আমাদের রোয়াংছড়ি আমাদের দেবতাখুম

কুজ্ঝটিকায় আচ্ছন্ন চারদিক, সময় সকাল সাড়ে ৭টা হবে। তখনও পাহাড়ি লতাপাতাগুলোর ঘুম ভাঙেনি। বিশেষত ফার্নবর্গীয় উদ্ভিদগুলোর তো গা বেয়ে সমানতালে পড়ছে কুয়াশার পানি। আশপাশে তাকানো মানে সুবিশাল উঁচু উঁচু পাহাড়। চাদের গাড়ি চলছে। আশপাশ সূর্যের আলো নেই বললেই চলে। অনেক দূর গিয়ে শীতে কাতর হয়ে বেমালুম ভুলেই গেছি সময় কটা। এবার কাঁপুনি শরীরে ডান হাত দিয়ে বাম হাতের জ্যাকেটা টান দিয়ে দেখলাম হাতের ঘড়িতে সময় সকাল ৮টা। ১৫ মিনিট পর পৌঁছে গেছি রোয়াংছড়ি বাজারে। তখন দেখি ছোট্ট এই শহরটাই আলোর ঝলকানি। চারদিকটা আলোয় ঝলমল করছে।
গাড়ি থেকে নেমে বাজারে একটু ফ্রেশ হয়ে নাশতা করলাম মদিনা হোটেলে। এ উপজেলায় মার্মা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, মুরং, বম, খেয়াং, খুমী প্রভৃতি উপজাতি নৃ-গোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। এ শহরটার মাঝেও দেখলাম সুন্দর এক ব্যস্ততা। সকাল সকাল কম বয়সী মেয়েরা তাদের নিজস্ব পোশাকে সজ্জিত হয়ে দল বেঁধে কোথায় যেন যাচ্ছে। যেহেতু পার্বত্য এলাকায় আমি প্রথম তাই অতি উৎসাহী হয়ে চারদিকের পরিবেশটা অবলোকন করছি। এর মধ্যে কিছু কাজ করা অত্যাবশ্যক ছিল, সেগুলোর জন্য বেরিয়ে পড়লাম। প্রথমত থানা পুলিশের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও অনুমতি পরবর্তী সময়ে রোয়াংছড়ি থেকে কচ্ছবতলি আর্মি ক্যাম্পের অনুমতি। উভয় কাজ সম্পাদন শেষে বেরিয়ে পড়া খুমের স্বর্গরাজ্য দেবতাখুমের উদ্দেশে।

কচ্ছবতলি বাজারের মধ্য দিয়ে যেতে হয় দেবতাখুমে, বাজারটিতে মোটামুটি ১৩-১৪টির মতো দোকান দেখা যায়। ছোট ছোট এই দোকানগুলোতে হরেক রকমের জিনিস মেলে। বাজার পেরিয়ে ছোট্ট একটা লোহার সাঁকো তারপর কয়েকটা বাড়ি মিলে একটা গ্রাম আর এখান থেকেই শুরু হয়েছিল আমাদের ট্র্যাকিং। প্রথমে পাহাড়ে ইট বিছানো রাস্তা দেখে যেমনটা সহজ মনে হয়েছিল এরপর পর পর দুটো পাহাড় পার হতে গিয়ে খানিকটা বেগ পেতে হয়েছিল। পাহাড়ি রাস্তা চলাচলে যেটা আমার ক্ষেত্রে হয় উঠার সময় যতটা টেনেটুনে উঠি নামার সময় পা ততটাই এগিয়ে চলে, এক সময় দেখি পায়ে সমতা থাকে না আর সেজন্য একটু জিরিয়ে নেওয়া অত্যাবশ্যক হয়ে পড়ে। পাহাড়ি পথে চলতে থাকলে দেখা মিলবে হরেক রকমের গাছ আর ফুল।
এবার বন্ধুর পথে পাহাড়ে উঠানামা করে এক চূড়ায় গিয়ে দেখা মিলল এক ছোট্ট গ্রামের। গ্রামটিতে যেতে হলে উঁচু পাহাড় থেকে মোটামুটি খাড়াভাবে নামতে হবে। সাবধানভাবে পা ফেলে আস্তে আস্তে নেমে আপনি দেখবেন পায়ের কাছে সুন্দর একটা পানির প্রবাহ। শীতল এই পানির ধারাটি আসে দেবতা খুমের ঝরনা থেকে। মধ্যাহ্নের তির্যক রৌদ্র ছোট্ট এই জলাধারের প্রবাহে পড়ে চিকচিক করে। স্বচ্ছ এই পানিতে হাত বুলিয়ে একপ্রকার অতুলনীয় প্রশান্তির অনুভব করা যায়। ছোট-বড় পাথরের ভেতর দিয়ে এই পানির প্রবাহ গিয়ে অনেক দূরে ঠেকেছে। আবারও এগিয়ে চলা।

কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা একটা ছোট্ট পাড়ায় প্রবেশ করলাম, পাড়ার নাম শীলবান্ধা। মোটামুটি ১৪ থেকে ১৫টি ঘর মিলে এই পাড়াটি। পাড়ার ভেতরে ঢুকতে ইমাচাংয়ের ওপর থেকে মিষ্টি এক অভিবাদন। ৩ থেকে ৪ বছর বয়সী হবে এমন একটা ছোট্ট বাচ্চা আমাদের দেখে মুচকি হাসি দিয়েই এই অভিবাদন জানিয়েছিল। পাড়ায় ঢুকতেই আরেকটি জিনিস চোখে পড়ল, সেটি হলো তাদের দেবতা। একটা বাঁশের ওপর ভর করে তার ওপরে থালার মতো করে চাটাইয়ের ওপর ২টি কলা ও কিছু ফুল রাখা ছিল। তাদের দেবতাকে খুশি করার জন্য তারা নিয়মিত এখানে পূজা করেন। যেহেতু পাড়ার সামনেই তারা দেবতাকে রেখেছেন তাই তারা মনে করেন দেবতাই তাদের অতন্দ্র প্রহরী। এখানকার ঘরগুলো মাচার ওপরে। নিচে থাকে তাদের দৈনন্দিন কাজে ব্যবহৃত জিনিসগুলো। এখানকার মানুষ খুব সহজ-সরল অনেকটা প্রকৃতির মতো। পাড়া পেরোতে চোখে পড়ল তাদের বাড়ির মধ্যকার দৈনন্দিন কাজ করার। বড় বড় বন মোরগ কিন্তু চোখের আড়াল হয়নি সঙ্গে তাদের অন্য গৃহপালিত পশুপাখিও। পাড়ার শেষে ছোট্ট দুটি বিশ্রাম নেওয়ার চেয়ার। ক্লান্তি শেষে বিশ্রাম নেওয়ার জন্য যথেষ্ট উপযুক্ত।
এবার কাঠের সিঁড়ি পেরিয়ে নিচে নেমে চোখে পড়ল অপার্থিব দেবতা খুম। খুমের ভেতর থেকে পানি বেয়ে পড়ছে। আশপাশে পাহাড় আর গাছগাছালি ছাড়া কিছু নেই। লতাপাতায় মোড়ানো দুটি পাহাড় দু হাত দিয়ে আগলে রেখেছে এই স্বর্গরাজ্যের দেবতা খুমকে। বাঁশের ভেলা বানিয়ে এটি ভাসিয়ে চললাম অজানা সৌন্দর্য উপভোগ করতে। এক ভেলায় দুজন সামনে একজন আর পেছনে একজন। অবশ্যই ভারসাম্য বজায় রেখে চালাতে হবে না হলে ১৫০ থেকে ২০০ ফিট নিচে পড়তে হবে। এটা হলো এখাকার পানির গভীরতা।

সাঁতার জানা না থাকলে অবশ্যই লাইফ জ্যাকেট পরা বাধ্যতামূলক। ভেলা ভাসিয়ে চলছি আর সৌন্দর্য সুধা পান করছি। অবাক হয়ে দেখছি এত সুন্দর কীভাবে হয়। এখানে সূর্যের আলো পুরোপুরি প্রবেশ করতে পারে না। খুব কম সময়ের জন্য কিছু আলো প্রবেশ করতে পারে আর সেটাকে আমি ভাগ্যবশত ক্যামেরা বন্দি করে রেখেছি।
পুরো ঠান্ডা পানিতে শরীরের যেখানে পানি পড়ে ঠান্ডায় বরফ হওয়ার উপক্রম। তারপরও ভ্রমণ পিপাসুদের এটা কিছুই নয়। ভেলা যখন ঠিক মাঝখানে তখন আমার বিমোহিত অবস্থা এত সুন্দর এক গহিন অপার্থিব খুম। এত নীরব যে একটা পাতা পানিতে পড়লে সেটির সম্পূর্ণ শব্দ শোনা যায়। এক মিনিট চোখ বন্ধ করে ছিলাম। শেষমেশ শেষ অবধি গিয়ে আবার ফেরত আসা। দেখে ফেললাম খুমের স্বর্গরাজ্য দেবতা খুম। এক অপার্থিব ভালো লাগার জায়গা, ভালোবাসার জায়গা।
যেভাবে যাবেন: ঢাকা থেকে বান্দরবানগামী বাসে বান্দরবান। সেখান থেকে চাঁদের গাড়ি অথবা বাসে করে রোয়াংছড়ি। রোয়াংছড়ি থেকে চার্জার গাড়ি অথবা চাঁদের গাড়ি করে কচ্ছবতলি বাজার। সেখান থেকেই মূলত ট্র্যাকিং শুরু। এর জন্য অবশ্যই জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি সঙ্গে থাকতে হবে।
(ঢাকাটাইমস/২০ডিসেম্বর/আরজেড)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













































