মাকসুদ কমিশনের পদত্যাগ: পুঁজিবাজারে জবাবদিহি ও আস্থা পুনরুদ্ধার জরুরি

মো. আবদুল মান্নান
  প্রকাশিত : ০৪ জুন ২০২৬, ১৬:৫৮
অ- অ+

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের ইতিহাসে এমন কিছু সময় আছে, যেগুলো কেবল সূচকের উত্থান-পতন দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না, সেগুলো ব্যাখ্যা করতে হয় মানুষের দীর্ঘশ্বাস দিয়ে, অবসরপ্রাপ্ত এক বৃদ্ধের হারিয়ে যাওয়া সঞ্চয় দিয়ে, সন্তানের শিক্ষার জন্য জমিয়ে রাখা অর্থের অবমূল্যায়ন দিয়ে, কিংবা এমন এক বিনিয়োগকারীর গল্প দিয়ে, যিনি বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরও শেষবারের মতো আশার প্রদীপ জ্বালিয়ে বাজারে ফিরে এসেছিলেন।

পুঁজিবাজার শেষ পর্যন্ত কেবল সংখ্যার খেলা নয়; এটি মানুষের আস্থা, প্রত্যাশা ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের একটি প্রতিষ্ঠান। সেই প্রতিষ্ঠান যখন দীর্ঘ সময় ধরে মানুষের আস্থা হারাতে থাকে, তখন দায় শুধু বাজারের নয়, দায় তার নিয়ন্ত্রকদেরও।

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ এবং তার নেতৃত্বাধীন কমিশনের পদত্যাগের খবর প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে ব্রোকারেজ হাউস, মার্চেন্ট ব্যাংক এবং বিভিন্ন বিনিয়োগকারী মহলে যে প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে, তা নিছক একটি প্রশাসনিক পরিবর্তনের প্রতিক্রিয়া নয়, এটি ছিল দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ, হতাশা ও প্রত্যাশাভঙ্গের দীর্ঘশ্বাস।

কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধানের পদত্যাগে যদি সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের একটি বড় অংশ স্বস্তি প্রকাশ করে, তাহলে সেটি ব্যক্তিগত সাফল্য বা ব্যর্থতার প্রশ্নকে ছাড়িয়ে একটি গভীর প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের ইঙ্গিত দেয়।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থান ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের বহু খাতের মতো পুঁজিবাজারেও নতুন প্রত্যাশার জন্ম হয়েছিল। দীর্ঘদিন ধরে নানা সংকটে জর্জরিত বাজারকে পুনর্গঠনের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে বলে অনেকে বিশ্বাস করেছিলেন। বিনিয়োগকারীরা ভেবেছিলেন, নতুন বাস্তবতায় বাজারে জবাবদিহি বাড়বে, নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতা আসবে, বাজার কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হবে এবং দীর্ঘদিনের আস্থাহীনতার অবসান ঘটবে। কিন্তু প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান যত বাড়তে থাকে, হতাশাও তত গভীর হতে থাকে।

সমালোচকদের প্রধান অভিযোগ ছিল, বাজারের সংকটকে কাঠামোগতভাবে বিশ্লেষণ করে সমাধানের পথে এগোনোর পরিবর্তে কমিশন অনেক ক্ষেত্রে খণ্ডিত, প্রতিক্রিয়াশীল এবং অসামঞ্জস্যপূর্ণ নীতির আশ্রয় নিয়েছে। বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজন ছিল সুস্পষ্ট রোডম্যাপ, ধারাবাহিক বার্তা এবং অংশীজনদের সঙ্গে সক্রিয় যোগাযোগ। কিন্তু বহু বিনিয়োগকারী ও বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি মনে করেন, এসব ক্ষেত্রে দৃশ্যমান ঘাটতি ছিল। তাদের অভিযোগ, নীতিগত সিদ্ধান্তের ঘন ঘন পরিবর্তন বাজারকে স্থিতিশীল করার পরিবর্তে অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়েছে।

পুঁজিবাজারে আস্থা একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়। এখানে অনেক সময় অর্থনৈতিক বাস্তবতার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে প্রত্যাশা ও মনঃস্তত্ত্ব। বিনিয়োগকারীরা যদি বিশ্বাস করেন যে নিয়ন্ত্রক সংস্থা পরিস্থিতি বুঝছে, সমস্যাগুলো স্বীকার করছে এবং সমাধানের জন্য কাজ করছে, তাহলে কঠিন সময়েও তারা ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করেন। কিন্তু যখন সেই বিশ্বাস ক্ষয় হতে শুরু করে, তখন বাজারে আতঙ্ক, গুজব ও অনিশ্চয়তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সমালোচকদের মতে, বিদায়ী কমিশনের সময়কালে এই আস্থার সংকট ক্রমেই গভীর হয়েছে।

আরও একটি বড় অভিযোগ ছিল অংশীজনদের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি। একটি আধুনিক পুঁজিবাজারে নিয়ন্ত্রকের কাজ শুধু আইন প্রয়োগ করা নয়; বরং ব্রোকার, মার্চেন্ট ব্যাংক, সম্পদ ব্যবস্থাপক, তালিকাভুক্ত কোম্পানি, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী, সাংবাদিক ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে একটি কার্যকর যোগাযোগব্যবস্থা তৈরি করা। বহু ক্ষেত্রে অভিযোগ উঠেছে, মাকসুদ কমিশনের সময় এই সমন্বয় দুর্বল হয়ে পড়েছিল। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পর্যাপ্ত পরামর্শ গ্রহণ না করা এবং ভিন্নমতকে গুরুত্ব না দেওয়ার অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে।

বাজারের আরেকটি বড় বাস্তবতা হলো, একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রতি আস্থা শুধু তার ঘোষণার ওপর নির্ভর করে না; বরং নির্ভর করে তার প্রয়োগক্ষমতার ওপর। বাজার কারসাজি, ইনসাইডার ট্রেডিং, কৃত্রিমভাবে শেয়ারদর বাড়ানো বা কমানো, তথ্য গোপন করা কিংবা কর্পোরেট গভর্নেন্স লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা না থাকলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা মনে করেন যে বাজারটি সমান সুযোগের নয়। বিদায়ী কমিশনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত সমালোচনাগুলোর একটি ছিল বাজার কারসাজি নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা। যদিও কমিশন বিভিন্ন সময়ে তদন্ত, জরিমানা ও প্রশাসনিক পদক্ষেপের কথা জানিয়েছে, তবু সমালোচকদের প্রশ্ন ছিল- সেসব পদক্ষেপ বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য যথেষ্ট ছিল কি না।

একটি রাষ্ট্রের পুঁজিবাজার তখনই শক্তিশালী হয়, যখন সেখানে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের সংস্কৃতি তৈরি হয়। মানুষ যদি মনে করে বাজারে বিনিয়োগ করা মানে জুয়া খেলা নয়, বরং দেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিতে অংশগ্রহণ করা, তখন বাজার পরিণত হয়। কিন্তু বাংলাদেশে বহু বছর ধরে বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশ দ্রুত মুনাফার প্রত্যাশা এবং দ্রুত ক্ষতির অভিজ্ঞতার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছেন। এই বাস্তবতায় নিয়ন্ত্রকের দায়িত্ব ছিল বাজারকে একটি স্থিতিশীল ও বিশ্বাসযোগ্য কাঠামোর দিকে নিয়ে যাওয়া। সমালোচকদের মতে, সেই কাজটি প্রত্যাশিত মাত্রায় সম্পন্ন হয়নি।

পুঁজিবাজারে ক্ষতির হিসাব কেবল টাকায় মাপা যায় না। যখন কোনো বিনিয়োগকারী দীর্ঘদিন ধরে লোকসান বহন করেন, তখন তার পারিবারিক জীবন, মানসিক স্বাস্থ্য ও সামাজিক অবস্থানও প্রভাবিত হয়। এ কারণেই বাজারে দীর্ঘস্থায়ী দরপতন শুধু অর্থনৈতিক ঘটনা নয়; এটি একটি সামাজিক ঘটনাও। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এমন অসংখ্য মানুষ রয়েছেন, যারা জীবনের সঞ্চয় হারিয়ে আজও সেই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারেননি। তারা যখন নতুন কোনো কমিশনের কাছে আশা নিয়ে তাকান এবং পরে আবার হতাশ হন, তখন সেই হতাশার গভীরতা কেবল পরিসংখ্যান দিয়ে বোঝানো যায় না।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও রয়েছে। একটি কমিশনের ব্যর্থতা কি শুধুই কমিশনের ব্যর্থতা? নাকি এর পেছনে বৃহত্তর প্রাতিষ্ঠানিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণও কাজ করে? বাস্তবতা হলো, পুঁজিবাজার কোনো বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়। এটি ব্যাংকিং খাত, রাজস্বনীতি, মুদ্রানীতি, বিনিয়োগ পরিবেশ, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক আস্থার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।

পদত্যাগী কমিশনকে ঘিরে বিতর্কের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এখানেই যে, পুঁজিবাজারকে কেবল প্রশাসনিক নির্দেশনা দিয়ে পরিচালনা করা যায় না। এটি পরিচালিত হয় আস্থা দিয়ে। সেই আস্থা অর্জন করতে হয় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, ধারাবাহিকতা এবং ন্যায্যতার মাধ্যমে। বাজারে কারা লাভ করল আর কারা ক্ষতিগ্রস্ত হলো- তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, মানুষ কি বিশ্বাস করে যে নিয়ম সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য? যদি সেই বিশ্বাস দুর্বল হয়ে যায়, তাহলে কোনো নীতিই দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হয় না।

আজ বৃহস্পতিবার (৪ জুন) খন্দকার রাশেদ মাকসুদের নেতৃত্বাধীন কমিশনের অধ্যায় শেষ হয়েছে। কিন্তু প্রকৃত প্রশ্ন হলো, এরপর কী? নতুন নেতৃত্ব কি এমন একটি বাজার গড়ে তুলতে পারবে, যেখানে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী নিজেকে অসহায় মনে করবেন না? যেখানে নীতিনির্ধারণ হবে পূর্বানুমানযোগ্য? যেখানে তথ্য হবে উন্মুক্ত ও সহজলভ্য? যেখানে প্রভাবশালী গোষ্ঠী এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীর জন্য একই নিয়ম কার্যকর থাকবে?

পুঁজিবাজারের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এই প্রশ্নগুলোর উত্তরের ওপর। কারণ মানুষ শুধু চেয়ারম্যানের পদত্যাগ চায় না; মানুষ পরিবর্তন চায়। মানুষ শুধু নতুন মুখ দেখতে চায় না; তারা নতুন সংস্কৃতি দেখতে চায়। তারা এমন একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা চায়, যা ক্ষমতার নয়, আস্থার প্রতীক হবে। তারা এমন একটি বাজার চায়, যেখানে বিনিয়োগ মানে অনিশ্চয়তার অন্ধকারে ঝাঁপ দেওয়া নয়, বরং সম্ভাবনার পথে এগিয়ে যাওয়া।

সুতরাং মাকসুদ কমিশনের পদত্যাগকে কোনো সমাপ্তি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি বরং একটি প্রশ্নচিহ্ন। সেই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে আগামী দিনের সিদ্ধান্ত, সংস্কার এবং জবাবদিহির ওপর। যদি অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া যায়, তাহলে এই সংকটই ভবিষ্যতের শক্তিতে পরিণত হতে পারে। অন্যথায় ব্যক্তি বদলাবে, পদ বদলাবে, কমিশন বদলাবে, কিন্তু পুঁজিবাজারের দীর্ঘশ্বাস বদলাবে না।

লেখক: সংবাদকর্মী।

(ঢাকাটাইমস/৪জুন/মোআ)

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
দিল্লিতে সম্মানসূচক ডক্টরেট পেলেন নির্মাতা হাসিবুর রেজা কল্লোল
হামে প্রাণহানি ৬০০ ছাড়াল, নিশ্চিত শনাক্ত ৯২৬০
টেকনাফে ২৫ হাজার ইয়াবাসহ চার মাদক কারবারি আটক
হামে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু
বিশেষ প্রতিবেদন তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা