৭ মাসে ২২০ আত্মহত্যা, ঠাকুরগাঁওয়ে নেই মানসিক চিকিৎসা

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার বেগুনবাড়ি গ্রামের কিশোর হাফিজুর রহমান (১৬)। মা-বাবার একমাত্র সন্তান। পড়াশোনার পাশাপাশি হাফিজুর স্থানীয় মসজিদে হেফজ পড়ত। মায়ের সঙ্গে ‘অভিমান’ করে গত ১৭ আগস্ট কীটনাশক পান করে এই কিশোর। হাসপাতালে নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত বাঁচানো যায়নি তাকে।
হাফিজুরের মৃত্যুর পর ভেঙে পড়া মা বলেন, ‘ও আমাকে একবারও জানাল না কী কষ্টে আছে সে! যদি জানতাম, বুঝতাম তাহলে আজ হয়তো বেঁচে থাকত আমার ছেলে।’
সন্তান কিংবা কোনো স্বজনের আত্মহননের ঘটনায় এমন কান্না ঠাকুরগাঁও জুড়েই শোনা যাচ্ছে। দেশের সর্ব উত্তরের জেলায় বেড়েইে চলেছে আত্মহত্যার ঘটনা। তার কিছু ঘটনা আড়ালে থেকে সামাজিক লজ্জার ভয়ে। সরকারি হিসাবে গত সাড়ে সাত মাসে এই জেলায় আত্মহত্যার রেকর্ড হয়েছে ২২০টি।
আত্মহত্যার বিপুল প্রবণতার চলতে থাকলেও নেই কোনো প্রতিকার কিংবা প্রতিরোধের চেষ্টা। জেলা সদর হাসপাতাল বা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেই কোনো মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ। বিষণ্নতা, মানসিক চাপ কিংবা আত্মহত্যাপ্রবণ রোগীরা পাচ্ছেন না কোনো বিশেষায়িত চিকিৎসা।
ঠাকুরগাঁওয়ের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের জিআরও শাখার তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি থেকে ১৭ আগস্ট পর্যন্ত সাত মাসে জেলায় আত্মহত্যা করেছে ২২০ জন।
থানা ও উপজেলাভিত্তিক হিসাব বলছে, পীরগঞ্জ উপজেলায় ৫৮ জন, ঠাকুরগাঁও সদরে ৫৩ জন, রাণীশংকৈলে ২৮ জন, বালিয়াডাঙ্গীতে ২৭ জন, হরিপুরে ২১ জন, ভুল্লি থানায় ২২ জন ও রুহিয়া থানায় ১৪ জন আত্মহত্যা করেন এই সময়ে।
অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের জিআরও ফরিদ উজ্জামান জানান, এসব আত্মহত্যার ঘটনাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংঘটিত হয়েছে গলায় ফাঁস দিয়ে।
বিভিন্ন কারণে এসব আত্মহত্যা ঘটেছে। পুলিশ বলছে, প্রেমে ব্যর্থতা, মা-বাবার সঙ্গে অভিমান, দারিদ্র্য, ঋণ ও পারিবারিক কলহ এ অঞ্চলে আত্মহত্যার প্রধান কারণ।
২ আগস্ট হরিপুর উপজেলার সাবেক ব্র্যাক ব্যাংক কর্মকর্তা মর্তুজা আলম (৪৫) স্ত্রীর ওপর অভিমান করে গলায় ফাঁস দেন। কয়েক দিন আগে সদর উপজেলায় নবম শ্রেণির এক ছাত্রী পড়াশোনার চাপ সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঠাকুরগাঁও জেনারেল হাসপাতালের এক চিকিৎসক বলেন, অনেকে আত্মহত্যার চেষ্টা করে হাসপাতালে আসে। কিন্তু সামাজিক লজ্জার ভয়ে পরিবারগুলো বিষয়টি গোপন রাখে। তাই প্রকৃত সংখ্যাটা আরও বেশি হতে পারে।
এদিকে জেলা সদর হাসপাতাল বা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেই কোনো মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ। বিষণ্নতা, মানসিক চাপ কিংবা আত্মহত্যাপ্রবণ রোগীরা পাচ্ছেন না কোনো বিশেষায়িত চিকিৎসা।
সিভিল সার্জন বলেন, ‘ঠাকুরগাঁও সীমান্তবর্তী এলাকা। এখানে মাদক সহজলভ্য। মাদকাসক্তি ও পারিবারিক অশান্তি আত্মহত্যার অন্যতম কারণ। এই বিষয়টি নিয়ে গবেষণা জরুরি। যদিও উপজেলা পর্যায়ে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ নেই, তবে মেডিকেল অফিসারদের রোগীদের কাউন্সেলিং করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
ঠাকুরগাঁওয়ের মাস্টারপাড়া কল্যাণ ট্রাস্টের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এম এ জুনাইদ বলেন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবার অভাব এখানে প্রকট। মানুষ কষ্টের সময় কাউকে পাশে পায় না মনের কথা বলার জন্য। একসময় হতাশ হয়ে অনেকে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘আত্মহত্যার প্রবণতা কমাতে স্কুল-কলেজ পর্যায় থেকেই সচেতনতা কার্যক্রম চালানো জরুরি।
পুলিশ সুপার শেখ জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘ঠাকুরগাঁওয়ে আত্মহত্যার ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। আমরা বিট পুলিশিংয়ের মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করার চেষ্টা করছি। আমাদের পরিকল্পনা আছে প্রতিটি ইউনিয়নে সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান করার। মানুষকে জানাতে চাই—কোনো সমস্যার সমাধান আত্মহত্যা নয়।’
(ঢাকাটাইমস/১৬সেপ্টেম্বর/মোআ)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













































