সাতক্ষীরার উপকূলে বাঁধ নির্মাণে স্বেচ্ছাশ্রমই ভরসা

এম বেলাল হোসাইন, ঢাকাটাইমস
 | প্রকাশিত : ২৯ জুন ২০২০, ২২:২৪

দেশের সর্ব দক্ষিণের জেলা সাতক্ষীরা। প্রতিবছর প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় আতঙ্কে দিন কাটে এ জেলার উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের। প্রাকৃতিক দুর্যোগকে ভয় না পেলেও ছোটখাটো আঘাতে উপকূলীয় অঞ্চলের জরাজীর্ণ বেড়ি ভেঙে প্লাবিত হওয়ায় আতঙ্কটা বেশি থাকে তাদের।

গত ২০ মে সুপার সাইক্লোনেও ব্যতিক্রম হয়নি। শ্যামনগর ও আশাশুনি উপজেলার একাধিক স্থানে বেড়িবাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয়েছে বিস্তীর্ণ এলাকা। এসব বেড়িবাঁধ নির্মাণের একমাত্র ভরসা স্বেচ্ছাশ্রমই। অথচ বেড়িবাঁধ নির্মাণের জন্য প্লান পাশের অপেক্ষায় বসে আছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।

তবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, তারা অনেক স্থানে ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছেন। মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত স্থানগুলোতে সেনাবাহিনী কাজ করছে। সুতরাং স্বেচ্ছাশ্রমই একমাত্র ভরসা বলার সুযোগ নেই।

আম্পান তাণ্ডবে শ্যামনগরের গাবুরা ইউনিয়নের নাপিতখালী, পার্শ্বেমারী, খলশেবুনিয়া ও চাঁদনীমুখা, বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের পোড়াকাটলা, টুঙ্গিপাড়া ও হুলো, মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের চুনকুড়ি, কাশিমাড়ি ইউনিয়নের ঝাপালী ঘোলা ও ত্রিমোহনী আটুলিয়া, রমজাননগর ইউনিয়নের গোলাখালী, পদ্মপুকুর ইউনিয়নের বাইনতলা, কামালকাটি, সুভদ্রকাটি, আশাশুনির খাজরা ইউনিয়নের খাজরা বাজার পয়েন্ট, গদাইপুর আনুলিয়া ইউনিয়নের কাকবাসিয়া, বিছট শ্রীউলা ইউনিয়নের হিজলা, মাড়িয়ালা ও কাকড়াবুনিয়া, প্রতাপনগর ইউনিয়নের ঘোলা, নাকনা, কুড়িকাউনিয়া ও চাকলা, আশাশুনি সদর ইউনিয়নের বলাবাড়িয়া দয়ারঘাট ও জেলেখালী, খুলনার কয়রা উপজেলার হরিণখোলা, ২ নাম্বার কয়রা, উত্তর বেতকাশি, রতœারঘেরি, গাজীপাড়া, দক্ষিণ জোড়সিং, আংটিহারা, মেদেরচর, গোলখালী, দশালিয়া, হামকুড়সসহ বিভিন্ন স্থানে ৭৭টি পয়েন্টে বেড়িবাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়।

এর আগের সিডর, আইলা, মহসেন, বুলবুল ও ফণিসহ সব ঘূর্ণিঝড়েরই কমবেশি ক্ষত চিহ্ন রয়েছে এসব এলাকায়। সর্বশেষ আম্পানেও এসব ইউনিয়নে নদীভাঙন হয়েছে বেশি। এসব এলাকার অধিকাংশ স্থান এখনো তলিয়ে আছে। আম্পানের পর থেকে এসব এলাকার কয়েক হাজার মানুষ স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে বাঁধ নির্মাণের কাজে নেমেছেন। তারা রাতদিন পরিশ্রম করে বেশ কিছু বাঁধ ইতোমধ্যে বেঁধে ফেলেছেন। তবে তা কতক্ষণ টিকে থাকে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

২০ মে সুপার সাইক্লোন আম্পানের আঘাতে আটটি পয়েন্টে বেড়িবাঁধ ভাঙে। স্থানীয় লোকজন নিয়ে পরের দিন ছয়টি পয়েন্টে বাঁধবাঁধা সম্ভব হলেও দুটি পয়েন্টে বাঁধা যায়নি। ফলে ওই দুটি পয়েন্ট দিয়ে পানি ঢুকে গ্রামের পর গ্রাম প্লাবিত হয়। সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রায় দুই সহস্রাধিক পরিবার। আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয় সহস্রাধিক পরিবার।

তিনি বলেন, পদ্মপুকুর ইউনিয়নে ৩৭ হাজার জনসংখ্যা। আট হাজার পরিবার। প্রায় সবাই কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত। দশ কিলোমিটার কাঁচা রাস্তার কোনো অস্তিত্ব নেই। ছয় কিলোমিটার ইটের সোলিং ভেঙে গেছে। উঁচু রাস্তার উপর এখনো মানুষ টোং বেঁধে বসবাস করছে।

শ্যামনগরের কাশিমাড়ী ইউনিয়নের ইমদাদুল হক, আকবর আলী, আজগর আলীসহ অনেকেই জানান, সুপার সাইক্লোন ‘আম্পানের আঘাতে লন্ডভন্ড হয়ে গেছে উপকূলবর্তী শ্যামনগর উপজেলা। জরাজীর্ণ বাঁধের ভাঙন কবলিত অংশ মেরামত করতে না পারার কারণে দাতিনাখালী, গাবুরা, নাপিতখালী, নেবুবুনিয়া, পদ্মপুকুর, ঘোলা, ঝাপালী ও দুর্গাবাটিসহ গোলাখালীর মানুষ রীতিমত জোয়ার-ভাটার মধ্যে বসবাস করছেন তারা। অনেকে পানিতে ডুবে থাকা বসত ঘর থেকে মুল্যবান জিনিসপত্র নৌকাযোগে অন্যত্র নেয়।

এছাড়া দাতিনাখালী, বুড়িগোয়ালীনি, দুর্গাবাটি, গাবুরা এবং গোলাখালীসহ কয়েকটি অংশের মানুষ পানিতে ভেসে থাকা বসত ঘর ছেড়ে রাস্তা আর উঁচু এলাকায় যাওয়ার চেষ্টা করছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের ৩০ কিলোমিটার বাঁধের পনেরটি স্থানে ভেঙে যায়। জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন মেরামতের চেষ্টা চলছে।

ঘূর্ণিঝড় আম্পানে সাতক্ষীরার খোলপেটুয়া নদীর কাশিমাড়ী ইউনিয়নের ঝাপালী অংশের পাউবোর বেড়িবাঁধ ভেঙে কাশিমাড়ীসহ পার্শ্ববর্তী কালিগঞ্জের কৃষ্ণনগর ইউনিয়নের অনেক গ্রাম, খালবিল, পথঘাট, ঘরবাড়ি ও মৎস্য ঘের প্লাবিত হয়। জোয়ারের পানিতে শুধু বাড়িঘর ধ্বসে পড়েনি, পাকা রাস্তা ভেঙে উপজেলা সদরে যাতায়াতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়।

সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার কাশিমাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুর রউফ জানান, খোলপেটুয়া নদীর বেড়িবাঁধ ভেঙে তার ইউনিয়নের খেজুরহাটি, ঝাপালি, জয়নগর ও কাশিমাড়িসহ ছয়টি গ্রাম পানিতে ডুবে আছে। উপকূলীয় বেড়িবাঁধ রক্ষায় এখন শেষ ভরসা জনগণ। দুর্যোগে যতবার বাঁধ ভেঙেছে, ততবারই স্থানীয় জনতা স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে সেই বাঁধ মেরামত করেছে। এবারও সুপার সাইক্লোন আম্পান তান্ডবেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।

কাশিমাড়ী ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুর রউফ বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ড একটি প্লান পাঠিয়ে সেটি পাশের অপেক্ষায় রয়েছে। অথচ আমরা পানির নিচে। যে কারণে পানি উন্নয়ন বোর্ডের অপেক্ষায় না থেকে আমরা স্বেচ্ছাশ্রমেই বাঁধ ইতোমধ্যে নির্মাণ করেছি। তিনি বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের গাফিলতির কারণে আমার ইউনিয়নের প্রায় দুই কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এখনো তারা প্লান পাশের অপেক্ষায় বসে আছেন।

গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জিএম মাসুদুল আলম বলেন, আমাদের বাঁচান। টেকসই বাঁধ ছাড়া আমাদের বাঁচার সুযোগ নেই। আমরা স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে আপাতত বাঁধ নির্মাণ করলেও জোয়ারের ধাক্কায় ভেঙে আবারো প্লাবিত হবে। বিশেষ করে গাবুরা ইউনিয়নের লেবুবুনিয়া পয়েন্টের অবস্থা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এখনই সেখানে কাজ করার প্রয়োজন। আমার ইউনিয়নের অধিকাংশ মানুষ এখনো পানিবন্দি।

সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ড-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী সুধাংশু সরকার বলেন, বেড়িবাঁধ নির্মাণ এখন আর শুধু মাত্র স্বেচ্ছাশ্রমই একমাত্র ভরসা, এটি বলার সুযোগ নেই। কারণ ইতোমধ্যে আমরা অনেক স্থানে ঠিকাদার নিয়োগের মাধ্যমে কাজ শুরু করেছি। এছাড়া মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত স্থানগুলোতে সেনাবাহিনী কাজ শুরু করেছে।

এদিকে পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও খুলনার কয়রা এলাকায় আম্পানে ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ সরেজমিন পরিদর্শনে এসে বলেন, স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণের জন্য ৯০০ কোটি টাকার দুটি ও এক হাজার ২০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প একনেকে অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। খুব শিগগির সেগুলো ছাড় করে উপকূলীয় এলাকায় টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণকাজ শুরু করা হবে। বেড়িবাঁধ সংস্কারকাজসহ প্রকল্পের কাজে সেনাবাহিনীকেও কাজে লাগানো হবে বলে জানান তিনি।

(ঢাকাটাইমস/২৯জুন/কেএম)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বাংলাদেশ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :