গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট চলতে পারে আরও এক সপ্তাহ

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা টাইমস
  প্রকাশিত : ১৪ আগস্ট ২০২৬, ১১:০৬
অ- অ+

দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া, এলএনজি সরবরাহে বড় ধরনের ব্যাঘাত, কয়লা সংকট এবং ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি কমে যাওয়ার সম্মিলিত প্রভাবে দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ভয়াবহ চাপে পড়েছে। জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন তিন হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, যার ফলে দেশের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ সময় ধরে লোডশেডিং চলছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতির সম্ভাবনা কম; সংকট কাটিয়ে উঠতে আরও অন্তত এক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।

গত কয়েক দিনে বিদ্যুতের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একদিকে গ্যাসের অভাবে বাসাবাড়িতে বৈদ্যুতিক চুলার ব্যবহার বেড়েছে, অন্যদিকে শিল্পকারখানাগুলো নিজস্ব গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে না পেরে জাতীয় গ্রিডের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। তীব্র গরমে ফ্যান ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার বৃদ্ধিও বিদ্যুতের চাহিদাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে উৎপাদন ও চাহিদার ব্যবধান দিন দিন বাড়ছে।

জাতীয় গ্রিডের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক দিনে প্রায় প্রতিটি ঘণ্টাতেই দুই থেকে তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি দেখা গেছে। এক পর্যায়ে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৭ হাজার ২৩৭ মেগাওয়াট, অথচ সরবরাহ করা গেছে মাত্র ১৩ হাজার ৮৫৫ মেগাওয়াট। এতে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৩৮২ মেগাওয়াটে। রাতের দিকে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে তিন হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং রেকর্ড করা হয়েছে এবং সর্বোচ্চ ঘাটতি প্রায় ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট পর্যন্ত পৌঁছেছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) কর্মকর্তারা বলছেন, গত বছরের তুলনায় এবার বিদ্যুতের চাহিদা কয়েক হাজার মেগাওয়াট বেড়েছে। গ্যাস সংকটের কারণে শিল্পকারখানা ও আবাসিক খাতে বিদ্যুতের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে। সর্বোচ্চ উৎপাদন নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হলেও জ্বালানি সংকট বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বর্তমান সংকটের মূল কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে এলএনজি সরবরাহে বড় ধরনের ধাক্কাকে। মহেশখালীর সামিটের ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে বৈরী আবহাওয়ার কারণে নতুন কার্গো খালাস করা যাচ্ছে না। ফলে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় গ্যাস সরবরাহ ব্যাপকভাবে কমে গেছে। একই সময়ে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালও কারিগরি সমস্যার কারণে পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে না। দুটি টার্মিনাল মিলিয়ে জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক নিচে নেমে এসেছে। নতুন কার্গো না আসা পর্যন্ত পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতির সম্ভাবনা নেই বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

গ্যাস সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট উৎপাদন সক্ষমতা ১২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও বর্তমানে গ্যাসের অভাবে সেগুলো থেকে মাত্র তিন থেকে চার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে। এতে জাতীয় গ্রিডে উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

শুধু গ্যাস নয়, কয়লা সরবরাহেও দেখা দিয়েছে সংকট। বৈরী আবহাওয়ার কারণে কয়লা খালাসে বিঘ্ন ঘটায় কয়েকটি বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। পায়রা ও নোরিংকো বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন কয়েকশ মেগাওয়াট কমে গেছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি কমে যাওয়া। আদানি পাওয়ার থেকে আমদানিও কয়েকশ মেগাওয়াট কমে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে চাপ আরও বেড়েছে।

গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে পরিবহন খাতেও। দেশের বিভিন্ন সিএনজি স্টেশনে সরবরাহ সীমিত করা হয়েছে। কোথাও কোথাও কয়েক ঘণ্টার জন্য সম্পূর্ণ গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রাখা হচ্ছে। নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় অধিকাংশ সিএনজি স্টেশন কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনেও দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পর সামান্য পরিমাণ গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে।

সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন গ্রামীণ এলাকার মানুষ। দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ বিদ্যুৎ গ্রাহক পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতায় থাকলেও চাহিদার তুলনায় ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ কম বিদ্যুৎ বরাদ্দ পাচ্ছে এসব এলাকা। ফলে অনেক স্থানে দিনে ১৫ থেকে ২০ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। কোথাও কোথাও ২৪ ঘণ্টায় মাত্র পাঁচ থেকে সাত ঘণ্টা বিদ্যুৎ মিলছে। রংপুর, কুড়িগ্রাম, গোপালগঞ্জ, শরীয়তপুর, সুনামগঞ্জ, নোয়াখালীসহ বিভিন্ন জেলার গ্রামাঞ্চলে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, ব্যবসা-বাণিজ্যে দেখা দিয়েছে অচলাবস্থা।

রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের এলাকাও সংকট থেকে মুক্ত নয়। কেরানীগঞ্জ, বাড্ডা, পান্থপথ, সাভার, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় দিনে একাধিকবার বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করছে। অনেক এলাকায় কয়েক ঘণ্টা করে লোডশেডিং হচ্ছে, যা নগরবাসীর দৈনন্দিন জীবন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমকে ব্যাহত করছে।

দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিংয়ের কারণে মানুষের ক্ষোভও বাড়ছে। টাঙ্গাইল, দিনাজপুর, পাবনা ও মুন্সীগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুৎ অফিসে হামলা, ভাঙচুর এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবরুদ্ধ করার ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে দেশের ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি তাদের অফিস, উপকেন্দ্র ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশের সহায়তা চেয়েছে।

সংকট মোকাবিলায় সরকার বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের উদ্যোগ নিয়েছে। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী দেশের শপিংমল, মার্কেট ও দোকান রাত ৮টার মধ্যে বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি সন্ধ্যা ৭টার পর আলোকিত বিলবোর্ড বন্ধ রাখা এবং অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা না করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সরকার আশা করছে, এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে বিদ্যুতের ওপর চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব হবে।

জ্বালানি ও বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, বিকল্প উৎস থেকে এলএনজি আমদানি বাড়ানো এবং গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে। মালয়েশিয়া থেকে নতুন এলএনজি কার্গো আনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

এদিকে পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার গ্যাস ও এলএনজি সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে কাজ করছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু তাৎক্ষণিকভাবে জ্বালানি জোগাড় করে বিদ্যুৎ উৎপাদন স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। সংকট মোকাবিলায় একই সঙ্গে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানো, প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি আমদানি, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির সক্ষমতা দ্রুত বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম মনে করেন, বিদ্যমান সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে হলে স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপের পাশাপাশি মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন জরুরি। তার মতে, দেশের গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি আমদানির ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে যেসব কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে, সেগুলোর সর্বোচ্চ সক্ষমতা কাজে লাগানো গেলে গ্যাসের ওপর বিদ্যুৎ খাতের চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব।

তিনি আরও বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য শুধু গ্যাসনির্ভরতার ওপর নির্ভর না করে দ্রুত সৌরবিদ্যুতের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোকে যুক্ত করে দেশের সমুদ্র ও স্থলভাগে গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করার প্রয়োজন রয়েছে। এতে ভবিষ্যতে দেশীয় জ্বালানি সরবরাহ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে এবং আমদানিনির্ভরতার চাপও কমতে পারে।

এদিকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, লোডশেডিংয়ের কারণে সাধারণ মানুষের যে দুর্ভোগ হচ্ছে, তা বিবেচনায় নিয়ে সরকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। সংকট মোকাবিলায় সরকার একটি কৌশল নিয়েছে এবং এর মাধ্যমে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হবে বলে আশা করছেন তিনি।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, গ্যাস ও এলএনজির সরবরাহ বাড়ানোর জন্য সম্ভাব্য সব বিকল্প নিয়ে সরকার কাজ করছে। এর অংশ হিসেবে মালয়েশিয়া থেকে অন্তত একটি এলএনজি কার্গো আনার চেষ্টা চলছে। তবে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন রাতারাতি বাড়ানো সম্ভব নয়। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বর্তমান চাহিদা পূরণে সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন দিক সমন্বয় করে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা চলছে।

সরকারের এই উদ্যোগের বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সংকট কমাতে সরকারের চেষ্টার কোনো ঘাটতি নেই। তবে গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে সময় প্রয়োজন হওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। এ কারণে আমদানি করা জ্বালানি এবং বিদ্যমান বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলার ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।

অতীতের জ্বালানি নীতির সমালোচনা করে অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, বিগত সরকারগুলো কোনো মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথ খুঁজে নেয়নি। তারা মূলত তাৎক্ষণিক সমাধানের পথে এগিয়েছে। এর ফলে যে সংকট ভবিষ্যতে তৈরি হওয়ার কথা ছিল, সেটিই এখন সামনে এসেছে।

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
ধানমন্ডির আলিয়ঁস ফ্রঁসেজে প্রদর্শিত হলো স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘নেচার ব্লিডস্’ ও ‘সাইলেন্ট নো মোর’
চার সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত
সাতজন সহকারী পুলিশ সুপারকে বাধ্যতামূলক অবসর, যা জানা গেল
সিন্ধুর পানি নিয়ে ভারতকে কড়া হুঁশিয়ারি শেহবাজের
বিশেষ প্রতিবেদন তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা