চ্যালেঞ্জের মুখে বিজেপি

হাসান জাবির
 | প্রকাশিত : ২৫ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৫:১৮

মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে ভিন্ন ভিন্ন ইস্যুতে সম্প্রতি পদত্যাগ করেছেন ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারের দুই শীর্ষ কর্মকর্তা। যৌন হেনস্তার দায়ে সরে যান বিজেপি সরকারের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। এই রেশ কাটতে না কাটতেই গত সপ্তাহে পদত্যাগ করেছেন দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর। অবশ্য এর আগেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রত্যাখ্যান করেছেন আগামী ২৬ জানুয়ারি প্রজাতন্ত্র দিবসের বিশেষ অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণ। বহুল প্রত্যাশিত এই আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যানের ফলে কিছুটা বেকায়দায় পড়েছে বিজেপি সরকার। এধরনের চাপের মধ্যেই নভেম্বরে অনুষ্ঠিত পাঁচটি রাজ্যের নির্বাচনে ভরাডুবি হয়েছে শাসক দল বিজেপির। পাঁচ রাজ্যের ওই নির্বাচনী ফলাফল কেন্দ্রীয় সরকারের জন্য বড়সড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এই ফলাফল ২০১৯ সালের মে মাসে অনুষ্ঠেয় লোকসভা নির্বাচনের একটি পূর্বাভাস। এই রায় শাসকদল বিজেপি ও তাদের নির্বাচনী জোটের জন্য অশনিসংকেত। অন্যদিকে দিল্লির ক্ষমতার দৃশ্যপট থেকে বিজেপিকে বিদায় করতে মরিয়া কংগ্রেসের জন্য অপ্রত্যাশিত সাফল্য। সঙ্গত কারণেই ওই পাঁচ রাজ্যের ভোটের ফলাফলকে কেন্দ্র করে ভারতের রাজনৈতিক সমীকরণে নানা মাত্রা যোগ করেছে। এই ফলাফলে উজ্জীবিত কংগ্রেস ও তার জোট। একই সঙ্গে প্রগতিশীল জোটের আরও সম্প্রসারণের মাধ্যমে সুসংহত ঐক্য বিনির্মাণের ক্ষেত্র তৈরি করে দিয়েছে। যে কারণে আগামী লোকসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জনপ্রিয়তার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে শাসক দল বিজেপি। 

পাঁচ রাজ্যের নির্বাচনী ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, ছত্রিশগড়, মধ্যপ্রদেশ ও রাজস্থানে ক্ষমতাসীন বিজেপি হটিয়ে ক্ষমতার দখল নিয়েছে জাতীয় কংগ্রেস। পক্ষান্তরে মিজোরামে ক্ষমতায় থাকা কংগ্রেস হেরে গেছে স্থানীয় দল মিজো ন্যাশনাল ফ্রন্টের কাছে। আরেক রাজ্য তেলেংগনায় ক্ষমতাসীন তেলেংগনা রাষ্ট্রীয় সমিতিই জয়ী হয়ে আবার সরকার গঠন করছে। লক্ষ্যণীয় ব্যাপার হচ্ছে, তিন রাজ্যে ক্ষমতা হারানোর বিপরীতে কোনো রাজ্যেই জয় পায়নি শাসক দল বিজেপি। এটি অবশ্যই বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের জন্য মারাত্মক দুঃসংবাদ। বিশেষ করে মাওবাদী অধ্যুষিত ছত্রিশগড়ে বিজেপির পরাজয় দলটির সরকারের পরিচালনাসংক্রান্ত জাতীয় নীতির ব্যর্থতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এর কারণ কী? ২০১৪ সালের নির্বাচনে যে দলটি ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়ী হয়েছিল হঠাৎ তাদের জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়ল কেন?

২০১৪ সালে কেন্দ্রে সরকারের গঠনের পর থেকেই মোদি সরকার বেশ কিছু ইস্যুতে বিতর্ক সৃষ্টি করে। অন্যদিকে প্রথম থেকেই মোদি সরকারের পররাষ্ট্র নীতি নিয়ে দেশটির অভ্যন্তরে জোরেসোরে সমালোচনা শুরু হয়। একই সঙ্গে ক্ষমতায় বসেই মোদি-অমিত জুটির গৃহীত পদক্ষেপ ভারতের ধর্মীয় সম্প্রীতি বিনষ্টের কারণ হয়ে ওঠে। এতে করে ভারতের সেক্যুলার রাষ্ট্রীয় চরিত্রে একের পর এক কলঙ্কের তিলক লাগতে থাকে। এই পরিপ্রেক্ষিতেই ভারতের সাংবিধানিক কাঠামোগুলোর কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। বিশেষ করে অযোধ্যায় নতুন করে ধর্মীয় বিতর্কের সূচনা করলে সেখানকার পরিস্থিতি নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। আবার দীর্ঘদিন থেকে ভারতে বসবাস করা বিভিন্ন রাজ্যের লোকজনের নাগরিক অধিকার সীমিত করার এনআরসি প্রকল্প দেশটির অভ্যন্তরে মারাত্মক নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। এ নিয়ে পশ্চিমবঙ্গসহ সমগ্র ভারত সোচ্চার। এছাড়াও ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে মোদির বেকারত্ব দূর করাসংক্রান্ত উচ্চাভিলাসী প্রতিশ্রুতি অনেকটাই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। কৃষকদের কৃষি ঋণ মওকুফের নির্বাচনী অঙ্গীকার পূরণে মোদির সদিচ্ছা নিয়ে দেখা দিয়েছে সন্দেহ। বিশ্লেষকদের দাবি- মোদির সরকার মূলত শিল্পপতিদের খপ্পরে পড়েছে। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধানের পদত্যাগ এধরনের ধারণাকে বাস্তবসম্মত করে। শিল্পপতিদের চাপেই রিজার্ভ ব্যাংকের গভর্নরকে বিদায় নিতে হয়েছে বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়াও নোট বাতিল, রাফাল যুদ্ধ বিমান ক্রয়সংক্রান্ত দুনীতি, ভ্রান্ত কৃষিনীতি, বেকারত্বের হার বৃদ্ধি ইত্যাদি ইস্যুতে কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন সম্মিলিত বিরোধী দল সম্প্রতি জোরেসোরে চেপে ধরেছিল সরকারকে। বিরোধীরা এই প্রচারণার প্রাথমিকভাবে সাফল্য পেয়েছে। যে প্রক্রিয়ায় মোদির ব্যক্তিগত ইমেজ জনপ্রিয়তা দুটিই এই মুহূর্তে প্রশ্নের সম্মুখীন। এই বাস্তবতায় ভারতের বাম দলগুলোর পাশাপাশি সেক্যুলারপন্থী দলগুলোকে দ্রুত ঐক্যবদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছে কংগ্রেস। যে কারণে স্বল্প সময়ের ব্যবধানে পাল্টে গেছে ভোটের সমীকরণ। তাই কিছুদিন আগে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত বিরোধি দলগুলোর কিষান সমাবেশ থেকে রাহুল গান্ধী ও সীতারাম ইয়েচুরি খুব জোরেসোরে বলতে সক্ষম হয়েছেন- ‘আমরা দিল্লি থেকে মোদিজিকে সরিয়েই ছাড়ব’। এক্ষেত্রে তারা যে অনেকটাই এগিয়ে গেছেন সেটি খুবই পরিষ্কার।

মোদির জনপ্রিয়তার এই ভাটা পড়ার কারণ খুব স্পষ্ট। ৭০ বছরের পরিক্রমায় ভারতের জাতীয় মূল্যবোধ ভারতীয় জনগণকে দিয়েছে অনন্য মর্যাদা। সাম্প্রতিক সময়গুলোতে এই স্বতন্ত্রতা, স্বকীয়তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে নানা কারণে। অথচ ইতিহাস সাক্ষী দেয়, কিছু বিচ্যুতি কিংবা ঐতিহাসিক দুর্ঘটনা সত্ত্বেও উপমহাদেশের মানুষ অসাম্প্রদায়িক। গত ৭০ বছরে ভারতের জনগণ এই শক্তিতেই বলীয়ান। আর দেশটির এই অবস্থান ভারতের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করেছে। এই ঐক্যই দেশটির জাতীয় অগ্রগতিকে বেগবান করেছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দিল্লির ভাবমূর্তি বাড়িয়েছে। কিন্তু মোদি সরকারের গৃহীত কর্মকা- নানাভাবে বিতর্ক সৃষ্টি করায় জনমত বিজেপির বিপক্ষে গেছে। তাই ভারতের জনগণের এই অবস্থানকে এগিয়ে নিতে কংগ্রেস সামনের দিনগুলোতে আরও সোচ্চার হবে। যে প্রক্রিয়ায় আগামী লোকসভা নির্বাচনের ফলাফলকে নিজেদের অনুকূল রাখতে এগিয়ে গেছে তারা। আর এতেই বিপদে পড়েছে বিজেপি। যে কারণে বিজেপির সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে নিজেদের ভুল-ত্রুটি শোধরে ভোটারদের কাছে টানা। এক্ষেত্রে নরেন্দ্র মোদির ব্যক্তিগত ইমেজ কাজে লাগিয়ে ভোটারদের পক্ষে আনতে বিজেপিও জোর প্রচেষ্টা শুরু করেছে। জনপ্রিয়তার এই ভাটা বিজেপির জন্য বড়সর চ্যালেঞ্জ। এই পরিস্থিতির পরিবর্তন না হলে আগামী লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল হতাশাজনক হতে পারে।

সর্বশেষ পাঁচ রাজ্যের নির্বাচনী ফলাফলে বেশ কিছু ইঙ্গিত আছে। দেখা যাচ্ছে বিজেপিকে হটিয়ে যে তিন রাজ্যে কংগ্রেস জয়ী হয়েছে সেখানে হিন্দু ভোটারই বেশি। ছত্রিশগড়ে ৯২%, রাজস্থানে ৯৪% ও মধ্যপ্রদেশে ৯১% হিন্দু হওয়া সত্ত্বেও বিজেপি এখানে জয়লাভ করতে ব্যর্থ হয়েছে। এতে করে একটি কথাই প্রমাণিত হয় যে, রাজনৈতিক চিন্তায় ধর্মের মিশ্রণ চায় না ভারতের জনগণ। সম্ভবত মোদি ও বিজেপি এই বাস্তবতা বুঝতে পারেননি। আর ভারতের অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধকে ভিন্ন আঙ্গিক দিতে গিয়েই বিপাকে পড়েছে বিজেপি। যে কারণে ভারতের রাজনীতিতে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করা সত্ত্বেও মোদির বিজেপি বর্তমানে জনগণের কাছে সমালোচিত হচ্ছে। একই সঙ্গে ভাটা পড়েছে দলটির জনপ্রিয়তায়। এই চ্যালেঞ্জ সামলে নিয়ে কীভাবে জনগণকে তাদের দিকে ফিরিয়ে আনবে মোদি এখন এটিই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

লেখক : আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :