়তায় প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রজেক্টে বিনিয়োগে প্রলোভন দেখান। বিভিন্ন সরকারি দপ্তর হতে অর্থ এবং উন্নয়নমূলক কাজের সম্পন্ন করতে তাদেরকে আশ্বস্থ করতেন। তার প্রতারণায় প্রলুব্ধ হয়ে অনেকেই চাকুরি, বদলি, টেন্ডারসহ বিভিন্ন বিষয়ে তদবির নিয়ে তার কাছে আসা শুরু করেন। সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে চাকুরি প্রত্যাশী, পছন্দমত জায়গায় বদলি, সরকারি চাকুরী, বিভিন্ন ক্রয় বিক্রয় ও উন্নয়নমূলক কাজের টেন্ডারে অংশগ্রহণ করতে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের নিকট থেকে টাকার বিনিময়ে কাজ করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে অর্থ আত্মসাৎ শুরু করেন।
গ্রেপ্তার ইমরান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে কর্মরত তার বিভিন্ন সহযোগীসহ অন্যান্য ক্লায়েন্ট সংগ্রহ করে হরিদাসের নিকট নিয়ে আসতেন। এসময় হরিদাস স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে বিভিন্ন পদে চাকুরী, পদোন্নতি এবং বদলীর বিষয়ে আশ্বস্থ করে মোটা অংকের অর্থ আত্মসাত করেন।
সুইমিংপুল গড়ে প্রতারণা:
গ্রেপ্তার হরিদাস অত্যন্ত বচনপটু। একবার তার সাথে কেউ পরিচিত হলে তার প্রতারণার খপ্পর হতে বের হতে পারে না জানিয়ে কমান্ডার মঈন বলেন, তিনি প্রতারণার মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে ২০১৯ সালে ফুলবাড়িয়া এলাকায় প্রায় এক বিঘা জমি ক্রয় করে প্যারিস সুইমিংপুল এন্টারটেইনমেন্ট পার্ক নামে রিসোর্টের কাজ শুরু করেন। সেখানে তার প্রলোভনে পড়ে অনেকেই টাকা লেনদেনের রসিদ ছাড়া তাকে লাখ লাখ টাকা লগ্নি করেন। ২০২০ সাল প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয়ে রিসোর্টের কাজ শেষ হলে পরবর্তীতে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করে দেন। রিসোর্টে প্রবেশ মূল্য ৫০ টাকা, সুইমিংপুলে গোসল ১০০ টাকা এবং রিসোর্টের ভিতরে ঘোরাঘুরির জন্য ৫০ টাকা করে টিকেট বিক্রি করা শুরু করেন। অনেকে বিবাহ, জন্মদিনসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের জন্য তার রিসোর্ট ভাড়া নিতে থাকে। হরিদাস বিভিন্ন বিত্তশালী ব্যক্তিদের তার রিসোর্টে আমন্ত্রণ জানায় এবং প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার এডিট করা ছবি প্রদর্শন করে তার প্রজেক্টসহ অন্যান্য প্রজেক্টে বিনিয়োগ করার কথা বলে অর্থ হাতিয়ে নেন।
প্রতারণার কৌশল সম্পর্কে তিনি বলেন, তার মোবাইলে বিভিন্ন নম্বর প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের এবং নিকটাত্মীয়ের বিভিন্ন সদস্যদের নামে সেইভ করে ও কল দিয়ে দেখাতেন। নিজেকে প্রভাবশালী বলে জাহির করতেন। যদিও প্রকৃতপক্ষে তার কোন রাজনৈতিক নেতা বা কর্মীর সাথে পরিচয় নেই। তার কোন দলীয় পরিচয় নেই। প্রতারণা করে অর্থ উপার্জনই তার মূল লক্ষ এবং পেশা।
একাধিক ব্যাংকে নামে-বেনামে তার বিভিন্ন একাউন্ট রয়েছে উল্লেখ করে কমান্ডার মঈন বলেন, একাউন্টগুলোতে কোটি কোটি টাকা লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। তিনি ফুলবাড়িয়া এবং বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন পদে চাকুরি দেওয়ার নাম করে শতাধিক লোকের নিকট হতে কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। তার কাজে বাধা দেওয়ায় স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতাকে প্রকাশ্যে হত্যার হুমকি প্রদান করেন। স্বর্ণ চোরাচালান ও স্বর্ণের বারের অবৈধ বাণিজ্যেও তিনি জড়িত বলে গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে।
গ্রেপ্তার ইমরান মেহেদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ক্যাশিয়ার। তার নামে প্রাইভেট ক্লিনিকে চাকুরি প্রদান, অনলাইনে নিবন্ধন আবেদন, নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের নবায়নসহ অর্থ জালিয়াতির বিভিন্ন অপকর্মে জড়িত ছিল থাকায় শাস্তিস্বরূপ ২০২২ সালের প্রথম দিকে বিভাগীয় শহর হতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বদলি করা হয়। এছাড়াও অসুস্থতার মিথ্যা অজুহাত দেখিয়ে আগস্ট ২০২২ হতে কর্মস্থলে গড় হাজির রয়েছে।
ইমরান হরিদাসের মাধ্যমে নিজের বদলী বাতিল করার চেষ্টা করেন। দুজনে মিলে প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের একজন সদস্যের নাম লিখে ভুয়া সিল দিয়ে একটি ভুয়া ডিও লেটার তৈরী করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উর্ধ্বতন কর্মকর্তার মোবাইলে অ্যাপসের মাধ্যমে প্রেরণ করে দ্রুত বদলীর আদেশ বাতিল করে পূর্বের পদে বহালের জন্য সুপারিশ করেন। তবে ডিও লেটারটি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় কর্তৃপক্ষ এনএসআই এর নিকট অভিযোগ করলে চক্রের প্রতারণার বিষয়টি সামনে আসে।
(ঢাকাটাইমস/০৮নভেম্বর/এসএস/কেএম)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













































