নতুন মুখ, নতুন চিন্তা?

হাবিবুল্লাহ ফাহাদ
 | প্রকাশিত : ১৪ জানুয়ারি ২০১৯, ১৪:৫২

তারুণ্যের কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেন, ‘আমি সহসা আমারে চিনেছি, আমার খুলিয়া গিয়াছে সব বাঁধ’।

নজরুল যখন এই আত্মদর্শী উক্তি করেছেন, তখন তার বয়স বাইশ মাত্র। তারুণ্যের হাওয়ায় উদ্বেলিত মন। অতলস্পর্শী দৃঢ়তা। অদম্য সাহস আর অপরাজেয় মনোবল। তারুণ্য এমনই। পরাজয় বলতে কোনো শব্দ নেই তারুণ্যের অভিধানে।

নতুন বছরের বড় চমক নতুন সরকার। তার চেয়ে বড় চমক নতুন সরকারের মন্ত্রিসভা। ৪৭ সদস্যের ২৭ জনই নতুন। তাদের বেশির ভাগই তরুণ। এর আগে কোনো সরকারের সর্বোচ্চ সভায় তরুণদের এতটা সন্নিবেশ হয়নি। সত্যি সরকারে এমন চমক তুলনারহিত।

বিস্ময়কর বিজয় দিয়ে টানা তৃতীয়বার ক্ষমতার মসনদে আওয়ামী লীগ। স্বাধীনতার পর থেকে দলটির নেতৃত্বে এটি সপ্তম সরকার। ইতিহাস গড়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। টানা তৃতীয়বার আর সব মিলিয়ে চতুর্থবার সরকারপ্রধানের মাইলফলক স্পর্শ করেছেন তিনি। চমক ছড়িয়েছেন মন্ত্রিসভায়।

শুরুতেই নজিরবিহীন ঘটনায় আলোচনায় এসেছে মন্ত্রিসভা। ব্যতিক্রমী ঘটনা ঘটেছে। শপথের পরদিন মঙ্গলবার মন্ত্রীরা সাভারের স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানাতে গেছেন দলবেঁধে। তবে পতাকাবাহী গাড়িতে নয়, গিয়েছেন বাসে চড়ে। পরদিন বুধবার গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিতে শ্রদ্ধা জানানোর যাত্রায় মন্ত্রীরা সওয়ার হয়েছেন বাসে। ভিন্নধর্র্মী এই আয়োজন অতীতে কখনো চোখে পড়েনি।

বর্তমান মন্ত্রিসভাকে ‘তারুণ্যের মন্ত্রিসভা’ বললে অত্যুক্তি হবে না। ভোটের আগে থেকেই তরুণ ভোটার আর তাদের স্বার্থরক্ষার বিষয়টি বেশ ভালোভাবেই আলোচনায় ছিল। আগামী পাঁচ বছর দেশের নেতৃত্ব দিতে যাওয়া ‘টিম হাসিনা’য় তার প্রতিফলন মিলেছে। আস্থা বেড়েছে। বেড়েছে প্রত্যাশাও।

প্রাজ্ঞরা নিজেদের সফলতার প্রতিফলন দেখতে চান তরুণদের মধ্যে। আবার তাদের ব্যর্থতার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তরুণরা সফল হবে, এমনও প্রত্যাশা করেন। বাবারা যেমন সন্তানের মধ্যে নিজের ভালো গুণাবলি আবিষ্কার করতে চান। সরকারের তরুণ সভাসদদের কাছে চাওয়া অনেকটা তেমনই।

বিগত মন্ত্রিসভার সফলতার ওপর পাতায় ব্যর্থতাও আছে। কারো কম, কারো বা বেশি। নতুনরা নিশ্চয়ই অতীতের ভুল থেকে শিখবেন। যা করা যায়নি গত এক দশকে, আগামী পাঁচ বছর এমন অনেক কিছু হবে। মানুষের মন তা-ই বলছে।
সংবিধানে সংরক্ষিত দুটি মৌলিক অধিকার শিক্ষা ও স্বাস্থ্য। এবার এই দুই মন্ত্রণালয়েও চমক এসেছে। দায়িত্ব পেয়েছেন নতুনরা। পদোন্নতি মিলেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে। প্রতিমন্ত্রী থেকে মন্ত্রী হয়েছেন জাহিদ মালেক স্বপন। আর মন্ত্রিসভার সবচেয়ে কনিষ্ঠ সদস্য মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল উপমন্ত্রী হয়েছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে। দেশ স্বাধীনেরও এক যুগ পর জন্ম তার। বাবা চট্টগ্রামের সাবেক মেয়র ও আওয়ামী লীগ নেতা প্রয়াত এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী।

৩৬ বছরের এই উপমন্ত্রীর অভিভাবক হিসেবে আছেন ডা. দীপু মনি। ২০০৯ সালের মন্ত্রিসভার এই পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবার দায়িত্ব পেয়েছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের। বয়সে তিনিও পঞ্চাশের কোটায়। এই দুজনের সমন্বয়ে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় যুগোপযোগী ও নতুন কোনো সংযোগ হবেÑ মানুষ এই আশা করছে।

শিক্ষাব্যবস্থার একটি বড় অংশ বেসরকারি খাতে। শিক্ষা এখন বাণিজ্যেরও বড় উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাল্যপাঠ থেকে উচ্চশিক্ষা, শিক্ষাব্যবস্থার অনেক উন্নয়ন হয়েছে। তবে বেসরকারি খাতে বাণিজ্যিকীকরণও হয়েছে বেশ। যা কখনো কেউ দেখেনি, ভাবেনি কখনো, এমন ঘটনা ঘটছে শিক্ষাব্যবস্থায়। লাখ লাখ টাকা ‘ডোনেশনের’ (অনুদান) বিনিময়ে সন্তানকে ভর্তি করাতে হচ্ছে ‘ভালো স্কুলে’। তারপর তো আছেই। আবার ‘সামাজিক স্ট্যাটাসের’ কমতি হলে অনেক স্কুলে সন্তানকে ভর্তি করার কথা ভাবনাতেও আনা যায় না। তারপর বাবা-মায়ের ইন্টারভিউ পর্ব তো আছেই।