বিজয় দিবসে আমাদের শখের রেডিও স্টেশন

আসাদুজ্জামান, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ১৭ ডিসেম্বর ২০১৯, ১২:৩৯ | প্রকাশিত : ১৭ ডিসেম্বর ২০১৯, ১১:৩৫

১৬ ডিসেম্বর ২০১৯। শীতের সকাল। সাতসকালে ঝনঝনিয়ে বেজে ওঠে মুঠোফোন। আমার তখন আধোঘুম আধো জাগরণ। ঘুম জড়ানো চোখে বালিশের নিচ থেকে হাতড়ে বের করি ফোন। ডিসপ্লের দিকে তাকাতেই দেখি মাহবুব ভাই। রিসিভ করতেই সালাম বিনিময়। ফোন দেয়ার কারণ জানতে চাই। জানালেন আজকের বিজয় দিবসে ওনার বাসায় আমার নিমন্ত্রণ। নিমন্ত্রণ জানানোর কারণটা হলো ওনার বেজ রেডিও স্টেশন সেটাপ দিতে হবে। 

একজন অ্যামেচার রেডিও অপারেটরের কাছে অন্য এক অপারেটর সহযোগিতা চাইলে না করার সুযোগ কম। তাই কোনো রকম চিন্তা-ভাবনা না করেই হ্যাঁ বলে দেই। চটজলদি বাসায় চলে যেতে বললেন। 

আড়মোড়া ভেঙে বিছানা ছাড়ি। তড়িঘড়ি করে ফ্রেশ হয়ে প্রাতঃরাশ সেরে প্রয়োজনীয় যন্ত্র এবং ডিভাইস নিয়ে মোটরসাইকেলে চড়ে বেরিয়ে পড়ি। আমার বাসা থেকে ওনার বাসা তিন-চার কিলোমিটারের পথ। যেতে যেতে চোখে পড়ে লাল-সবুজ পোশাক পরিহিত তরুণ-তরুণী, কিশোর-কিশোরীদের। বিজয় দিবস উদযাপন করতে তারা পথে নেমেছে। অনেকেরই মাথায় বাঁধা লাল-সবুজের পতাকা। চারদিকে উৎসবের আমেজ। আমার মনেও বিজয়ের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। মনে মনে গেয়ে ওঠি... আমারও দেশের মাটির গন্ধে ভরে আছে সারা মন...। 

তখন কুয়াশা ভেদ করে সূর্য উঁকি দিতে শুরু করেছে। আমিও পৌঁছে যাই নূরপুর, দনিয়া। গিয়ে গলির ভেতর উঁকিঝুকি দিয়ে খুঁজতে থাকি মাহবুব ভাইকে। তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবী হলেও তিনি সাংবাদিকতাও করেন। আর শখ হিসেবে অ্যামেচার রেডিওর চর্চা করেন। কিছুক্ষণ বাদেই তার দেখা মেলে। পথ দেখিয়ে তার বাসায় নিয়ে যান। 

প্রযুক্তি ও ইলেকট্রনিক্স যন্ত্র নিয়ে মাহবুব ভাইয়ের এত আগ্রহ সেটা তার বাসায় না গেলে জানা যেতো না। তার ঘরের এখানে-সেখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন গ্যাজেট ও যন্ত্রাংশ। সেগুলো পরখ করতে করতে মাহবুব ভাইয়ের মা চা-নাস্তা নিয়ে হাজির হন। খেতে খেতে আমরা আমাদের রেডিও স্টেশন আপ করার পদ্ধতি নিয়ে আলোচনাটা সেরে ফেলি। 

বলে নেই, আমার মতো মাহবুব ভাইও সরকারের লাইসেন্সপ্রাপ্ত অ্যামেচার রেডিও অপারেটর। আমার কল সাইন সিয়েরা টু ওয়ান লিমা ইকো (S21LE)। ওনার সিয়েরা টু ওয়ান চার্লি ভিক্টর (s21CV)। উনি সম্প্রতি অ্যামেচার রেডিওর লাইসেন্স সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) কাছ থেকে একটি বেজ রেডিও আমদানির ছাড়পত্র পান। ভেন্ডরের মাধ্যমে রেডিও আমদানিও করেন। রেডিওটির উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের নাম রেটিভিস। মডেল রেটিভিস আরটি ৯৫। এটি ২৫ ওয়াটের একটি রেডিও। 

এই একই মডেলের বেজ রেডিও মাসখানেক আগে তানভীর ভাই (s21VU) এবং আমি আমদানির ছাড়পত্র নিয়ে হাতে পেয়েছি। ইতোমধ্যে আমরা সেটি চালুও করেছি। বাংলাদেশে অনুমোদিত বেজ রেডিও পরিচালনায় আমরা অগ্রগামী। তাই মাহবুব ভাই তার রেডিও স্টেশন আপ করার জন্য আমাকে ডেকেছেন। আমি তথ্যপ্রযুক্তি খাত নিয়ে গণমাধ্যমে কাজ করলেও এই বিষয়ে দক্ষ নই। আমি এসব বিষয়ে তানভীর ভাইর কাছ থেকে শিখি। ওনাকে আমার গুরু মনে করি। কিন্তু গুরু তো সারাজীবন শিষ্যকে আগলে রাখবে না। শিষ্যকেও এক সময় গুরুর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে। তাই মনে সাহস সঞ্চার করে মাহবুব ভাইর বেজ রেডিও স্টেশন স্থাপনের কাজে হাত দেই।

বেজ রেডিও অপারেট করার জন্য আলাদা করে পাওয়ার সাপ্লাইর প্রয়োজন হয়। উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এর সঙ্গে পাওয়ার সাপ্লাই সরবরাহ করে না। তবে তারা পাওয়ার সাপ্লাই ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় দিক-নির্দেশনা দেয়। এরই ধারাবাহিকতায় তানভীর ভাইর পরামর্শে মাহবুব ভাই আমাকে সঙ্গে নিয়ে রাজধানীর স্টেডিয়াম মার্কেট থেকে ১২ ভোল্ট ও ৩০ অ্যাম্পিয়ারের  একটি পাওয়ার সাপ্লাই কেনেন। যার দাম এক হাজার টাকা। এটি একটি সুইচড- মোড পাওয়ার সাপ্লাই (এসএমপিএ)। রেটিভিস আরটি ৯৫ পরিচালনার জন্য ১২ ভোল্ট ও ১০ অ্যাম্পিয়ারের ডিসি কারেন্ট প্রয়োজন। আমাদের কেনা পাওয়ার সাপ্লাই সেটি দিতে সক্ষম। কিন্তু পাওয়ার সাপ্লাইটির এসি লাইন অনেকটাই অরক্ষিত। তাই মাহবুব ভাই তার নিজস্ব কারিগরি জ্ঞানের সম্মিলন ঘটিয়ে সেটার জন্য একটি পাওয়ার বক্স বানিয়েছেন। লাগিয়েছেন প্রয়োজনীয় রেগুলেটর ও নব। এতে করে বাসায় বেজ ব্যবহারের সময় শিশুরা সুরক্ষিত থাকবে।

তানভীর ভাই আমাকে সব সময় বলেন, ওয়াকিটকি কিংবা বেজ রেডিও চালু করার পূর্বশর্ত হচ্ছে অ্যান্টেনা কানেকশন সেটাপ করা। তাই আমরা স্টেশন সেটাপের প্রাথমিক কাজ হিসেবে অ্যান্টেনা সেটাপে মনোনিবেশ করি। বেজের সঙ্গে উৎপাদনকারীরা কোনো ধরনের বিল্টইন অ্যান্টেনা সরবরাহ করে না। তাই মাহবুব ভাই সিনিয়র হ্যামদের পরামর্শ অনুযায়ী একটি ফ্যান্টম অ্যান্টেনা, ক্যাবল ও প্রয়োজনীয় কানেক্টর কিনে রেখেছিলেন।

ফ্যান্টম অ্যান্টেনা আকারে ছোট হলেও বেজের সঙ্গে দারুণ কাজ করে। আমি ইতিমধ্যে এই অ্যান্টেনা ব্যবহার করে সফলতা পেয়েছি। ঢাকা থেকে ৯৫ কিলোমিটার দূরে বেজ স্টেশন স্থাপন করে রিলে সিস্টেমের মাধ্যমে ঢাকার হ্যামদের সঙ্গে সফল রেডিও যোগাযোগ সম্পন্ন করছি। 

মাহবুব ভাইয়ের বাসার পাশের এক পাঁচতলা ভবনের ছাদে ক্যাবল টেনে নেই। ক্যাবলের মাথায় কানেক্টর দিয়ে জুড়ে দিয়ে ফ্যান্টম অ্যান্টেনা। এবার ভবন থেকে নিচে নেমে বেজ চালুর পালা।  রেডিওর সঙ্গে অ্যান্টেনা ক্যাবল সেটাপ করি। সেটের পাওয়ার ক্যাবল যুক্ত করি। পাওয়ার সাপ্লাই চালু করতেই চালু হয় বেজ। এবার রেডিওর সঙ্গে হ্যান্ডমাইক জুড়ে দিয়ে পিটিটি করি। সফলভাবে S21VU, S21NO, S21BT এসব কলসাইনধারী রেডিও স্টেশনের সঙ্গে কিউএসও হয়। 

এবার বেজের সঙ্গে রিলে সিস্টেম যুক্ত করতে হবে।  অ্যামেচার রেডিও সোসাইটি অব বাংলাদেশ (এআরএসবি) এর সাধারণ সম্পাদক অনুপ কুমার ভৌমিক S21TV এর সঙ্গে যোগাযোগ করে মাহবুব ভাই রিলে সিস্টেমে তার বেজ রেডিও যুক্ত করার অনুমতি চান। অনুপ দাদা সানন্দে রিলে সিস্টেমে যুক্ত হবার ব্যবহারের প্রয়োজনীয় দিক-নির্দেশনা দিয়ে অনুমতি দেন। ইতোমধ্যে আমরা সংগঠনটির সঙ্গে যুক্ত হবার জন্য অনলাইনে আবেদন করেছি। যেটা প্রক্রিয়াধীন আছে। 

রেডিও স্টেশন সেটাপ করতে করতে কখন যে দুপুর গড়িয়েছে খেয়ালই করিনি। কাজের ভিড়ে ক্ষুধা-তৃষ্ণার কথা ভুলেই ছিলাম দুজনে। খালাম্মার রান্না-বান্না শেষ হলে খাবার খেতে তাগাদা দেন। দুই হ্যাম ভাই মিলে কব্জি ডুবিয়ে খেয়েছি। বিজয় দিবসে মায়ের হাতের রান্না মুখে অসাধারণ স্বাদ যোগ করে। খেয়ে দেয়ে এবার বাসায় ফেরার পালা। তখন সূর্য গোধূলির দিকে। মোটরসাইকেল চেপে বাসায় ফিরতে ফিরতে চোখে পড়ে চারদিকে বিজয় উ’ল্লাস। পুরো বাঙালি জাতি মেতেছে এই উৎসবে। 

ঢাকায় অবস্থানরত অ্যামেচার রেডিও অপারেটরদের বিজয় উৎসবটা হয় অনুপ দাদার নেতৃত্বে। তিনি রাত নয়টার দিকে সবাইকে রেডিওতে ডাকেন। আয়োজন করেন বিজয় দিবস নেটের। এতে অংশগ্রহণকারীরা নেট কন্ট্রোলারের মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে বিজয় দিবসের শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। নেট কন্ট্রোলার অনুপ দাদা এআরএসবির আগামী কর্মসূচি তুলে ধরেন। বলেন সংগঠনটিতে নতুন সদস্য নেয়ার প্রক্রিয়া চলছে। বিজয় দিবস নেটে প্রথমবারের মতো অংশ নেন মাহবুব ভাই। বেজ রেডিও দিয়ে কথা বলে এবারই ভিন্নভাবে বিজয় উৎসবে মাতোয়ারা হন তিনি। তার মতো অ্যামেচার রেডিও অপারেটরদের কাছে বিজয় দিবস মানেই রেডিও দিয়ে দেশের জন্য নতুন কিছু করার প্রত্যয়। ৭৩।

(ঢাকাটাইমস/১৭ডিসেম্বর/এজেড) 

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :