‘মর্গে ৩০০ থেকে ৪০০ লাশ, একটার ওপর একটা পড়ে আছে’

জুলাই আন্দোলনের সময় রাজধানীর মোহাম্মদপুরে গুলিতে নিহত ছেলে মোহাম্মদ ইসমাইলের মরদেহ খুঁজতে গিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে ৩০০ থেকে ৪০০টি লাশ দেখেছিলেন তার মা তাসলিমা আক্তার। সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ দেওয়া জবানবন্দিতে ছেলেকে হারানোর সেই দিনের বর্ণনা দেন তিনি। এ সময় বারবার কান্নায় ভেঙে পড়েন তাসলিমা।
২০২৪ সালের ১৯ জুলাই মোহাম্মদপুরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস, আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানকসহ ২৮ জনের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেন তিনি।
জবানবন্দিতে তাসলিমা আক্তার বলেন, ১৯ জুলাই শুক্রবার জুমার নামাজ শেষে দুপুরের খাবার খেয়ে বিকেল আনুমানিক তিনটার দিকে বাসা থেকে বের হন তার ছেলে ইসমাইল। মোহাম্মদপুরের আল্লাহ করিম মসজিদের পাশে গ্লাস ফ্যাক্টরির সামনে আন্দোলনে যোগ দেন তিনি।
ছেলের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারার কথা জানিয়ে তাসলিমা বলেন, তার মুঠোফোনে টাকা না থাকায় ইসমাইলকে ফোন করতে পারেননি। পরে তার বোন আকলিমা ইসমাইলকে ফোন করেন। কয়েকবার ফোন করার পর ইসমাইলের বন্ধু কালু ফোন ধরেন। তিনি জানতে চান, ইসমাইল তাসলিমার কে হন। আকলিমা তাকে জানান, তাসলিমা ইসমাইলের মা।
এরপর কালু জানান, ইসমাইল গুলিবিদ্ধ হয়েছেন এবং তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে।
ছেলের গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর পেয়ে হাসপাতালের উদ্দেশে রওনা হন তাসলিমা। পথে আগুন জ্বলতে দেখেন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন তিনি। এ সময় কমিশনার আমিন, কমিশনার রাজিব, জাহাঙ্গীর কবির নানক, শেখ ফজলে নূর তাপস ও বিপ্লবের হাতে অস্ত্র ছিল বলে দাবি করেন তাসলিমা। তার সামনে একজনকে গুলি করে হত্যা করা হয় বলেও জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন তিনি।
মর্গে ছেলের মরদেহ শনাক্ত
তাসলিমা আক্তার বলেন, রাত আনুমানিক ১০টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছান তিনি। জরুরি বিভাগে গিয়ে গুলিবিদ্ধ ব্যক্তিদের জীবিত ও মৃত অবস্থায় দেখতে পান। এরপর হাসপাতালের বিভিন্ন তলায় ছেলেকে খুঁজতে থাকেন। একপর্যায়ে এক চিকিৎসকের কাছে ছেলেকে খুঁজে দেওয়ার অনুরোধ করেন তিনি।
ওই চিকিৎসক তাকে জরুরি বিভাগে নিয়ে গেলে সেখানে ছেলে নেই বলে জানান তাসলিমা। পরে চিকিৎসক মুঠোফোনে একটি ছবি দেখালে সেটি দেখে ইসমাইলকে শনাক্ত করেন তিনি। ছেলের মরদেহ কোথায় জানতে চাইলে তাঁকে মর্গে নিয়ে যাওয়া হয়।
মর্গের পরিস্থিতি বর্ণনা করে তাসলিমা বলেন, ‘মর্গে গিয়ে দেখি ৩০০ থেকে ৪০০ লাশ। একটার ওপর একটা লাশ পড়ে আছে। ছেলের পরনের পোশাক দেখে তাকে চিনতে পারি। দেখি, তার মাথায় গুলি লেগেছে।’
তাসলিমার অভিযোগ, ছেলের মরদেহ চাইলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তা দিতে রাজি হয়নি। তাকে জানানো হয়েছিল, সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আসার পর মরদেহ দেওয়া হবে।
পরদিন সন্ধ্যায় পান ছেলের মরদেহ
পরদিনের ঘটনার বর্ণনায় তাসলিমা বলেন, শনিবার সকাল ১১টার দিকে মোহাম্মদপুর থানা থেকে সাইফুল নামের এক দারোগা হাসপাতালে আসেন। পরে ওই দিন সন্ধ্যা সাতটার দিকে ইসমাইলের মরদেহ বুঝে পান তারা। হাসপাতাল থেকে মামলা করবেন না—এমন বক্তব্যে তার স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
এরপর ছেলের মরদেহ বাসায় নিয়ে যান তারা। ছাতার মসজিদে গোসল করানোর পর জানাজা শেষে আজিমপুর কবরস্থানে ইসমাইলকে দাফন করা হয় বলে জানান তাসলিমা।
ছেলেকে হত্যার জন্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, শেখ ফজলে নূর তাপস, জাহাঙ্গীর কবির নানক, কমিশনার আমিন, কমিশনার রাজিব, রাসেল, মেলা কুরবেল, কমিশনার আমিনের পিএস বিপ্লব, বিপ্লব কুমার, সৈকত, পলাশ, সাবার, মোহাম্মদ ইসমাইল, রাব্বিন, রুবেলসহ আরও কয়েকজনকে দায়ী করেন তিনি। তাদের বিরুদ্ধে বিচার দাবি করেন তাসলিমা।
তাসলিমা আরও বলেন, তার মেয়ে রনি ইউটিউবে ছেলের হত্যাকাণ্ডের একটি ভিডিও দেখিয়েছেন। তিনি যে এলাকায় থাকেন, সেখানকার অনেকে ভিডিওটি দেখে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিষয়ে তাকে তথ্য দিয়েছেন।
মামলায় চারজন গ্রেপ্তার
মোহাম্মদপুরে জুলাই আন্দোলনের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় শেখ ফজলে নূর তাপস ও জাহাঙ্গীর কবির নানকসহ ২৮ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। এ মামলায় চারজন গ্রেপ্তার রয়েছেন।
তারা হলেন–সাবেক আনসার সদস্য মোহাম্মদ ওমর ফারুক, মোহাম্মদপুর থানা ছাত্রলীগের সভাপতি নাঈমুল হাসান রাসেল, মোহাম্মদপুর থানা ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি মো. সাজ্জাদ হোসেন এবং যুবলীগের কর্মী কে এম ফজলে রাব্বী।
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













