‘সবাই ধর্মটা পালন করি, এটাই করোনার চিকিৎসা’

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকাটাইমস
 | প্রকাশিত : ৩১ মার্চ ২০২০, ১৭:৪৭

বিশ্বজুড়ে মহামারি আকার ধারণ করা করোনাভাইরাসের এখনও কোনো চিকিৎসা আবিষ্কার হয়নি। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাই এই ভাইরাসজনিত রোগের প্রধান চিকিৎসা। এজন্য প্রত্যেককেই নিজ নিজ ধর্ম যথাযথভাবে পালনের আহ্বান জানিয়েছেন তথ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসান এমপি। তার মতে, ইসলামসহ সব ধর্মই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার প্রতি জোর দিয়েছে।

দেশব্যাপী সাধারণ ছুটি চলাকালে নিজ বাসা থেকে ফেসবুক লাইভে প্রতিমন্ত্রী করোনাভাইরাস প্রতিরোধে বিভিন্ন টিপস দিয়েছেন। সবাই ঘরে থাকলে এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনাগুলো মেনে চললে বাংলাদেশে রোগটির তেমন বিস্তার ঘটবে না বলে আশা করছেন তিনি।

বর্তমানে তথ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা মুরাদ হাসান এর আগে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীও ছিলেন। তিনি একজন চিকিৎসকও। তার ফেসবুক লাইভের বিস্তারিত বিবরণ পাঠকদের জন্য নিচে তুলে ধরা হলো:

আজ এমন এক সময়ে লাইভে এসেছি যখন শুধু বাংলাদেশ নয় সারাবিশ্ব এক কঠিন দুর্যোগ মোকাবিলা করছে, যা কোভিড-১৯ নামে পরিচিত। এই করোনাভাইরাসকে মোকাবিলা করতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ বাংলাদেশ সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ইতিমধ্যেই ১০ দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জরুরি প্রয়োজন ছাড়া সবাইকে ঘরে থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। সমাজের সকল স্তরের মানুষের জন্য তিনি বিশেষ নির্দেশনা বা উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। যা গত ২৫ শে মার্চ তারিখে তার দেওয়া জাতির উদ্দেশে ভাষণে বিস্তারিত উল্লেখ করেছেন।

এই কোভিড-১৯ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা ধরনের আতঙ্ক কাজ করছে। আতঙ্কিত না হয়ে বা গুজবে কান না দিয়ে বরং করোনাভাইরাসকে কীভাবে মোকাবিলা করতে হবে সে বিষয়ে আমি মূলত লাইভে এসেছি কিছু কথা বলার জন্য। আমরা জানি, করোনার কারণে বৈশ্বিক যে দুর্যোগটি সৃষ্টি হয়েছে সেটির শুরু হয়েছে চীনের হুবেই প্রদেশে। সেখান থেকে এই করোনা ভাইরাস সম্পর্কে বিশ্ববাসী জানার শুরু করে। এর ভয়াবহ যে কী পরিমাণ হতে পারে বা কত মানুষকে যে এটা আক্রমণ করতে পারে এ সম্পর্কে আসলে বিশ্ববাসীর কোনো ধারণা ছিল না। আজকে সমগ্র বিশ্বের ১৯৭টি দেশ আক্রান্ত। সমগ্র বিশ্ব আজ লকডাউনে। অর্থাৎ পুরো বিশ্ব অচল হয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে আমরা বাংলাদেশের মানুষ করোনা দুর্যোগ মোকাবিলায় কীভাবে কাজ করছি সে সম্পর্কে একটু আলোকপাত করতে চাই।

আমি শুরুতেই বলেছি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশে ভাষণের মধ্য দিয়ে সমগ্র জাতিকে তিনি দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। তার যে দিকনির্দেশনা তা আমি মনে করি সবচেয়ে উত্তম দিকনির্দেশনা। আমার এ কথায় অনেকে মনে করেন আমি দল করি অথবা সরকারের একজন প্রতিমন্ত্রী, আমি তো সরকারের পক্ষে কথা বলবই। আমি আসলে আজকে আপনাদের সামনে একটি একজন রাজনৈতিক কর্মী বা মন্ত্রী হিসেবে নয়, এসেছি সাধারণ মানুষ হিসেবে। একজন চিকিৎসক হিসেবে হাজির হয়েছি, এখানে আমার অন্য কোনো উদ্দেশ্য নেই।

আমি পৃথিবীর ৭০০ কোটি মানুষেরই একজন। আমার ধর্ম যাই হোক, আমি যে জাতিরই হই না কেন, আমি একজন মানুষ। সৃষ্টিকর্তা আমাকে মানুষ হিসেবে সৃষ্টি করে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। আমার জন্ম হয়েছে বাংলাদেশে, আমি একজন বাঙালি। আমি এদেশের স্বাধীনতাকে বা স্বাধীনতার চেতনাকে মনে-প্রাণে বিশ্বাস করি। দেশের মানুষকে ভালোবাসি, মানুষের উপকার করতে চাই। আমি আমার সারা জীবন দিয়ে মানুষের সেবা করতে চাই। এর বিনিময়ে আমি কী পাব কি পাব না এতে আমার কিছু আসে যায় না। আমার নীতি একটাই। আমার পিতা বীর মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান তালুকদার। উনি যখন মুক্তিযুদ্ধ করেছেন দেশের জন্য আমি তার সন্তান হয়ে এখন দেশে যে যুদ্ধ শুরু হয়েছে করোনার বিরুদ্ধে আমি আপনাদের একজন স্বজন হয়ে সে যুদ্ধে শামিল হতে চাই।

করোনায় কী করণীয় এটা আমি সহজ ভাষায় বলতে চাই। টেলিভিশন রেডিওতে অনেক সময় কঠিন কঠিন ভাষা ব্যবহার করা হয়, আমি তা করব না। করোনায় কী করণীয়, আমি একজন ডাক্তার হিসেবে কী করছি এটা বলতে চাই। সারাদিন টিভিতে একটাই উচ্চারণ করোনাভাইরাস, করোনাভাইরাস, এটা শুনতে শুনতে আমার নিজের স্ত্রী-সন্তানরাই আতঙ্কিত। কারণ এই শব্দগুলো শুনতে শুনতে আমরা যে জ্ঞান অর্জন করেছি পৃথিবীর ৭০০ কোটি মানুষ আর কোনো বিষয়ে এত জ্ঞান অর্জন করেনি।

আমরা ডায়রিয়া দেখেছি, ম্যালেরিয়া দেখেছি, প্লেগ দেখেছি, স্প্যানিশ ফ্লু দেখেছি, বার্ড ফ্লু দেখেছি এত আতঙ্কিত হই নাই। করোনার আতঙ্কটা কেন এত বেশি। কারণ এটা ছোঁয়াচে। একজন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত মানুষ থেকে এক হাজার মানুষ আক্রান্ত হতে পারে। আমি কী করছি, আমি ঘরের মধ্যে বসে আছি। এখন প্রশ্ন উঠবে যে আপনি খাবেন কীভাবে? হ্যাঁ আমি খাব কারণ আমি তো বাজার করেছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তো বাজার বন্ধ রাখতে বলেন নাই। প্রতিদিনই বাজার করছি। অনেকে দেখলাম এক মাসের বাজার করে রেখেছে। এক মাসের বাজার যারা করে রেখেছেন তাদের তো ঘর থেকে বের হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। ঘরে থাকলেও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে। সারাক্ষণ সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে।

আমরা কেউ হেক্সিসল ব্যবহার করছি, কেউ হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করছি, কেউ লাক্স সাবান ব্যবহার করছি, যে যাই করি মূল কথাহল সাবান দিয়ে হাত পরিষ্কারভাবে ধুতে হবে। কেন বার বার হাতের কথা আসছে। কারণ হাতের মাধ্যমেই এই ভাইরাসটা আমাদের শরীরে প্রবেশ করে। আর আমরা যা কিছুই করি হাত দিয়েই করি। এই ভাইরাসটা যেখাবেই যাবে ১৫ দিন সেখানে অবস্থান করে। আর আক্রান্ত ব্যক্তির শ্বাস-প্রশ্বাস, হাঁচি-কাশির মধ্য দিয়ে এই অন্যের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।

আপনারা তো জানেন এই রোগীর জ্বর থাকে বেশি, সর্দি কাশি থাকে নিউমোনিয়া রোগীদের মতো। প্রথম সাত দিন রোগী কিছুই বুঝে না যে সে এই রোগে আক্রান্ত হয়েছে। কারণ প্রথমে এটা গলায় গিয়ে বসে তাকে তাই গলা ব্যথা শুরু হয়। এরপর খাবার-দাবারের মাধ্যমে ফুসফুসে যায়। সেখানে গিয়ে ভাইরাসটা বংশ বিস্তার করতে থাকে আস্তে আস্তে ফুসফুসের কার্যক্ষমতা নষ্ট করতে থাকে। পরে শ্বাস কষ্ট শুরু হবে। আসলে যাদের শ্বাসকষ্ট আছে তাদের জন্য এটা ভয়াবহ। তাই আমি বলছি যারা অ্যাজমা রোগী তারা খুব বেশি সতর্ক থাকবেন। যাদের বয়স বেশি তারাও সতর্ক থাকতে হবে। তবে আমি বলি না যে, ছোটরা করোনার আতঙ্ক থেকে মুক্ত। সবাই সতর্ক থাকতে হবে। এটা মন্ত্রী, এমপি, রিকশা চালক কাউকেই খাতির করবে না।

আপনারা জানেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী আক্রান্ত, প্রিন্স চার্লস আক্রান্ত, কানাডার প্রধানমন্ত্রী ডাস্টিন ট্রুডোর স্ত্রী আক্রান্ত। আমাদের দেশে মাত্র পাঁচজন রোগী এ পর্যন্ত করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। এদিক থেকে বলা যায় আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের অশেষ রহমত যে আমাদেরকে আল্লাহ তায়ালা এখনো পর্যন্ত অনেক ভালো রেখেছে। এখন প্রশ্ন হলো, কখন আপনি হসপিটালে যাবেন? একটু জ্বর, সর্দি, কাশি হলে হাসপাতালে যাবেন না। ঘরের মধ্যেই থাকবেন। আপনাদের সবার মোবাইল আছে। বাংলাদেশে ১৩ কোটি মানুষ মোবাইল ব্যবহার করে। যারা মোবাইল ব্যবহার করে না তারাও সচেতন। আমার মনে হচ্ছে আমাদের দেশের সব মানুষই সচেতন। কথা হচ্ছে শুধু পরিষ্কার থাকেন, সাবান দিয়ে হাত ধোন, গোসল করেন ভালো করে।

আমি আরও একটি অনুরোধ করতে চাই। আমরা যারা মুসলমান তারা পাঁচ ওয়াক্ত নামাড় পড়ি। এরচেয়ে ভালো চিকিৎসা আর নেই। আমরা যারা অন্য ধর্মাবলম্বী আছি তারা সবাই নিজ নিজ ধর্মটাকে পালন করি। কারণ কোনো ধর্মই বলেনি অপরিষ্কার থাক, অপরিচ্ছন্ন থাক। তাই আমি আবারো অনুরোধ করছি যার যার ধর্ম সে পালন করুন। মুসলমান ভাইদের বলতে চাই, আপনাদের নামাজ ঘরেই পড়ুন, মসজিদে যাবার দরকার নেই। কোনো দেশের মসজিদে এখন আর নামাজ হয় না। ইমাম সাহেব মোয়াজ্জিন সাহেব আজান দেবেন এটাই স্বাভাবিক, এতে কোনো অসুবিধাও নেই। যদি কেউ একান্তই মসজিদে যান তাহলে কমপক্ষে তিন ফুট দূরে দাড়াবেন। এখন যদিও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে কমপক্ষে ছয় ফুট দূরে থাকতে হবে।

আমরা হ্যান্ডশেক করব না। অফিস-আদালত সব ছুটি অর্থাৎ বাইরে কোনো কাজ নেই। আজকে প্রশাসন মাঠে নেমেছে। পুলিশ- সেনাবাহিনীর ভাইয়েরা জীবনবাজি রেখে মাঠে কাজ করে যাচ্ছে। আমার কথা হচ্ছে কেন তাদের মাইক দিয়ে বলতে হবে আপনারা ঘরে থাকুন। যারা কাজ করছেন প্রশাসন, পুলিশ, সেনাবাহিনী তারা আমাদেরই ভাই, বন্ধু তাদেরকে আমাদের সহযোগিতা করতে হবে।

আমরা অনেকেই বলি তারা জনগণের চাকর। হ্যাঁ এটা ভুল না আমি প্রতিমন্ত্রী, আমিও জনগণের চাকর। আমি বঙ্গবন্ধু মেডিকেলে অনারারি কনসালটেন্ট হিসেবে চাকরি করেছি চার বছর। এবার মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাকে দয়া করে মন্ত্রী বানিয়েছেন আমার অত যোগ্যতা নেই। আমি খুব বড় ডাক্তারও না কিছুই না।

অনেকে বলতে পারেন আপনি কী দায়িত্ব পালন করেছেন? আমি বলব আমি কয়েক ঘণ্টা ঘুম ছাড়া বাকি সব সময়টুকুই এসব নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। ফেসবুকে আমার আইডি মুরাদ হাসান এমপি, আমার পেইজ মুরাদ হাসান। আপনারা আমাকে দেখেন প্রতিদিন অসংখ্য স্ট্যাটাস আমি দিচ্ছি শুধু সচেতনতার জন্য, আর কোনো উদ্দেশ্য নাই। আমার বাংলার ১৬ কোটি মানুষ ভালো থাকুক সুস্থ থাকুক এটাই চাই। আমার একটাই চাওয়া, আমরা যদি সত্যি দেশকে ভালোবাসি এদেশের মানুষের জন্য আমরা জীবন দিয়ে কাজ করব। এই প্রতিজ্ঞা রক্ষা করতে আমাদের কী করতে হবে- ঘরে থাকতে হবে। আর কিছুই করতে হবে না। আর আপনার মোবাইল ফোনটা ব্যবহার করেন। আপনি অনলাইনে থাকেন, ইন্টারনেট বা টেলিভিশনের সামনে থাকেন। তার মানে এই নয় যে বের হওয়া যাবে না। ওষুধপত্রের জন্য দোকান খোলা থাকবে। আপনার জন্য কাজ করতে পারলে আমাদের জীবন ধন্য হবে। এটাই এই সরকার চায়।

অনেকে হয়ত কষ্ট পেতে পারেন এটা অনিচ্ছাকৃত। কোনোভাবেই ইচ্ছাকৃত নয়। আমরা তো ভুল করতে পারি। আমরাও তো মানুষ। আমি আবার আসব আপনাদের সামনে। সচেতন থাকুন, সাবধান থাকুন, কিছু হবে না ইনশাল্লাহ। আমরা এই বাংলাদেশের মানুষ যুদ্ধে করে জিতেছি। এবারও আমরা জিতব আল্লাহ তায়ালা সহায় হোন। আমাদের মাত্র পাঁচ জন মারা গেছে। এই সংখ্যা যেন না বাড়ে। আপনারা শুধু ঘরে থাকুন।

(ঢাকাটাইমস/৩১মার্চ/এএইচ/জেবি)

সংবাদটি শেয়ার করুন

স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :