বছর শেষ ভোটে

তায়েব মিল্লাত হোসেন
 | প্রকাশিত : ৩১ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৪:৩২

ভোটের ডামাঢোল শেষ। শেষ হতে চলেছে গ্রেগরিয়ান বছরও। বিদায় ২০১৮, স্বাগত ২০১৯। বিদায়ী বছরে নানা ঘটনা দেখতে হয়েছে ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র ও বৈশ্বিক জীবনে। আমাদের দেশে বছর যখন শুরু হয়, তখন সরকারের চার বছর। এখন পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ। নতুন বছরে আমরা পাচ্ছি নতুন সংসদ, নতুন সরকারও। তবে ভূমিধ্বস বিজয় পেয়ে ক্ষমতায় থাকছে আওয়ামী লীগই।

যে বছর চলে যাচ্ছে, সেই বছরের শুরুতেই দেশের সবার মনে প্রশ্ন ছিল:

 ‘রাজনীতি কোন পথে?’

তখনকার ইঙ্গিত যাই ছিল, বছর শেষে এসে উত্তর:

‘রাজনীতি নির্বাচনমুখী।’

বছরটার যতি নামবে অংশগ্রহণমূলক একটি নির্বাচনের মাধ্যমে- এটা কিন্তু জানুয়ারিতে মোটেই আঁচ করা যায়নি। কেননা বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানুয়ারির পয়লা দিন বলে রেখেছিলেন, ‘সরকার তাদের একদলীয় শাসন ব্যবস্থাকে পাকাপোক্ত করার জন্য কোনো আলোচনা ছাড়াই তথাকথিত সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন করতে চায়, যা এদেশের মানুষ মেনে নেবে না।’

তার চার দিন বাদে ৫ জানুয়ারি দশম সংসদ নির্বাচনের চার বছর পূর্তিতে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের রাজধানী ঢাকার বনানীর এক মাঠে বললেন, ‘অপেক্ষা করেন, সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হবে, নির্বাচনে আসুন। ঠেকানোর সাধ্য থাকলে দেখান। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে জনগণ আপনাদের প্রতিহত করবে।’

প্রতিহত করার কাজটি কিন্তু করতে হলো না তাদের। বছর শেষে এসে সেই সংবিধান মেনেই একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছে বিএনপি। তাদের সঙ্গে আছে নতুন ও পুরনো মিলিয়ে, মোট দুটি রাজনৈতিক জোট। ভোটের লড়াইয়ে নেমেছেন ফখরুল নিজেও। বাবার পক্ষে ভোট চাইছেন তার মেয়ে পর্যন্ত। শুধু এই কারণেই ছুটে এসেছেন সুদূর অস্ট্রেলিয়া থেকে।

আসলে মানুষ ভাবে এক হয় আরেক। ২০১৮ সাল সেই সাক্ষী রেখে যাচ্ছে। এই শীত রাজনৈতিক উত্তাপে কাটবে। কেবল এটুকু ভাবনা মিলেছে। যেখানে উত্তাপ ছড়ানোর কথা ছিল রাজপথে, নির্বাচনের পক্ষে-বিপক্ষে। সেখানে সবাই আজ ভোটের পক্ষে। প্রতিযোগিতা হচ্ছে ভোটারদের মন জয়ের। উত্তাপ আছে বটে, আছে চায়ের কাপের ঝড়ও। সবটাই কিন্তু নির্বাচনী মাঠে এগিয়ে থাকার লড়াইয়ে।

২০১৮ সালের শুরুতে রাজনীতি নিয়ে রাশিফল বিশারদ, টকশো বক্তা, রাজনীতিক- কারও ভবিষ্যদ্বাণীই সেভাবে মিলেনি। ড. কামাল হোসেন, ডা. বি. চৌধুরী, আসম আবদুর রব, কাদের সিদ্দিকীর সম্মিলিত জোট হতে হতে হলো না। মাহমুদুর রহমান মান্না, জাফরুল্লাহ চৌধুরী প্রমুখের উদ্যোগে বিএনপির নতুন জোট জাতীয় ঐক্যফ্রণ্টের নেতা হয়ে ওঠলেন ড. কামাল। আর বি. চৌধুরীর নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট ভিড়ল আওয়ামী লীগের সঙ্গে। প্রাজ্ঞ দুই রাজনীতিকের দুটি পথ দুদিকে বেঁকে গেল। বছরের শেষার্ধ্বে এটা ছিল বড় চমক।

তারপর থেকে ভোজবাজির মতো করে আরো অনেক ঘটনা ঘটতে থাকলো। অনেকটাই শেখ হাসিনাকে মধ্যমণি মেনে নিয়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে বৈঠক করলেন কামাল-ফখরুলরা। উন্মুক্ত হলো অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পথ। একাদশ সংসদ গড়তে ভোটে আসার ঘোষণা এলো বিএনপি থেকে। মাঠে ধানের শীষের নেতা হয়ে ওঠলেন ড. কামাল। নিমরাজি হয়েও জামায়াতকে তার পেছনেই ঠাঁই দিলেন। সেই জোটের নেতা হিসেবে যখন তুঙ্গে অবস্থান করছেন, তখনই ২৭ জানুয়ারি প্রকাশিত ভারতের এক পত্রিকাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ড. কামাল জানালেন, জামায়াতে ইসলামীকে ধানের শীষ প্রতীক পাবে, এটা জানলে তিনি এই জোটেই যেতেন না।

বছর শেষে এভাবে অবস্থান কেবল বদল নয়, অনেক দলবদলও দেখেছি আমরা। সেই কারণেই আওয়ামী লীগের এক সময়ের তথ্য প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক আবু সায়ীদ, সাংসদ গোলাম মাওলা রনি এখন ধানের শীষের প্রার্থী। পিতা আওয়ামী লীগ আমলের অর্থমন্ত্রী প্রয়াত শাহ এ এম এস কিবরিয়া খুন হয়েছেন যাদের শাসনকালে সেই বিএনপির প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন রেজা কিবরিয়া। আবার বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিশোধ নিতে যিনি প্রতিরোধে যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছেন, নিজেকে জাতির জনকের একজন পুত্র দাবি করেন, সেই কাদের সিদ্দিকীর ঠিকানা এখন ধানের শীষ।

অন্যদিকে ধানের শীষের প্রার্থী হতে না পারার ক্ষোভ থেকে মনোনয়নপর্ব শেষের অনেকটা পরে সদ্যই আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন সাবেক আমলা ইনাম আহমেদ চৌধুরী। আবার এই মেয়াদের প্রায় পাঁচ বছরই আওয়ামী লীগ সরকারের কট্টর সমালোচনা করে আসা বি. চৌধুরী এখন পুত্র মাহি বি. চৌধুরীর জন্য নৌকায় ভোট চাইলেন বছরের শেষদিকে এসে।

আর দৈনিক ঢাকাটাইমস-এর এক প্রতিবেদন বলছে, জাতীয় নির্বাচনের ডামাডোলের মধ্যে এই ডিসেম্বর মাসে দেশের ৩০টি জেলায় বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগে এসেছেন ৩০ হাজারের বেশি নেতা-কর্মী। প্রতিদিনই এই সংখ্যা বাড়ছে। এর বাইরে জাতীয় পার্টিরও হাজারখানেক নেতা-কর্মী এসেছেন আওয়ামী লীগে।

এরশাদের জাপার ভেতরে বছর শেষে আচমকা অদলবদল ছিল। মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ার পর জাতীয় পার্টির মহাসচিবের পদ থেকে এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদারকে সরিয়ে দিয়ে সেই দায়িত্ব দেওয়া হয় প্রেসিডিয়াম সদস্য মসিউর রহমান রাঙ্গাকে। রাতারাতি আবার ক্ষমতাসীন হন হাওলাদার। তবে নতুন পদে। জাপা চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের নতুন বিশেষ সহকারী মনোনীত করা হয় তাকে। যেখানে পদমর্যাদা পার্টির চেয়ারম্যানের পরে ‘দ্বিতীয় স্থান’।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বছরের প্রথমার্ধ্বে ৮ ফেব্রুয়ারি বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ১০ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয় খালেদা জিয়ার ছেলে ও বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ অন্য পাঁচ আসামিকে। রায় ঘোষণার পরই সাবেক এ প্রধানমন্ত্রীকে নাজিমুদ্দিন রোডের পুরোনো কেন্দ্রীয় কারাগারকে বিশেষ কারাগার ঘোষণা দিয়ে সেখানে রাখা হয়।

টানা দ্বিতীয় মেয়াদে সরকার পরিচালনার মধ্য দিয়ে বছর পার করলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই মেয়াদে তার শেষ কার্যদিবস ছিল ২৭ ডিসেম্বর। এই দিন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন তিনি।

বছর শেষের এক দিন আগে ৩০ ডিসেম্বর হলো একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ভোটে বিশাল জয় পেল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে থাকা মহাজোট। তার মানে টানা তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হতে চলেছে শেখ হাসিনা। জাতির জনকের কন্যা, মানবতার জননী, জননেত্রীকে আগাম শুভেচ্ছা; টুপি খোলা অভিনন্দন। আপনার হাত ধরেই বাস্তবায়িত হোক বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা। অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান বাংলাদেশকে- নতুন বছর সামনে রেখে এই প্রত্যাশা রইলো।

তায়েব মিল্লাত হোসেন: সহযোগী সম্পাদক, এই সময় ও ঢাকাটাইমস

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :