২০০৮ সালের পর থেকে সংসদীয় গণতন্ত্র অব্যাহত থাকায় বাংলাদেশ এখন বিশ্বে রোল মডেল: প্রধানমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকাটাইমস
  প্রকাশিত : ০৭ এপ্রিল ২০২৩, ২১:০২| আপডেট : ০৭ এপ্রিল ২০২৩, ২১:০৮
অ- অ+

২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর গত ১৪ বছর ধরে সংসদীয় গণতন্ত্র অব্যাহত থাকায় বাংলাদেশের ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, দারিদ্র্য বিমোচন, দুর্যোগ মোকাবিলা, নারীর ক্ষমতায়ন ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিশ্বে বাংলাদেশ এখন রোল মডেল।

শুক্রবার জাতীয় সংসদের সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ১৪৭ বিধিতে দেওয়া প্রস্তাব উত্থাপনকালে সংসদ নেতা এসব কথা বলেন।

এর আগে রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদ সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ভাষণ দেন।

প্রধানমন্ত্রী প্রস্তাব তোলার পর এর ওপর সংসদে আলোচনা শুরু হয়েছে। সরকারি দলের সংসদ সদস্য আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ ও শেখ ফজলুল করিম সেলিম আলোচনায় অংশ নেন। আগামীকাল শনিবার ও রবিবার এই প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নেবেন সংসদ সদস্যরা। পরে প্রস্তাবটি গ্রহণ করা হবে।

শেখ হাসিনা বলেন, সংবিধানের আলোকে গত তিন মেয়াদে ২০০৮, ২০১৪ ও ২০১৮ বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের ধারাবাহিক অগ্রযাত্রা, সংসদীয় গণতন্ত্রের স্থায়িত্ব ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বাংলাদেশের ব্যাপক উন্নয়নের ক্ষেত্র রচনা করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় মিলিনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোলের সফল বাস্তবায়ন, ৪০% থেকে ১৮% দারিদ্র্য বিমোচন, বাংলাদেশের ক্রমাগত টেকসই উন্নয়ন, উন্নয়নশীল দেশের কাতারে অবস্থান, বাংলাদেশে ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ, যোগাযোগ অবকাঠামোর ব্যাপক উন্নয়ন, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতু নির্মাণ, মেট্রোরেল বাস্তবায়ন, কর্ণফুলী টানেল নির্মাণ, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন, গৃহহীনদের আশ্রয়ণ, নারী ক্ষমতায়ন, মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বীর নিবাস নির্মাণ, ডিজিটাল বাংলাদেশ, সর্বোপরি জনগণের জীবনমানের উন্নয়ন আজ বিশ্বের বিস্ময়।

তিনি বলেন, দারিদ্র্য বিমোচন, দুর্যোগ মোকাবিলা, নারী ক্ষমতায়ন ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিশ্বে বাংলাদেশ আজ রোল মডেল।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ৭ এপ্রিল বাঙালি জাতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। ১৯৭৩ সালের এই দিনে স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশে প্রথম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ট বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে দীর্ঘ ২৪ বছরের আন্দোলন সংগ্রাম ও এক রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালে বিশ্ব মানচিত্রে স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় ইতিহাসের এক অনবদ্য ঘটনা। ১৯৭০ সালে তদানিন্তন পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ এবং পূর্ব বাংলার প্রদেশিক পরিষদ নির্বাচনে সমগ্র জাতি বঙ্গবন্ধুর অবিসংবাদিত নেতৃত্বে আওয়ামী লীগকে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠদল হিসেবে নির্বাচিত করে। কিন্তু বাঙালিকে দাবিয়ে রাখার ষড়যন্ত্রে পাকিস্তানীরা নির্বাচিত দলের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তরের পরিবর্তে নৃশংস গণহত্যায় মেতে উঠে, ২৫ মার্চ ১৯৭১ এর কালরাত্রিতে সংঘটিত হয় ইতিহাসের বর্বরতম গণহত্যা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে ২৬ মার্চে প্রথম প্রহরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে ৩০ লক্ষ মহান শহীদ ও ২ লক্ষ নির্যাতিত মা বোনের আত্মত্যাগের বিনিময়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জিত হয় ।

তিনি বলেন, ১৯৭০ সালে তদানিন্তন পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে জাতীয় পরিষদ সদস্য ও প্রাদেশিক পরিষদ সদস্যদের সমন্বয়ে গণপরিষদ গঠিত হয়। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করে পরদিন ১১ জানুয়ারি ১৯৭২ “বাংলাদেশের অস্থায়ী সংবিধান আদেশ, ১৯৭২ (Provisional Constitution of Bangladesh Order, 1972) জারি করেন। সেখানে গণপরিষদকে সংজ্ঞায়িত করা হয় এবং পরবর্তিতে গণপরিষদকে সংবিধান প্রণয়নের দায়িত্ব প্রদান করা হয়। বাংলাদেশ গণপরিষদ স্বল্পতম সময়ের মধ্যে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ একটি সংবিধান রচনা করে। ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর গণপরিষদে বাংলাদেশের সংবিধান গৃহীত হয় এবং ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭২ কার্যকর হয়। ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং ৭ এপ্রিল ১৯৭৩ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে প্রথম বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। ৭ এপ্রিল ২০২৩ একাদশ জাতীয় সংসদ, বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের ৫০ বছর পূর্তিতে 'সুবর্ণ জয়ন্তী' উদযাপন করছে। ৫০ বছরের পথ চলায় জাতীয় সংসদ অনেক ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী হয়ে আছে। সংসদীয় গণতন্ত্রের কেন্দ্রবিন্দু জাতীয় সংসদ বিভিন্ন চড়াই উতরাই এর মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রের অর্থায়নে ভূমিকা রেখে চলেছে। বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের গত ৫০ বছরের পথ পরিক্রমা অনেকক্ষেত্রেই মসৃণ ছিল না।

শেখ হাসিনা বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কালরাতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যার পর বারবার স্বৈরশাসকরা অসাংবিধানিক পন্থায় সামরিক ফরমান জারির মাধ্যমে সংবিধানকে ক্ষত-বিক্ষত করেছে, গণতন্ত্র ও জাতীয় সংসদের উপর আঘাত হেনেছে। অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল, সামরিক ও স্বৈরশাসনের পালাবদলের মধ্যদিয়ে সংবিধানের চার মূলনীতিকে আঘাত করা হয়েছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকারীদের বিচারের পথ বন্ধ করার জন্য ১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় সংসদে ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ’কে কালো আইনে পরিণত করা ছিল সংসদীয় ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। পরবর্তীতে ৭ম জাতীয় সংসদে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ' বাতিলের মধ্য দিয়ে ইতিহাসের নিকৃষ্টতম ও নির্মম ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ এর বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যাকাণ্ডের বিচারের পথ সুগম করা হয়।

সরকারপ্রধান বলেন, সরকারের জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণের মধ্যদিয়ে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় মহান জাতীয় সংসদ অনন্য ভূমিকা পালন করছে। সংসদীয় স্থায়ী কমিটিসমূহ এক্ষেত্রে গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৭৯ অনুচ্ছেদের আলোকে সংসদের নিজস্ব সচিবালয়ের বিধান প্রতিপালনে সরকারি ও বিরোধী দলের যৌথ প্রয়াসে সংসদ সচিবালয় আইন, ১৯৯৪ সংসদে গৃহীত হয় যার ফলে সংসদ ও সংসদ সচিবালয়ের কাজ আরও গতিশীল ও বেগবান হয়েছে।

১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্ব চালু করা হয়। সরকারের অধিকতর স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলির চেয়ারম্যান হিসেবে মন্ত্রীর পরিবর্তে সংসদ- সদস্যদের নির্বাচিত করা হয়েছে। বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের থেকে স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান নির্বাচিত করা হচ্ছে।

কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশন (সিপিএ) এবং ইন্টার পার্লামেন্টারি ইউনিয়ন (আইপিইউ) দুইটি বৈশ্বিক সংসদীয় সংস্থার (Parliamentary Apex Body) প্রধান হিসেবে ২০১৪ থেকে ২০১৭ সালে দশম জাতীয় সংসদের নেতৃত্বদান বাংলাদেশ জাতীয় সংসদকে অধিষ্ঠিত করেছে এক অনন্য উচ্চতায়। দেশের জন্য বয়ে এনেছে এক বিরল সম্মান। এ অর্জন ছিল বাংলাদেশে গণতন্ত্রের প্রতি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের আস্থার প্রতীক।

‘নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মহান জাতীয় সংসদ বিশ্বের বুকে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। নবম জাতীয় সংসদে জাতির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন নারী স্পিকার পদে নির্বাচিত হন যা জেন্ডার সমতা নিশ্চিতকরণ ও নারী ক্ষমতায়নের এক উজ্জ্বল মাইলফলক। বর্তমান সংসদের স্পিকার, মাননীয় সংসদ-নেতা, মাননীয় সংসদ উপনেতা, বিরোধীদলের নেতা, সরকারি দলের একজন হুইপ এবং ৪ জন নারী সংসদ সদস্য স্থায়ী কমিটির সভাপতির ভূমিকা পালন করছেন। রাজনীতিতে তথা রাষ্ট্র পরিচালনায় নারীর অংশগ্রহণ উৎসাহিত করার লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসন ৫০ এ উন্নীত করা হয়েছে। এ জাতীয় সংসদ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীতে 'মুজিববর্ষ' এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি উদযাপনের বিরল গৌরবের অধিকারী’—যোগ করেন শেখ হাসিনা।

‘জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকীতে সংসদ কক্ষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি স্থাপন এক অনন্য নজির। সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপনের এই লগ্নে মহান সংসদ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি সুগভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছে। শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছে ৩০ লক্ষ মহান শহীদ ও ২ লাখ নির্যাতিত মা বোনদের। বিনম্র শ্রদ্ধা জানাচ্ছে জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমেদ, এ এইচ এম কামারুজ্জামান ও ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী এর প্রতি। সব মুক্তিযোদ্ধাদের সালাম এবং বাংলাদেশের জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থন ও সহযোগিতার জন্য তাদের প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছে।’

প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাব

বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের ৫০ বছর পূর্তির এই মাহেন্দ্রক্ষণে সংসদের অভিমত এই যে, “বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ সংসদীয় গণতন্ত্রের কেন্দ্রবিন্দুরূপে জনগণের জীবনমান উন্নয়ন এবং আশা আকাঙ্খার সফল বাস্তবায়নে অব্যাহতভাবে কার্যকর ও সক্রিয় ভূমিকা রাখবে এবং এর মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র হবে সুসংহত, শোষণমুক্ত সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে, সকলের জন্য সাম্য ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে, সংবিধানের এ অঙ্গীকারসমূহ পূরণে আমরা সকলে একযোগে কাজ করবো, গড়ে তুলব আগামীর সুখী, সমৃদ্ধ, উন্নত, ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত স্মার্ট বাংলাদেশ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা- এই হোক আমাদের প্রত্যয়"।

(ঢাকাটাইমস/০৭এপ্রিল/জেএ/ইএস)

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
কর্মমুখী শিক্ষায় জোর প্রধানমন্ত্রীর, সংসদীয় সভায় ৭ মন্ত্রণালয়ের কাজের মূল্যায়ন
জলবায়ুজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় পর্যাপ্ত বাজেটের দাবি বিশেষজ্ঞদের
সীমান্তে অসুস্থ বিজিবি সদস্যকে হেলিকপ্টারে চট্টগ্রাম সিএমএইচে স্থানান্তর
বনাঞ্চল ধ্বংসের উদ্যোক্তা পরিবেশমন্ত্রী : আসিফ মাহমুদ
বিশেষ প্রতিবেদন তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা