বাবার সাদা শার্ট

হাবিবুল্লাহ ফাহাদ
| আপডেট : ১৬ জুন ২০১৯, ২০:৫৭ | প্রকাশিত : ১৬ জুন ২০১৯, ১৯:২৫

আমি তখন ক্লাস সিক্সে পড়ি। খাবারে খুব একটা রুচি নেই। লিকলিকে স্বাস্থ্য। সহপাঠীদের অনেকেই আমায় পেরিয়ে গেছে লম্বায়। যদিও তাদের তুলনায় বয়সে আমি ছোটই ছিলাম। খুব কম বয়সে স্কুলে যেতে শুরু করি। যে কারণে সহপাঠীদের পাশাপাশি দাঁড়ালে আমাকে অনেকে জুনিয়র বলেই ধরে নিত।

বয়স কিংবা উচ্চতায় কম হলেও বড়দের জামা-জুতোয় আমার বেশ আগ্রহ ছিল। বড়দের মতো করে চলার চেষ্টা করতাম। কথা বলা অনুকরণ করতাম। তাদের পাশাপাশি হাঁটার চেষ্টা করতাম। ইঁচড়ে পাকা শব্দটার মানে তখনো জানতাম না। যখন জানলাম তখন বুঝলাম যে, আমি ওটাই ছিলাম।

বড়দের মতো ভাব করতে গিয়ে দু-চারজন জ্যেষ্ঠ বন্ধুও জুটে গেল ওই সময়। ক্লাস সিক্সে পড়ি, বন্ধুত্ব ক্লাস নাইনের ছেলের সাথে। (যাদের অনেকে ছোটবেলায় আমায় কোলে তুলেছেন)। উপহার আদান-প্রদান। এমন হাসিরকাণ্ড অনেক ঘটিয়েছি জীবনে। তখন বুঝতাম না। এখন মনে হলে একা একা হাসি।

বড়দের পোশাক-পরিচ্ছদের চাহিদাটা মিটতো বাবার জামা-জুতোয়। কাপড়ের আলনায় চোখ থাকতো বাবার শার্টে। বাবা যখন না থাকতেন একটা একটা করে গায়ে গলিয়ে নিতাম। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মাথা দুলিয়ে নিজেকেই নিজে নিঃশব্দে প্রশ্ন করতাম, ‘কেমন লাগছে বলো তো? বাবার মতো লাগছে তো?’

বাবার শার্টগুলো পরলে মাথাটা ছাড়া শরীরের আর কোনো অংশই বাইরে থাকতো না। হাত দুটো হারিয়ে যেতো শার্টের লম্বা হাতায়। বুকপকেট হতো পেটপকেট। হাঁটুর নিচুতে গিয়ে শেষ হতো আলখেল্লা। বাবার একটা সাদা শার্ট আমার খুব প্রিয় ছিল। সাদা শার্টে গাঢ় নীল বোতাম। অন্য শার্টগুলো থেকে সাদা শার্টটা লম্বায় সামান্য ছোট ছিল। হাতা দুটোও জড়িয়ে রাখলে আমার হাত দুটো বের করা যেতো। শার্টটায় কোনো পকেট ছিল না। তাই বুকপকেট পেটপকেট হওয়ার বিড়ম্বনা থেকে বাঁচা যেতো।

বাবা প্রায়ই দেখতেন, তার সাদা শার্টটা পরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একা একা কথা বলছি। নিজেকে নানাভাবে দেখার চেষ্টা করছি। বাঁয়ে কাঁধ ঘুরিয়ে ডানে আবার ডানে কাঁধ ঘুরিয়ে বাঁয়ে দেখছি। উদ্দেশ্য হলো, আর কতটুকু বড় হলে শার্টটা আমার ঠিক হয়, তা দেখা। বাবা একদিন আমায় ডেকে বললেন, ‘সাদা শার্টটা তোর ভালো লাগে?’

আমি কোনো কথা বললাম না। মাথাটা ওপরে নিচে নাড়লাম।

তিনি কিছু বললেন না। চুলে হাত চালিয়ে আদর করলেন।

তার দুদিন পরের ঘটনা। হঠাৎ করেই আলনা থেকে বাবার সাদা শার্টটা উধাও। স্কুল থেকে ফিরে নাওয়া-খাওয়ার পর বাবার শার্ট পরে আয়নার দাঁড়ানোর পর্ব শুরু হবে। কিন্তু কী সাংঘাতিক ঘটনা! বাবার শার্টটা পাওয়া যাচ্ছে না। একে একে আলনার সব কাপড় নামানো হয়েছে। নাহ্, কোথাও তো নেই। দৌড়ে গেলাম মায়ের কাছে। বললাম, ‘বাবার সাদা শার্ট কোথায়?’

মা কাজে ব্যস্ত ছিলেন। বললেন, ‘দেখ কোথাও আছে হয়তো।’

আমি বললাম, ‘কোথাও তো নেই। আলনার সব কাপড় তো নামিয়েছি। বাবা কি পরে গেছে শার্টটা?’

প্রশ্নটা মায়ের কানে ভালোভাবে পৌঁছেনি। ‘আলনার সব কাপড় নামিয়েছি’- শোনার পর তড়িঘড়ি করে ঘরে গেলেন। দেখলেন, ধোয়া কাপড়গুলো সব মাটিতে লুটোপুটি খাচ্ছে। আমি তার পিছু পিছু যাচ্ছি। মনে করলাম, মা হয়তো সাদা শার্টটি খুঁজে পেতে আমায় সহযোগিতা করবেন। কিন্তু না। ঘরের মেঝেতে কাপড়ের স্তূপ দেখে তার মেজাজ সপ্তমে চড়লো। কষে চড় বসালেন গালে। বললেন, ‘এই তোর কাজ। ধোয়া কাপড়গুলো ময়লা করলি?’ দোষটা আসলে আমারই। আমি তো তার পেছন পেছন চড় খেতে দৌড়ে এসেছি।

এদিকে বাবার সাদা শার্টের হদিস মিলছে না, অন্যদিকে চড়। শোকে কাতর আমি সন্ধ্যা পর্যন্ত বিছানায় ঘুমের ভান ধরে পড়ে রইলাম। মনে মনে চিন্তা করতে লাগলাম, শার্টটা কোথায় গেল! বাবাকে তো সকালে অফিসে যাওয়ার সময় নীল শার্টটা পরতে দেখেছি। সাদা শার্টটা তবে কোথায় গেল! বিকেলে প্রতিদিনই খেলতে যাই। সেদিন গেলাম না। সন্ধ্যায় বাবা অফিস থেকে এসে দেখলেন আমি বিছানায় পড়ে আছি। তিনি মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন, ‘কী হয়েছে তোর? শরীর খারাপ করেছে?’

বাবার হাতের স্পর্শ পেয়ে আমি শোয়া থেকে উঠে বসলাম। বললাম, ‘তোমার সাদা শার্টটা কোথায়, বাবা? আলনায় তো নেই।’

বাবা আমার দিকে তাকিয়ে স্মিত হাসলেন। হাতে থাকা একটা ছোট্ট ব্যাগ বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘এই যে এখানে।’

আমি ব্যাগটা খুলে শার্টটা বের করে নিলাম। গায়ের জামাটা খুলে বাবার শার্টটা গায়ে গলিয়ে দিতে দিতে বললাম, ‘তুমি নিয়ে গিয়েছিলে? আমি তো অনেক খুঁজলাম।’

তারপর খাট থেকে দৌড়ে চলে গেলাম আয়নার কাছে। আশ্চর্য, আজকে শার্টটা এমন লাগছে কেন? হাতা দুটো গুটিয়ে নেওয়ার আগেই আমার হাত দুটো বেরিয়ে গেছে। লম্বাটাও তো হাঁটু পর্যন্ত পৌঁছেনি। কোমর থেকে একটু নিচে পড়েছে। ঢিলেঢালাও তো লাগছে না অন্যদিনের মতো। আয়নায় ভালো করে তাকালাম। একি শার্টটা তো দেখি ঠিকঠাক গায়ে লেগে গেছে। নাকের কাছে বাহুটা শুকে নিয়ে দেখলাম, বাবার গায়ের গন্ধ তো অটুট আছে।

বাবা তখন খাটে বসে আমার কাণ্ডকীর্তি দেখছেন। আমি আয়না থেকে সরে এসে বাবাকে বললাম, দেখো বাবা শার্টটা আমার গায়ে ঠিকঠাক লেগে গেছে। এটা কী করে সম্ভব? আমি কি বড় হয়ে গেছি?

বাবা আমায় কোলে তুলে নিলেন। কপালে চুমু খেয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ, তুই সত্যিই বড় হয়ে গেছিস।’

[বাবার খুব বেশি শার্ট ছিল না। মোটে চারটি। ঘুরে-ফিরে এগুলোই পরতেন।  ঘামে কলার ক্ষয়ে যাওয়া কিংবা রঙটা একেবারে চটে যাওয়ার আগ পর্যন্ত বাদ দিতেন না। সাদা শার্টটা তিনি শখ করে কিনেছিলেন। দামটা অন্যগুলোর চেয়ে কিছুটা বেশি ছিল। পরে মায়ের কাছে শুনেছি। কিন্তু সেদিন তিনি আমায় খুশি করতে প্রিয় শার্টটা আমার শার্টের মাপে কেটে ছোট করে এনেছিলেন।]

সংবাদটি শেয়ার করুন

ফেসবুক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :