আস্থাহীনতার বৃত্তে পুঁজিবাজার ২০২৫: হতাশাবন্দি সালতামামি

বাংলাদেশের পুঁজিবাজার একটি দীর্ঘমেয়াদি আস্থাহীনতার সংকটে নিমজ্জিত। সূচকের পতন, লেনদেনের স্থবিরতা, বিনিয়োগকারীদের ধারাবাহিক ক্ষতি এবং নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্তহীনতা—সব মিলিয়ে বাজার যেন নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে ক্লান্ত। সেই হতাশাজনক ধারাবাহিকতারই আরেকটি বছর ছিল ২০২৫।
বছর শেষে বলা যায়, বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা পূরণে বছরটিতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার। শুধু অভ্যন্তরীণ মানদণ্ডে নয়, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনাতেও ২০২৫ সালে সবচেয়ে দুর্বল পারফরম্যান্সের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ছিল শীর্ষে, যা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে সংঘটিত গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় যে পরিবর্তন আসে, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন হওয়ার কথা ছিল পুঁজিবাজারে। দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম, দুর্নীতি, প্রভাবশালী মহলের কারসাজি ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার নীরবতার বিরুদ্ধে বিনিয়োগকারীদের ক্ষোভ ছিল প্রবল। সেই প্রেক্ষাপটে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে বাজারসংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা ছিল—অতীতের গলদ দূর হবে, অনিয়ম-কারসাজির শাস্তির সংস্কৃতি চালু হবে, আস্থা ফিরবে এবং বাজার ঘুরে দাঁড়াবে। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির ব্যবধান আগের মতোই রয়ে গেছে, বরং কিছু কিছু ক্ষেত্রে তা আরও গভীর হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কিছু অনিয়মের ঘটনায় অপরাধীদের বিরুদ্ধে বড় অঙ্কের আর্থিক জরিমানার ঘোষণা আসে। কাগজে-কলমে এসব সিদ্ধান্ত কঠোর বলে মনে হলেও বাস্তবে তা কার্যকর হয়নি। জরিমানার টাকা আদায় না হওয়া, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়া এবং তদন্ত প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা বাজারে বার্তা দিয়েছে—আগের মতোই দায়মুক্তির সংস্কৃতি বহাল রয়েছে। এতে করে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা ফেরার বদলে সন্দেহ ও অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।
পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করার জন্য সরকারি ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে তালিকাভুক্ত করার যে প্রতিশ্রুতি ও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল, তা বাস্তবায়িত হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের সরাসরি নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও কোনো বড় সরকারি বা বহুজাতিক কোম্পানিকে বাজারে আনা যায়নি। ফলে বাজারের গভীরতা বাড়েনি, ভালো মানের শেয়ারের ঘাটতি থেকেই গেছে এবং বিনিয়োগকারীদের সামনে নতুন সম্ভাবনার কোনো দরজা খোলেনি।
২০২৫ সালে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং বাজারের অন্যান্য অংশীজন—যেমন ব্রোকারেজ হাউস, বিনিয়োগকারী সংগঠন ও তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে দূরত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অংশীজনদের মতামত উপেক্ষিত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে বারবার। ফলে যেসব সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেগুলো মাঠপর্যায়ে কার্যকর হয়নি বা বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে ব্যর্থ হয়েছে।
পুঁজিবাজার সংস্কারের লক্ষ্যে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছিল, যা শুরুতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কিছুটা আশার সঞ্চার করেছিল। কিন্তু বছর শেষে এসে দেখা যায়, সেই টাস্কফোর্স থেকে উল্লেখযোগ্য কোনো কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়িত হয়নি। কেবল মার্জিন রুলস বিধিমালা এবং মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে, যা প্রয়োজনীয় হলেও পুঁজিবাজারের দীর্ঘদিনের রোগ সারানোর জন্য মোটেই যথেষ্ট নয়। বাজার কাঠামোর স্বচ্ছতা, করপোরেট গভর্ন্যান্স, তালিকাভুক্তির মানদণ্ড, ডিলিস্টিং প্রক্রিয়া কিংবা কারসাজি প্রতিরোধ—এসব মৌলিক বিষয়ে কার্যকর সংস্কারের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।
২০২৫ সালে পুঁজিবাজারে ঘটে যাওয়া সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত ঘটনাগুলোর একটি ছিল পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের শেয়ার লেনদেন স্থগিত করা। বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ বিবেচনায় না নিয়ে হঠাৎ এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা বাজারে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। শুধু লেনদেন স্থগিত করাই নয়, ওই পাঁচটি ব্যাংকের প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকার শেয়ারহোল্ডার ইক্যুইটি জিরো রেট ধরে বিলুপ্ত করার সিদ্ধান্ত বিনিয়োগকারীদের জন্য ছিল একরকম অর্থনৈতিক মৃত্যুদণ্ড। এতে করে লাখ লাখ সাধারণ বিনিয়োগকারী সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছেন। অনেকের সারা জীবনের সঞ্চয় মুহূর্তের মধ্যে কাগজে পরিণত হয়েছে।
এখানেই প্রশ্ন উঠে—ব্যাংক ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা, ঋণ জালিয়াতি বা প্রশাসনিক অনিয়মের দায় কেন শেয়ারহোল্ডারদের কাঁধে চাপানো হলো? কেন বিকল্প পুনর্গঠন বা পুনর্বাসন পরিকল্পনা নেওয়া হলো না? কেন বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে কোনো পরামর্শ করা হয়নি? এই প্রশ্নগুলোর সন্তোষজনক উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। বরং এই সিদ্ধান্ত বাজারে একটি ভয়াবহ নজির স্থাপন করেছে—যেকোনো সময় নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্তে বিনিয়োগকারীরা নিঃস্ব হয়ে যেতে পারেন।
এর পাশাপাশি তালিকাভুক্ত আরও আটটি ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা বাজারে অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ারহোল্ডারদের ভবিষ্যৎ কী হবে, তারা কীভাবে ক্ষতিপূরণ পাবেন—এ বিষয়ে স্পষ্ট কোনো দিকনির্দেশনা নেই। ফলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে এবং নতুন বিনিয়োগের প্রবণতা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
সব মিলিয়ে ২০২৫ সাল পুঁজিবাজারের জন্য ছিল প্রত্যাশাভঙ্গের আরেকটি বছর। সূচকের পতন, লেনদেনের সংকোচন, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের নিষ্ক্রিয়তা এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ক্রমাগত ক্ষতি—সবকিছু মিলিয়ে বাজার কার্যত আস্থার সংকটে পতিত হয়েছে। যে পুঁজিবাজার অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের একটি প্রধান মাধ্যম হওয়ার কথা, সেটি এখন নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতেই হিমশিম খাচ্ছে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে কেবল নীতিমালার খসড়া বা টাস্কফোর্স গঠনই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, শক্তিশালী ও স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা, জবাবদিহিমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সর্বোপরি বিনিয়োগকারীদের স্বার্থকে সর্বাগ্রে রাখার মানসিকতা। অপরাধীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, জরিমানা আদায়ের কার্যকর ব্যবস্থা, মানসম্মত কোম্পানির তালিকাভুক্তি এবং বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ ছাড়া আস্থা ফেরানো সম্ভব নয়।
নতুন বছরের প্রথম দিনের লেনদেন হয়েছে গতকাল ৪ জানুয়ারি। ২০২৫ সালের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি। সেই মতো নতুন করে ভাবতে হবে, সংকট উত্তরণের পথে বাধাগুলো কাটিয়ে পুঁজিবাজার-বান্ধব আন্তরিকতা দেখাতে হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে। বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএসইসি, আইসিবি, মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ ও তা বাস্তবায়নে আন্তরিক হলে ভবিষ্যতে পুঁজিবাজার আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে বলে বিশ্বাস বিনিয়োগকারীদের।
(ঢাকাটাইমস/৫জানুয়ারি/মোআ)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













































