উৎসবের ঝলকানিতে বাড়ছে বিদ্যুতের চাপ

শোয়েব সাম্য সিদ্দিক
  প্রকাশিত : ১০ মার্চ ২০২৬, ২১:১৮
অ- অ+

রমজান এলে বাতাসেই যেন অন্য রকম একটা গন্ধ লাগে। সেহরির ভোরে পাড়ার গলি নিঝুম থাকে, দূরের মসজিদ থেকে আজানের সুর ভেসে আসে। মনে হয় সময়টা একটু ধীর হয়ে গেছে। ভোরের আগে যারা ওঠে, চোখে ঘুম থাকলেও মনে এক ধরনের শান্তি থাকে। দিনের বেলা রোদের মধ্যেও মানুষ সংযম নিয়ে চলে—কথায় কম, আচরণে নম্র। ইফতারের আগে বাজারে আলাদা ব্যস্ততা দেখা যায়। ক্লান্ত মুখেও তখন একটা আলো থাকে, কারণ সন্ধ্যা শুধু সময় নয়, অপেক্ষার পুরস্কার। খেজুর হাতে আজান শোনার সেই মুহূর্ত শরীরের ক্ষুধা যেমন মেটায়, তেমনি মনে এক তৃপ্তিও এনে দেয়। রমজান এভাবেই ধৈর্য, সহমর্মিতা আর আত্মশুদ্ধির কথা মনে করিয়ে দেয়—নিঃশব্দে, প্রতিদিন।

রমজানের পনেরোটি দিন পার হতে না হতেই শহরের চেহারা বদলাতে শুরু করে। দোকানের সামনে ব্যানার ঝোলে, শপিং মলের প্রবেশপথে সাজানো হয় রঙিন সব আলোর মালা, ফুটপাতের দোকানগুলোতেও লাগানো হয় নতুন সাজ। সন্ধ্যা নামলেই যেন একটা ভিন্ন শহর জেগে ওঠে, পুরো এলাকাটা যেন একটা উৎসবের মাঠে পরিণত হয়। ঝলমলে আলোয় ভেসে যাওয়া বাজারগুলো দেখতে উৎসবের মতো লাগে, মানুষ সেদিকে ছুটে যায়, চোখ জুড়িয়ে যায়, মন ভরে যায়। ব্যবসায়ীরাও জানেন, ঈদের এই মৌসুমটি তাঁদের কাছে বছরের সবচেয়ে মূল্যবান সময়, বছরের বাকি মাসগুলোর ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ। তাই ক্রেতাদের টানতে আলোকসজ্জায় তাঁরা কোনো কমতি রাখতে চান না, একটু বেশিই ব্যয় করতে রাজি থাকেন।

কিন্তু এই ঝলমলে আলোর আড়ালে একটি প্রশ্ন চুপচাপ বসে থাকে, কেউ সেদিকে তাকায় না বলে সে প্রশ্ন আরও জোরে চাপা পড়তে থাকে। যে বিদ্যুৎ খরচ করে এই আলো জ্বালানো হচ্ছে, তার কতটুকু সত্যিই দরকার? রমজানের একেবারে শুরু থেকেই যদি বাজারগুলো এভাবে আলোর সমুদ্রে ডুবে থাকে, তাহলে প্রথম দশ-বারো দিন সেই আলো কার জন্য জ্বলছে? ক্রেতার ভিড় তখনো জমেনি ভালোমতো, কেনাকাটার আসল হুজুগ তখনো দানা বাঁধেনি। তবুও রাতের পর রাত জ্বলতে থাকে বাহারি বাতি, বিদ্যুতের মিটার ঘোরে অবিরাম, থামার কোনো তাড়া নেই। এই বিদ্যুতের একটা বড় অংশ যদি অন্য কোথাও কাজে আসত, তাহলে হয়তো কোনো পরিবারের রাতটা একটু বেশি আলোয় ভরত।

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে একটু ভাবলেই বোঝা যায়, এই অপচয় কতটা বেমানান, কতটা অসঙ্গত। এপ্রিল মাস এলে তাপমাত্রা যখন চড়তে থাকে, তখন ঘরে ঘরে ফ্যান আর এসির চাহিদা বেড়ে যায় লাফিয়ে লাফিয়ে, কারণ গরমটা এ দেশে শুধু অস্বস্তির নয়, অনেক সময় জীবনের জন্যও ঝুঁকির। মাঠে মাঠে সেচ পাম্প চলে সারাক্ষণ, কারখানায় উৎপাদন থামে না কোনো শিফটেই, শহরের অফিস পাড়ায় লিফট আর আলোর চাহিদাও কম নয়। এত চাহিদার ভার বহন করতে গিয়ে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা একটু হলেও হাঁপিয়ে ওঠে, গ্রিডে চাপ পড়ে, সরবরাহ কমে আসে। আর সেই হাঁপানির ফলভোগী হয় সাধারণ মানুষ।

যখন দেখি শপিং মলের সামনে হাজার হাজার রঙিন বাতি অকারণে জ্বলছে, তখন মনে একটা তীব্র অস্বস্তি জাগে, একটা প্রশ্ন বুকে খোঁচা দেয়। রমজান মাসে লোডশেডিং হয়ে যদি সেহরির সময় বিদ্যুৎ চলে যায়, রান্নাঘরে কতটা উদ্বেগ তৈরি হয়? ইফতারের আগে দমবন্ধ গরমে পাখা বন্ধ থাকলে রোজাদারের কতটা কষ্ট বাড়বে? তারাবির পর ঘরে ফিরে বিদ্যুৎহীন ঘরে শুতে যাওয়া মানুষটির রাতটা কেমন কাটবে?

বিদ্যুৎ খাতের আরেকটি পুরোনো ঘা হলো সিস্টেম লস, যা বছরের পর বছর ধরে এ দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার পায়ে শিকলের মতো আটকে আছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় ঠিকই, কিন্তু পথে পথে একটা বড় অংশ হারিয়ে যায়, পুরোনো লাইনের ফাঁক দিয়ে, অবৈধ সংযোগের সুতো বেয়ে, ব্যবস্থাপনার ফাঁকফোকরে গলে পড়ে। যে বিদ্যুৎ গ্রাহকের ঘরে পৌঁছানোর কথা ছিল, সে বিদ্যুৎ পথেই মিলিয়ে যায়, কোনো হিসাব ছাড়া, কোনো জবাবদিহি ছাড়া। এই অপচয় যদি কমানো যেত, যদি পুরোনো লাইন বদলে দেওয়া যেত, তাহলে সংকটের চাপ অনেকটাই কমত। কিন্তু সেই কাজে যতটা মনোযোগ, যতটা বিনিয়োগ, যতটা সদিচ্ছা দরকার, সেটা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত হয়নি।

ব্যবসায়ীদের প্রতি একটু অনুরোধ রাখতে ইচ্ছে করে, বিনয়ের সঙ্গে। আলোকসজ্জার পেছনে যে টাকাটা খরচ হয়, সেই টাকার কিছুটা যদি পণ্যের দামে ছাড় হিসেবে ক্রেতার পকেটে ফেরত যেত, তাহলে দোকানের প্রতি মানুষের টান আরও বাড়ত, আস্থা আরও গভীর হতো। ঝলমলে আলো চোখ টানে ঠিকই, মানুষ একবার পা বাড়ায়, কিন্তু ন্যায্য দাম মানুষকে বারবার ফিরিয়ে আনে, মুখে মুখে সুনাম ছড়ায়। কোনটি বেশি লাভজনক, সেটা হয়তো ব্যবসায়ীরা নিজেরাই ভেবে দেখতে পারেন, একটু ঠান্ডা মাথায় হিসাব কষলেই উত্তর মিলে যাবে। উৎসবের আলোয় যদি সংযমের ছোঁয়া থাকে, তাহলে সেই আলোর মূল্যটা আরও বেড়ে যায়।

সরকারের দিক থেকেও কার্যকর পদক্ষেপের কথা উঠে আসে, এবং সেই প্রত্যাশা অমূলক নয়। বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্পষ্ট নীতিমালা থাকা দরকার এবং সেটা কেবল কাগজে নয়, মাঠেও কার্যকরভাবে প্রয়োগ হওয়া দরকার। পুরোনো বিতরণ লাইন সংস্কার, স্মার্ট মিটারিং চালু এবং গ্রিড ব্যবস্থার আধুনিকায়নে বিনিয়োগ বাড়ানো এখন আর ঐচ্ছিক বিষয় নয়, এটা জরুরি প্রয়োজন, এটা একটা দায়বদ্ধতার প্রশ্ন। সবচেয়ে বড় কথা হলো, শহরের বাণিজ্যিক এলাকায় অতিরিক্ত আলো জ্বলার সময় যেন গ্রামের কোনো পরিবার অন্ধকারে বসে না থাকে, একটি শিশু যেন বই খুলতে না পেরে ঘুমিয়ে না পড়ে, সেই ভারসাম্যটুকু নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

এই প্রসঙ্গে একটি খবর মনে বিশেষ আশার আলো জ্বালায়, একটা ভরসার জায়গা তৈরি করে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সচিবালয়ে নিজের কক্ষে এসে প্রথমেই অর্ধেক বাতি নিভিয়ে দিয়েছেন, এসির মাত্রা নামিয়ে এনেছেন সহনীয় একটা পর্যায়ে। মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকেও একই কাজ করেছেন এবং অন্যদেরও সেই পথে হাঁটতে বলেছেন, উদাহরণ দিয়ে নেতৃত্ব দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে এমন একটি সংকেত ছোট মনে হলেও এর তাৎপর্য অনেক বড়, কারণ নেতৃত্ব যখন কথায় নয়, কাজে বলে, তখন সেই বার্তা অনেক দূর পৌঁছায়। নেতৃত্ব যখন নিজে উদাহরণ তৈরি করে, তখন সেটা অনুসরণ করা সহজ হয়, মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবেই পথ খুঁজে পায়।

ঈদের আনন্দ কমুক, এমন কথা কেউ বলছে না, এমন চাওয়া কারও নেই। উৎসবে আলো থাকুক, রঙ থাকুক, উচ্ছ্বাস থাকুক, প্রিয়জনের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার আনন্দ থাকুক। কিন্তু সেই আলো যেন সংযমের সীমা মেনে চলে, যেন প্রয়োজনের বেশি না ছড়িয়ে পড়ে। রমজান আমাদের যে শিক্ষা দেয়, সেই সংযমের পাঠ যদি বিদ্যুৎ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও একটুখানি কাজে আসে, তাহলে গরমের রাতগুলো অন্তত একটু সহনীয় হবে, কারও কষ্ট একটু কমবে। লোডশেডিংয়ের অন্ধকারে যে শিশুটি পড়তে পারছে না, ঘামের মধ্যে বসে বইয়ের পাতায় হাত রেখে অপেক্ষা করছে, যে রোজাদার মানুষটি ঘুমাতে পারছেন না গরমের ঘরে, তাঁদের কথাটুকু যদি মাথায় রাখা যায়, তাহলে হয়তো একটু বেশি আলো না জ্বালানোর সিদ্ধান্তটা নেওয়া মোটেও কঠিন হবে না।

পবিত্র রমজানের শিক্ষা কেবল ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে আমাদের প্রতিদিনের জীবনে ছড়িয়ে পড়ুক, প্রতিটি কাজে, প্রতিটি সিদ্ধান্তে তার প্রতিফলন ঘটুক। মানুষে মানুষে সৌহার্দ্যের বন্ধন আরও মজবুত হোক, একজনের কষ্ট আরেকজনের মনে সাড়া জাগাক। মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে সুস্থ ও কল্যাণে রাখুন।

লেখক: অর্থনৈতিক বিশ্লেষক

[email protected]

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
তাঁত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র সিরাজগঞ্জে তাঁতিদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেবে : বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী
ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ব্লকচেইন বিষয়ে বিসিসিসিআইর সেমিনার
আগস্টে পরীক্ষামূলকভাবে চালু হচ্ছে ‘প্রবাসী কার্ড’
রামপুরায় সাজা পরোয়ানাভুক্ত পলাতক আসামি গ্রেপ্তার
বিশেষ প্রতিবেদন তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা