মা-বাবা দুজনই আল্লাহর সবচেয়ে বড় নিয়ামত

মায়ের কণ্ঠ আর নেই, তবু প্রতিটি সিদ্ধান্তে তার শেখানো সততার কথা ভেসে আসে। জীবনের কঠিন পথে আজও আমি সেই শেখার হাত ধরেই হাঁটি । আপনার এই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে যাওয়ার প্রায় দেড় বছর হলো। চলে যাওয়ার পর জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে আপনার শেখানো কথাগুলোই পথ দেখায়। কঠিন সিদ্ধান্তের সামনে দাঁড়ালে আজও কানে ভেসে আসে আপনার সেই সততার শিক্ষা, মানুষের প্রতি সম্মান আর ধৈর্যের কথা। ঘরে ঢুকলে এখনো মনে হয় আপনি হয়তো ডাক দেবেন, খাবার খেয়েছি কিনা জিজ্ঞেস করবেন। সবাই বলে সময় নাকি সব শূন্যতা ভরিয়ে দেয়, কিন্তু আমাদের কাছে আপনার অভাব সময়ের সঙ্গে আরও গভীর হয়ে উঠছে ।
মা, আপনি না থাকলেও আপনার ছোঁয়া এখনো রয়ে গেছে আমাদের প্রতিদিনের জীবনে।
সকালের নিঃশব্দ সময়ে, ক্লান্ত বিকেলে কিংবা গভীর রাতের একাকীত্বে আপনার কথাগুলোই সাহস দেয়। আপনি শিখিয়েছিলেন মাথা উঁচু করে সত্যের পথে চলতে, মানুষের কষ্ট বুঝতে আর নিজের দায়িত্বকে ভালোবাসতে। আজ যখন জীবনের কঠিন পথ পাড়ি দিই, তখন বুঝি আপনার প্রতিটি উপদেশ কত গভীর ছিল।
অনেক সময় মনে হয়, পৃথিবীতে সবচেয়ে নিরাপদ জায়গাটা ছিল আপনার পাশে বসে থাকা।
আপনার স্মৃতি এখনো আমাকে আগলে রাখে ছায়ার মতো। আপনি চলে গেছেন অনেক দূরে, তবু আপনার গন্ধ, আপনার কণ্ঠ, আপনার মমতা আজও হৃদয়ের ভেতর বেঁচে আছে। মা, আপনার অনুপস্থিতি আমাকে প্রতিদিন নতুন করে বুঝিয়ে দেয়, জীবনে সবচেয়ে বড় শক্তি ছিলেন আপনি। আপনার হাতের সেই স্নেহমাখা স্পর্শ, অসুস্থ হলে পাশে বসে থাকা, না বললেও মনের কথা বুঝে ফেলা এসব আজ শুধু স্মৃতি, কিন্তু সেই স্মৃতিগুলোই এখন বেঁচে থাকার সাহস।
আজও কোনো ভালো খবর পেলে সবার আগে আপনাকেই বলতে ইচ্ছে করে। কষ্ট পেলে মনে হয়, যদি একবার আপনার কোলে মাথা রাখতে পারতাম! আপনার সেই মায়াভরা চোখ, শান্ত কণ্ঠ আর অফুরন্ত ধৈর্য আজও আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রেরণা। আপনি শিখিয়েছিলেন, হৃদয় দিয়ে কীভাবে মানুষকে ভালোবাসতে হয়, অন্যায় না করতে হয় , আর নিজের পরিবারকে আগলে রাখতে হয় । আমি চেষ্টা করি আপনার শেখানো সেই মূল্যবোধগুলো ধরে রাখতে, কারণ এটাই আপনার রেখে যাওয়া সবচেয়ে বড় সম্পদ।
মা, আপনি ছিলেন আমাদের জীবনের নীরব শক্তি। আমরা হয়তো কখনো পুরোপুরি বুঝতে পারিনি, কতটা ত্যাগ করে আপনি আমাদের আগলে রেখেছিলেন। আজ যখন জীবনের দায়িত্বগুলো নিজের কাঁধে অনুভব করি, তখন বুঝি একজন মা কতটা নিঃস্বার্থ হতে পারেন। আপনার দোয়া ছিল আমার সবচেয়ে বড় সাহস। আপনি পাশে থাকলে মনে হতো, পৃথিবীর কোনো কষ্টই আমাকে ভাঙতে পারবে না। আজও যখন খুব ক্লান্ত হয়ে যাই, মনে মনে আপনার সেই কথাগুলো শুনি - হাল ছেড়ো না, আল্লাহর উপর ভরসা রাখো।
মা আপনার চলে যাওয়ার পর জীবনের অনেক কিছুই বদলে গেছে। একটা শূন্যতা প্রতিদিন নিঃশব্দে অনুভব করি, যা কখনো পূরণ হওয়ার নয়। তবু এই কঠিন সময়ে যিনি আমাদেরকে দাঁড়াতে সাহায্য করছেন তিনি আব্বা । আব্বা হয়তো আপনার মতো অনুভূতি প্রকাশ করেন না, কিন্তু তার নীরব ভালোবাসার গভীরতা প্রতিদিন নতুন করে বুঝি। নিজের কষ্ট লুকিয়ে রেখে তিনি এখনো আমাদের জন্য শক্ত হয়ে আছেন। মা আপনি আমাদেরকে ভালোবাসা দিয়ে আগলে রেখেছিলেন, আর আব্বা আজও সেই ভালোবাসার দায়িত্ব নীরবে বহন করে চলেছেন। তার ক্লান্ত চোখের ভেতরেও আমি পরিবারের জন্য অফুরন্ত মমতা দেখতে পাই। তিনি হয়তো কম কথা বলেন, কিন্তু তার প্রতিটি চিন্তা জুড়ে থাকে আমাদের ভালো থাকা। আব্বা ভেতরে ভেতরে আরও বেশি ভেঙে গেছেন, তবু আমাদের জন্য নিজেকে শক্ত রাখেন।
আজ বুঝি, জীবনে আব্বা -মা দুজনই আল্লাহর সবচেয়ে বড় নিয়ামত। একজন শিখিয়েছেন মমতা, আরেকজন শিখিয়েছেন দৃঢ়তা। মা আপনি আজ আমাদের স্মৃতির ভেতর বেঁচে আছেন, আর আব্বা বাস্তবের প্রতিটি দিনে আমার সাহস হয়ে আছেন। আল্লাহ আমাদের মাকে জান্নাত নসিব করুন, আর আমাদের আব্বাকে সুস্থতা, দীর্ঘ জীবন ও শান্তি দান করুন।
(মায়ের স্মৃতিচারণ করে এই লেখাটি আমার বড় ভাই সাইদুর মুরসালিন সেনানীর ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে নেওয়া।)
[নোট : মা নেই, আব্বা নিঃসঙ্গ হয়ে গেছেন। আমরা তিন ভাই। আমি সবার ছোট। আমার বড় ভাই সাইদুর মুরসালিন সেনানী ও মেজ ভাই কাউস বিন সাঈদ বনানী। আমি অত্যন্ত সৌভাগ্যবান আমার বড় দুই ভাই আমার মাথার ছাতা।]
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন












































