এক–এগারোর সময়ের বাহারুল আলমসহ দায়িত্বশীলরা গুরুত্বপূর্ণ পদে, নির্বাচন প্রেক্ষাপটে উদ্বেগ

সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা বাহারুল আলম বর্তমানে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি)। এক এগারোর গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত এই কর্মকর্তাকে নিয়ে নতুন করে বিতর্ক দেখা দেয় পিলখানা হত্যাকাণ্ড সংক্রান্ত তদন্তে নাম আসায়।
২০০৭–০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে বাহারুল আলম ছিলেন পুলিশের অন্যতম সংবেদনশীল ইউনিট স্পেশাল ব্রাঞ্চের প্রধান। সে সময় রাষ্ট্র পরিচালনায় সামরিক ও বেসামরিক কাঠামোর মধ্যে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় ছিল। পরবর্তী সময়ে ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি সংঘটিত পিলখানা বিডিআর বিদ্রোহের নামে সংঘটিত বর্বরতম হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় গঠিত জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশনের রিপোর্টে বাহারুল আলমের নাম উঠে আসে।
পিলখানা হত্যাকাণ্ডের বিচার ও তদন্তকে কেন্দ্র করে তার দায়িত্বকালীন ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তাকে অপসারণের দাবিতে একাধিকবার আন্দোলন হয়েছে। বিশেষ করে বিডিআর হত্যাযজ্ঞে বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য নাসিরুদ্দিন আহাম্মদ পিন্টু কারাগারে মৃত্যুর ঘটনায় রাজধানীতে একাধিকবার সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন করা হয়। আন্দোলনে বাহারুল আলমের পদত্যাগ দাবি করা হয় এবং তাকে ওই সময়ের নিরাপত্তা ব্যর্থতার জন্য দায়ী করা হয়।
বাহারুল আলম বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের ১৯৮৪ ব্যাচের কর্মকর্তা। এসবি প্রধানের দায়িত্ব পালনের পর তিনি পুলিশ সদর দপ্তরে গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত তিনি জাতিসংঘ সদর দপ্তরের শান্তিরক্ষা বিভাগে পুলিশ লিয়াজোঁ অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে আফগানিস্তানসহ ক্রোয়েশিয়া, সার্বিয়া, কসোভো ও সিয়েরা লিওনে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালন করেন।
আওয়ামী লীগ সরকার আমলে ২০২০ সালে অবসরে যান বাহারুল আলম। তবে ছাত্র–জনতার গণ–অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তাকে পুলিশের মহাপরিদর্শক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তার এই নিয়োগকে কেন্দ্র করে আবারও এক–এগারোর সময়কার প্রশাসনিক চরিত্র ও ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এক–এগারোর সময় রাষ্ট্র পরিচালনায় যুক্ত একাধিক ব্যক্তি বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছেন। সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও বর্তমান উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন, সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার কিংবা সাবেক পররাষ্ট্র সচিব মো. তৌহিদ হোসেনের মতো বাহারুল আলমও সেই সময়কার প্রশাসনিক ধারার প্রতিনিধি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষতা ও অতীত ভূমিকা নতুন করে পর্যালোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। পিলখানা হত্যাকাণ্ডের মতো স্পর্শকাতর ঘটনায় যাদের নাম উঠে এসেছে, তাদের বর্তমান দায়িত্ব জনআস্থার ওপর কী প্রভাব ফেলবে—সেই প্রশ্নও সামনে আসছে।
রাজনৈতিক দলগুলো বলছে, বিতর্কিত অতীতের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রাখা হলে নির্বাচন ও প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে সংশয় আরও বাড়তে পারে।
গত ৩০ নভেম্বর রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে তদন্ত কমিশন প্রতিবেদন জমা দেয়। পিলখানা হত্যাযজ্ঞে বিডিআর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদসহ ৫৮ জন সেনা সদস্য নৃশংসভাবে হত্যার শিকার হন।
তদন্ত প্রতিবেদনের কপি অনুযায়ী, ১৪৬ নম্বর পয়েন্টের 'গ' অংশে পাঁচজন পুলিশ কর্মকর্তার নাম রয়েছে। তারা হলো— তৎকালীন আইজিপি নূর মোহাম্মদ, তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার নাইম আহমেদ, তৎকালীন অতিরিক্ত আইজিপি (এসবি প্রধান) বাহারুল আলম, অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল কাহার আকন্দ এবং তার অধীনস্থ তদন্ত দল।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, তদন্ত চলাকালে তৎকালীন এসবি প্রধান বাহারুল আলম কমিশনকে অনুমাননির্ভর তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করেছেন এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিরোধী দলের কর্মীদের ফাঁসিয়েছেন।
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন









































