নাগরিকবান্ধব রাষ্ট্র গড়তে সবার আগে প্রয়োজন দুর্নীতিমুক্ত পুলিশ!

দেশে নতুন সরকার শপথ নেওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন মাধ্যমে নাগরিক সমাজের নানা প্রত্যাশা ও প্রস্তাব উঠে আসছে। আমার চাকরিজীবনের গত এক দশকে আমি অজস্রবার যে কথা বলেছি, যে বক্তব্য বিভিন্ন ফোরামে তুলে ধরেছি, সেটিই আবার পুণর্ব্যক্ত করতে চাই- দেশে জনহয়রানিমুক্ত ও নাগরিকবান্ধব প্রশাসন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে সর্বাগ্রে প্রয়োজন একটি শতভাগ দুর্নীতিমুক্ত পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলা।
'পুলিশ জনগনের বন্ধু' এই বহুল উচ্চারিত আপ্তবাক্যটি যেন শুধু স্লোগান হয়ে না থাকে; বরং যুগযুগের সন্দেহ- অবিশ্বাসের অনুভূতিতে বদল এনে পুলিশকে জনগনের প্রকৃত আস্থার ঠিকানায় পরিণত করতে, একেকজন পুলিশ সদস্যকে সমাজে বিশ্বাস, সম্মান, শ্রদ্ধার প্রতীক হিসেবে গড়ে তুলতে, সর্বোপরি নাগরিকেরা যেন যে কোনো দুর্যোগ-দুর্বিপাকে নিঃশঙ্কচিত্তে পুলিশের শরণাপন্ন হতে পারেন, পুলিশের ওপর ভরসা রাখতে পারেন এবং যথাযথ পুলিশি সেবা পেয়ে নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্রের সঙ্গে একাত্ম অনুভব করতে পারেন- এই লক্ষ্য অর্জনে একটি পেশাদার ও দুর্নীতিমুক্ত পুলিশ বাহিনী প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য। নতুন সরকারের নিকট আমার বিনীত অনুরোধ— এই কাজটিকে প্রথম ও সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হোক।
অনেকে প্রশ্ন তুলতে পারেন–অন্যান্য দপ্তর কি তবে দুর্নীতিমুক্ত? অথবা অন্যত্র দুর্নীতি অব্যাহত থাকলে শুধু পুলিশ বিভাগ দুর্নীতিমুক্ত হয়ে কতটা সুফল এনে দিতে পারবে? বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ মানুষ পুলিশের কাছে আসেন চরম নিরুপায় অবস্থায়। উল্টো দিক থেকে বললে, সমাজের অসহায় ও ক্ষমতাহীন জনগোষ্ঠীই মূলত পুলিশের সেবাপ্রার্থী। এই শ্রেণির মানুষ দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯৫ শতাংশ বা তারও বেশি হিস্যা পরিগ্রহ করেন। অন্যদিকে বিত্তবান বা নানা প্রক্রিয়ায় ক্ষমতাবান ব্যক্তিরা অনেক ক্ষেত্রেই থানাপুলিশ এড়িয়ে বিকল্প উপায়ে সমস্যার সমাধান করে ফেলেন এবং চলতে-ফিরতে পুলিশি হয়রানির মুখোমুখিও হন তুলনামূলক কম।
এই বাস্তবতায়, একজন অসহায় মানুষকে বাধ্য করে অল্প পরিমাণ ঘুষ নেওয়াও নৈতিকতার বিচারে অন্যত্র বড় অঙ্কের দুর্নীতির চেয়ে শত-সহস্রগুণ বেশি জঘন্য ও নিন্দনীয়। জনমত গঠনে এই শ্রেণির মানুষের সরাসরি যুক্ততা এবং সংখ্যাগত বিশালতা এঁদের সাথে সংঘটিত ছোটখাটো এসব অন্যায়,অনিয়মের সামাজিক নেতিবাচক প্রভাবও অনেক বেশি বিস্তৃত করে তোলে, যা রাষ্ট্রের প্রতি সামগ্রিক অনাস্থা তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে। এছাড়া জনসংখ্যার ৯৫% যদি তাদের বিপদের আশ্রয়স্থলে রাষ্ট্রীয় সেবা নিতে গিয়ে প্রতিনিয়ত হয়রানির মুখে পড়েন, ঘুষ দিতে বাধ্য হন, মাদক ব্যবসায়ী, চাঁদাবাজ, স'ন্ত্রা'সীদেরকে দমনের বদলে পুলিশের তরফে তাদের কাছ থেকে মাসোহারা নিয়ে নির্বিঘ্নে তাদের সমাজ বিনাশী অপকর্ম চালিয়ে যাওয়ার অবাধ লাইসেন্স দেওয়া প্রত্যক্ষ করেন, তখন প্রকাশ্য প্রতিবাদ করার মতো সাহস সঞ্চয় করতে না পারলেও গোটা রাষ্ট্রব্যবস্থার ওপরই তারা দিনে দিনে বীতশ্রদ্ধ হয়ে ওঠেন।
প্রতিষ্ঠার দেড় শতাধিক বছর ধরে বিরাজমান ,বেশিরভাগ সময় রাষ্ট্রের আশ্রয়- প্রশ্রয়- ইচ্ছায়, এই যে সীমাহীন নীতিহীনতা, তা পুলিশ সম্পর্কে সমাজের নানা স্তরের মানুষের মনোজগতে অমোচনীয় কালির মতো দীর্ঘস্থায়ী গভীর অবিশ্বাসের সঞ্চার করে রেখেছে-রাখছে। ফলস্বরূপ কর্মক্ষেত্রে পুলিশকে প্রায়শই নানা মহলের অসহযোগিতার মুখে পড়তে হয়। অথচ জনগণের সহযোগিতা ও অংশগ্রহণ ব্যতীত ট্রু সেন্সে পুলিশের ফাংশনিং প্রায় অসম্ভব।
সর্বোপরি দেশের এই সিংহভাগ মালিকেরা যখন তাদের বিপদের মুহূর্তে একমাত্র কাঙ্ক্ষিত আশ্রয়স্থলে চরম বিরূপ পরিস্থিতির মুখোমুখি হন, তখন রাষ্ট্র কর্তৃক গৃহীত অন্য সকল কল্যাণ-পদক্ষেপ, তা যত জনবান্ধবই হোক, তাদের নিকট আবেদন হারায়। তাই অন্য সকল উন্নয়ন, অন্য সকল ইতিবাচকতা প্রাসঙ্গিক করে তুলতে সবার আগে প্রয়োজন দুর্নীতি ও জনহয়রানিমুক্ত, আধুনিকমনষ্ক, পেশাদার একটি পুলিশ বাহিনী গঠন করা। বলাবাহুল্য, পুলিশ যখন জনআস্থাকে সঙ্গী করে, জনসমর্থন- সহযোগিতা নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করতে শুরু করবে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বহুল কাঙ্ক্ষিত ইতিবাচক পরিবর্তনও তখনই রাতারাতি দৃশ্যমান হবে।
দুর্নীতির সূচকে দেশের অন্য বহু প্রতিষ্ঠানের অবস্থা হয়তো পুলিশের চেয়েও অনেক বেশি উদ্বেগজনক। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার জরিপের ইঙ্গিতও এমনটাই। কিন্তু ৯৫ শতাংশ জনগনের সরাসরি সেবাদাতা এবং রাষ্ট্র ও সরকারের ভাবমূর্তি বিনির্মানের সরাসরি অনুঘটক হওয়া এবং জনগণের সঙ্গে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সংযোগ থাকার বাস্তবতায় পুলিশ বাহিনীকে দুর্নীতিমুক্ত করার দিকেই নজরে দিতে হবে সর্বাগ্রে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, পুলিশ বাহিনী যদি সত্যিকার অর্থে দুর্নীতিমুক্ত হয়, তাহলে অন্যান্য দপ্তরেও দুর্নীতির সুযোগ অনেকাংশে সংকুচিত হয়ে যাবে। সমাজের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা, জনগণের সাথে সবচেয়ে বেশি সম্পৃক্ত এবং দুর্নীতির সংশ্লেষমুক্ত (হাইপোথেটিক্যাল) বাহিনীটির দৃষ্টি ও হস্তক্ষেপ এড়িয়ে কারো তরফে অনিয়ম দুর্নীতি চালিয়ে যাওয়া সহজ নয় কিন্তু!
দুর্নীতি বা ঘুষগ্রহণ ছাড়াও হরহামেশাই পুলিশের বিরুদ্ধে আরো বেশকিছু অভিযোগের কথা শুনতে পাওয়া যায়। পুলিশি হয়রানি, জিডি ও মামলা দায়ের এবং সেসবের তদন্তেকার্যে পক্ষপাত, অমানবিকতা, রূঢ় আচরণ, অনৈতিক কার্যকলাপে যুক্ততা, অবৈধ আদেশ প্রতিপালনজনিত নীতিবিরুদ্ধ ও একদেশদর্শী অবস্থান গ্রহণ ইত্যাদি। দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা হলেও এসব কার্যকলাপ থামবে কি? আমি বলব, থামতে বাধ্য। কারণ বিপথগামী পুলিশ সদস্যদের যত অপেশাদার কাজ, তার পূর্বাপর বিশ্লেষণ করা হলে দেখা যাবে, সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা কর্তৃক অবৈধ আর্থিক উপার্জনের প্রত্যাশাই এর পেছনে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। মূল রোগ দুর্নীতিকে বিদেয় করা গেলে অন্যান্য সব উপসর্গ আপনাতেই দূর হয়ে যাবে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের দুর্নীতিবিরোধী কঠোর অবস্থানের ঘোষণা ইতোমধ্যেই আশা জাগিয়েছে। আমার অনুরোধ—এই লড়াইয়ের সূচনা হোক পুলিশ বাহিনীকে দিয়েই। এতে কিছু অসাধু ব্যক্তি অসন্তুষ্ট হতে পারেন, কিন্তু সৎ, কর্মোদ্যমী পুলিশ সদস্যদের বৃহৎ অংশ এবং পুলিশকে একমাত্র আশ্রয়স্থল হিসেবে গণ্যকারী দেশের জনসংখ্যার সেই ৯৫ শতাংশ এতে উপকৃত হবেন। উপকৃত হবে বাংলাদেশ।
যুগযুগ ধরে দুর্নীতি নামক যে ব্যাধি পুলিশ বাহিনীর রন্ধ্রেরন্ধ্রে আসন গেড়ে বসে আছে, তার মূলোৎপাটন করতেই হবে। জনমুখী ও নাগরিক-বান্ধব কল্যান রাষ্ট্র গড়তে, দুই লক্ষাধিক পুলিশ সদস্যকে জনমানসে তাদের প্রাপ্য মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করতে, পুলিশ বাহিনীতে অতি কাঙ্ক্ষিত পেশাদারত্ব ও চেইন অব কমান্ড প্রতিষ্ঠা করতে ও সর্বোপরি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কার্যকর উন্নতিবিধান করতে সবার আগে দুর্নীতির সাথে যুক্ত পুলিশ সদস্যদেরকে, তারা যে পদমর্যাদারই হোন, খুঁজে বের করে বাহিনী থেকে ঝেঁটিয়ে বিদায় ও উপযুক্ত বিচারের মুখোমুখি করার কোনো বিকল্প নেই।
যে ইউনিফর্ম আমার সম্মানের প্রতীক, সেই পবিত্র ইউনিফর্মকে যারা কলুষিত করেছে-করছে, তাদের স্থান বাহিনীতে নয়, বিচারালয়ে হোক। অসহায় মানুষের প্রকৃত সহায়, নিরাশ্রয় মানুষের পরম আশ্রয়স্থল আর অপরাধীদের আতঙ্কের নামান্তর হয়ে উঠুক প্রাণের বাংলাদেশ পুলিশ। প্রশ্নহীন আস্থা, বিশ্বাস, ভালবাসায় দেশবাসীর নিকট অধিষ্ঠান হোক রাত-দিন অমানুষিক পরিশ্রম করে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার মহান দায়িত্ব পালনকারী দুই লক্ষাধিক পুলিশ সদস্যের।
ভালবাসি বাংলাদেশ পুলিশ আস্থায়-বিশ্বাসে বাংলাদেশ পুলিশ।
লেখক: বিসিএস (পুলিশ), অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, সদর সার্কেল, নরসিংদী
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













































