বিএনপি নেতাকর্মীদের পুলিশে দেওয়া নিয়ে নানা প্রশ্ন

তাওহিদুল ইসলাম, ঢাকা টাইমস
 | প্রকাশিত : ০৫ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৮:১৩

বিএনপির মহাসমাবেশ ঘিরে গত ২৮ অক্টোবরের সহিংসতার পর থেকে দলটির নেতাকর্মীদের মারধর করে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার অভিযোগ প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানা প্রশ্ন উঠেছে। আইনজীবী, মানবাধিকারকর্মীসহ রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের আলোচনায় এসেছে নির্বাচনকালীন সময়ে সব দলের সমান রাজনৈতিক অধিকারের বিষয়টিও।

গত ২০ নভেম্বর থেকে এ পর্যন্ত এ ধরনের অন্তত ১০টি ঘটনার বিষয়ে জানতে পেরেছে ঢাকা টাইমস। বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ধরনের ঘটনা রাজনৈতিক অধীকার ক্ষুন্ন করে। আর জাতীয় মানবাধিকার কমিশনও বলছে, ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন হয় এমন কোনো কর্মকাণ্ডই কমিশন সমর্থন করে না।’

অভিযোগ রয়েছে, গত ২৮ নভেম্বর রাতে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের দ্বারা শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হন ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ফজলুর রহমান খোকন। এরপর তাকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা জানান, মঙ্গলবার রাতে ফজলুর রহমান খোকন হাতিরঝিল এলাকার একটি দোকানে বন্ধুকে নিয়ে চা খাচ্ছিল। এ সময়ে ছাত্রলীগের স্থানীয় নেতা-কর্মীরা তাকে ধরে হাতিরঝিল থানা-পুলিশের কাছে সোপর্দ করে। এর আগে তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়েছে।

ফজলুর রহমান খোকন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করতে গিয়ে জনমানুষের আক্রশের শিকার হয়েছে বলে দাবি করেন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান।

ইনান ঢাকা টাইমসকে বলেন, অগ্নিসন্ত্রাস, ককটেলবাজী ও বোমাবাজী করে যারা মানুষ পুড়িয়ে মেরে ফেলে, তাদেরকে ধরে সাধারণ জনগণ বা শিক্ষার্থী সমাজ যদি পুলিশে দিয়ে থাকে, সেক্ষেত্রে তো আমাদের কিছু করণীয় নেই।’

ছাত্রলীগ কাউকে মারধর করে পুলিশে দেওয়ার অধিকার রাখে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে ইনান বলেন, ‘সন্ত্রাসীদের প্রতিহত করার সময় আত্মরক্ষার্থে অনেক সময় এ ধরনের ঘটনা ঘটে থাকে।’

ঢাকা মহানগর দক্ষিণের ৩৯ নং ওয়ার্ড বিএনপি সদস্য ইমতিয়াজ হাসান বুলবুল পুলিশ হেফাজতে মারা গেছেন বলে অভিযোগ করেছেন তার পরিবার। গত বৃহস্পতিবার ভোররাতে পুলিশ হেফাজতে সোহরাওয়ার্দী হৃদরোগ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি।

এ বিষয় বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক কমিটির সদস্য ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেন বলেন, গত ২২ অক্টোবর প্রথমে স্থানীয় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কর্মীরা বুলবুলের পকেটে জোর করে গাজা ঢুকিয়ে দিয়ে ওয়ারী থানার পুলিশকে দিয়ে আটক করায়। পরে তাকে সেদিন ছেড়ে দিলেও ২৪ অক্টোবর ওয়ারী কাজী আরিফ স্কুলর সামনে স্থানীয় আওয়ামী লীগের কর্মীরা মারধর করে আবারও পুলিশের কাছে তুলে দেয়। এরপর তাকে থানায় অমানবিক শারীরিক নির্যাতন করা হয়। এসময় পরিবারের সদস্যরা গেলেও তাকে দেখতে দেওয়া হয়নি।

ইশরাক হোসেন আরও বলেন, পরবর্তীতে বুলবুলের খোঁজে কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে একাধিকবার গেলেও তার হদিস পাননি।

তিনি বলেন, গত ২০ নভেম্বর পরিবার নিশ্চিত হয় বুলবুল কাশিমপুর কারাগারে আছেন। এরপর সেখানে গিয়েও বুলবুলের সঙ্গে দেখা করতে পারেননি পরিবারের সদস্যরা। ২৪ নভেম্বর বুকে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করেন বুলবুল, এক পর্যায়ে পড়ে গেলে বুলবুলকে নেওয়া হয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে। বৃহস্পতিবার তিনি মৃত্যুবরণ করলে পরিবারকে জানানো হয়। মৃত বুলবুলের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর না করে পুলিশ দাফন করে পুলিশ। এ অভিযোগের বিষয়ে ওয়ারী থানার অফিসার ইনচার্জ মোস্তাজিরুর রহমান ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘পুলিশ সেখানে যায়নি, ঢাহা মিথ্যা কথা। এরা গুজববাজ, পুলিশ নিয়ে গুজব ছড়াচ্ছে।’

এ ছাড়াও ফেনীর দাগনভূঞা, চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় ও নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের চৌমুহনীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের মারধর করে পুলিশে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে।

সাবেক বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক ঢাকা টাইমসকে বলেন, আইনে কাউকে মারধর করা ও হুমকি দেওয়ার অধিকার দেয়নি। কিন্তু আত্মরক্ষার অধিকার সবাই রাখে। তবে সাধারণত কেউ কাউকে মারতে পারে না। এটা সাধারণ আইন। তবে অপরাধ করলে পুলিশ তো অপরাধীকে ধরবেই।

তিনি বলেন, কেউ অপরাধ করলে তাকে পুলিশে দেওয়া দায়িত্ব। তবে হুমকি অবশ্যই দিতে পারে না।

বিএনপি নেতাকর্মীদের মারধর করে পুলিশে দেওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. কামাল উদ্দিন আহমেদ ঢাকা টাইমসকে বলেন, সহিংসতা মুক্ত অবস্থা সৃষ্টির জন্য আমরা সরকারকে বলেছি। করার জন্য। হোম মিনিস্টারের (স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) কাছে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিঠি লিখেছি। আইজিপিকে বলেছি, যাতে অন্যায়ভাবে কাউকে হয়রানি না করা হয়, কোনো সহিংসতা সৃষ্টি না করা হয়। এ ব্যাপারে সম্পূর্ণরূপে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে আমরা বলে দিয়েছি। যেকোনো ধরণের অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমরা। অন্যায়, অবিচারের মাধ্যমে কোনো কিছু করাকে আমরা সমর্থন করি না। নির্দিষ্ট বিষয়গুলো জানলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয় আরও স্পষ্ট করে বলা যেত।

বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা হামলার শিকার প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. দিল রওশন জিন্নাত আরা নাজনীন ঢাকা টাইমসকে বলেন, যদি নির্বাচন করতেই হয়, তাহলে সেখানে সেইরকম মাঠ তৈরি করতে হবে। যাতে সবাই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারে। সেই মাঠ তো মিসিং (নেই)। আমি যদি ঘরেই থাকতে না পারি, কথা বলতে না পারি তাহলে নির্বাচন তো দূরের কথা আমার তো কোনো অধিকারই থাকল না। গণতান্ত্রিক দেশে তো প্রথমে জনগণের অধিকার থাকতে হবে। সে রাজনৈতিক হোক আর সাধারণ মানুষ হোক সে কাজ করবে ,কথা বলবে, সম্মেলনে যাবে, মিছিল মিটিংয়ে যাবে, এসবের তো কিছুই নেই।

ড. দিল রওশন জিন্নাত আরা নাজনীন আরও বলেন, বিশেষ করে বিরোধীদলের উপর যে হামলাগুলো হচ্ছে, তাহলে নির্বাচনে কিভাবে যাবে? এতে তো নির্বাচনে যাওয়ার কোনো জাস্টিফিকেশনও নেই আর সম্ভববনাও নেই। গণতান্ত্রিক দেশে প্রত্যেকের অধিকার থাকা উচিত।

এ সম্পর্কে হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন অ্যাডভোকেট এলিনা খান ঢাকা টাইমসকে বলেন, আমরা সব সময় সব কাজে সংবিধানের কথা বলে যাচ্ছি। সেখানে কথা বলা, চলাফেরার স্বাধীনতা বা শান্তিপূর্ণভাবে সমাবেশ করার কথা বলা আছে। আজ একদল ক্ষমতায় কাল আবার অন্য দল ক্ষমতায়। এরকম ক্ষমতার পালাবদল হতেই থাকবে। এখন কথা হলো, বাংলাদেশে আইনের সুশাসন প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, সমাজের প্রত্যেকটা মানুষের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে যে পরিস্থিতি দরকার সেই বিষয়টা মাথায় রেখে সবাই সবকিছু করতে পারে শান্তিপূর্ণভাবে।

এলিনা খান বলেন, ২৮ অক্টোবরের আগে বা পরে এতো গায়েবি মামলা হয়েছে। যারা মারা গেছে তাদেরকেও মামলার আসামি করা হয়েছে। এসব করার কারণে যে গুরুত্বহীনতার মধ্যে মামলাগুলো পড়েছে, এটা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। কেউ যদি অন্যায় করে থাকে, তার সঠিক বিচার হোক। আগের হাজার হাজার মামলা পেন্ডিং আছে। এতো মামলা পেন্ডিং থাকতে দ্রুত অনেক মামলা শেষ হয়ে যাচ্ছে। এগুলো বৈষম্যহীনতার মধ্যে পড়ছে। আমি মনে করি যখন যে রাজনৈতিক দলের সরকার থাকুক না কেন, তাদের উচিত সংবিধানের কথা মান্য করার জন্য, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার জন্য জীবনের অধিকার, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করা জন্য যা যা দরকার সেগুলো করা উচিত।

হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, কেউ কাউকেই মারতে পারে না। মারামারি কখনই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আর পুলিশের সহায়তা করার জন্য অন্য মানুষ কেনো লাগবে? এতে তো আরেক সমস্যার সৃষ্টি হবে। যেখানে পুলিশ আছে সেখানে আরেক দল কাউকে মারধর করবে, যাকে মারধর করা হয় সে যে আসলেই অন্যায় করছে তার প্রমাণ কী? তাকে কে বিচার করছে? তাকে ধরে পুলিশে সোপর্দ করছে যে। এই ধরনের সহিংতায় সাধারণ মানুষও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।

এলিনা খান বলেন, এই সংস্কৃতির ফলে অনেক ভদ্র মানুষও এর ভিতর ঢুকে যাচ্ছে। কেউ রাস্তা থেকে হেঁটে যাচ্ছে তাকে সন্দেহ করে ধরে দিয়ে দেওয়া হলো! এটা তো ঠিক না। এতে প্রতিহিংসার রাজনীতি সৃষ্টি হয়, দেশের অশান্তি হয়। এ ধরনের রাজনীতিতে সুষ্ঠু সুন্দর জীবনের ক্ষেত্রে, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে, সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অন্তরায় হয়ে যায়।

(ঢাকাটাইমস/০৫ডিসেম্বর/টিআই/বিবি)

সংবাদটি শেয়ার করুন

রাজনীতি বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

রাজনীতি এর সর্বশেষ

এই বিভাগের সব খবর

শিরোনাম :