রাজধানীতে যানজট

অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ কেবল যানবাহন ব্যবস্থাপনা নয় নগর-দর্শনেরও প্রশ্ন

মো. আবদুল মান্নান
  প্রকাশিত : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৮:৫২
অ- অ+

রাজধানী ঢাকা আজ এক অদৃশ্য জটিলতার শহর। এখানে সকাল মানেই হর্নের শব্দ, বিকেল মানেই স্থবির রাস্তা, আর রাতও যেন ক্লান্ত যানবাহনের দীর্ঘশ্বাসে ভারী। দক্ষিণ এশিয়ার দ্রুত বর্ধনশীল মহানগরগুলোর মধ্যে অন্যতম এই শহরে জনসংখ্যার চাপ, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং পরিকল্পনার ঘাটতির কারণে যানজট এখন নিত্যদিনের অনিবার্য বাস্তবতা। নাগরিকের কর্মঘণ্টা, অর্থনীতি, পরিবেশ ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর এর প্রভাব গভীর।

এই প্রেক্ষাপটে অনেকের মতে, অটোরিকশার লাগামহীন বিস্তারই বর্তমান যানজটের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ঢাকার রাস্তায় যানজট নতুন নয়। কিন্তু গত এক দশকে এর প্রকৃতি ও মাত্রা বদলে গেছে। ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে মোটরসাইকেল, রাইড-শেয়ারিং যান, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও নানা ধরনের অননুমোদিত তিন-চাকার যানবাহন। সংকীর্ণ রাস্তা, অপরিকল্পিত পার্কিং, ফুটপাত দখল, নির্মাণকাজ এবং অপর্যাপ্ত গণপরিবহন- সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল।

তবে এই বহুমাত্রিক সমস্যার মধ্যে অটোরিকশা নিয়ে অভিযোগ এখন সবচেয়ে উচ্চকিত। অটোরিকশা একসময় ছিল সীমিতসংখ্যক এবং নির্দিষ্ট রুটভিত্তিক। কিন্তু বর্তমানে রাজধানীর অলিগলি থেকে প্রধান সড়ক- সবখানেই এদের অবাধ বিচরণ। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, একটি প্রধান সড়কে একই সঙ্গে বাস, ট্রাক, প্রাইভেট কার, মোটরসাইকেল এবং অসংখ্য অটোরিকশা সমান্তরালভাবে চলাচল করছে। অটোরিকশার গতি কম, হঠাৎ থেমে যাওয়া বা যাত্রী ওঠানামার প্রবণতা বেশি, আর চালকদের বড় অংশ ট্রাফিক আইন সম্পর্কে অজ্ঞ বা উদাসীন। ফলে যানপ্রবাহের ধারাবাহিকতা ভেঙে যায়।

অটোরিকশার জনপ্রিয়তার পেছনে বাস্তব কারণও আছে। ঢাকার অনেক এলাকায় পর্যাপ্ত বাস সার্ভিস নেই। লোকাল বাসে ভিড়, অনিরাপদ পরিবেশ, নির্দিষ্ট সময়সূচির অভাব- এসব কারণে সাধারণ মানুষ দ্রুত ও তুলনামূলক আরামদায়ক বিকল্প খোঁজে। অটোরিকশা সেই শূন্যস্থান পূরণ করেছে। বিশেষ করে নারী, শিক্ষার্থী ও বয়স্কদের জন্য স্বল্প দূরত্বে এটি সুবিধাজনক। কিন্তু সমস্যা হলো, এই খাতটি নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বিস্তৃত হয়েছে। নিবন্ধনবিহীন, রুট পারমিটবিহীন, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে নম্বরপ্লেটবিহীন যানবাহনও চলছে।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি দুর্বল হওয়ায় পরিস্থিতি ক্রমে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। রাজধানীতে যানবাহন নিবন্ধন ও নীতিনির্ধারণে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ দীর্ঘদিন ধরেই অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে নানা উদ্যোগের কথা বলেছে। কিন্তু বাস্তব প্রয়োগে ধারাবাহিকতা ও কঠোরতার অভাব পরিলক্ষিত হয়। একইভাবে সড়কে আইন প্রয়োগের দায়িত্বে থাকা ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ মাঝেমধ্যে অভিযান চালালেও তা স্থায়ী সমাধান আনতে পারেনি।

যানজট কেবল সময়ের অপচয় নয়; এটি অর্থনীতির ওপরও বিরাট বোঝা। কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়া মানে উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়া। পণ্যবাহী যানবাহন দেরিতে পৌঁছালে ব্যবসায়িক ক্ষতি হয়। জ্বালানির অপচয় বাড়ে, পরিবেশ দূষণ বৃদ্ধি পায়। স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ে- বিশেষ করে শিশু ও প্রবীণদের ক্ষেত্রে।

ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে যখন একটি অটোরিকশা প্রধান সড়কের মাঝখানে দাঁড়িয়ে যাত্রী তোলে বা নামায়, তখন তার পেছনে তৈরি হয় দীর্ঘ যানবাহনের সারি। একাধিক অটোরিকশা একইভাবে আচরণ করলে তা কয়েক মিনিটের মধ্যে বড় জটে রূপ নেয়। সিগন্যাল অমান্য, উল্টো পথে চলা, লেন শৃঙ্খলা না মানা- এসব প্রবণতা যানজটকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। অনেক নাগরিকের দাবি- রাজধানী থেকে অটোরিকশা সম্পূর্ণরূপে বিদায় করতে হবে। প্রশ্ন হলো, এটি কি বাস্তবসম্মত এবং টেকসই সমাধান? প্রথমত, অটোরিকশা হাজারো মানুষের জীবিকার সঙ্গে যুক্ত। চালক, মালিক, মেকানিক- একটি বড় অর্থনৈতিক চক্র এর ওপর নির্ভরশীল। হঠাৎ করে নিষিদ্ধ করা হলে সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। দ্বিতীয়ত, বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত না করে কোনো পরিবহন খাত বন্ধ করলে সাধারণ যাত্রী ভোগান্তিতে পড়বে।

ঢাকায় গণপরিবহনের মান এখনও সন্তোষজনক নয়। মেট্রোরেল ও বাস র্যাপিড ট্রানজিট প্রকল্প কিছুটা স্বস্তি দিলেও শহরের সব এলাকায় তা পৌঁছেনি। তাই অটোরিকশা সম্পূর্ণ বিদায় না দিয়ে, বরং নিয়ন্ত্রিত ও পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার দিকে নজর দেওয়া অধিক কার্যকর হতে পারে। অটোরিকশার সংখ্যা নির্দিষ্ট কোটা অনুযায়ী সীমিত করতে হবে। প্রতিটি যানবাহনের ডিজিটাল নিবন্ধন ও জিপিএস ট্র্যাকিং বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। নির্দিষ্ট রুট ছাড়া প্রধান সড়কে চলাচল নিষিদ্ধ করা যেতে পারে। অটোরিকশাকে মূল সড়কের পরিবর্তে মেট্রো স্টেশন, বাস টার্মিনাল বা আবাসিক এলাকার ভেতরে ফিডার সার্ভিস হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে প্রধান সড়কে চাপ কমবে। ট্রাফিক আইন অমান্য করলে তাৎক্ষণিক জরিমানা ও লাইসেন্স স্থগিতের ব্যবস্থা নিতে হবে। আইন প্রয়োগে ধারাবাহিকতা জরুরি।

রাজধানীর সড়ক ব্যবস্থাপনায় ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন-এর মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদার করতে হবে। ফুটপাত দখলমুক্ত করা, অবৈধ পার্কিং বন্ধ করা এবং রাস্তার নকশা আধুনিকায়ন জরুরি। বাস সার্ভিসের মান উন্নত না করলে মানুষ বিকল্প খুঁজবে, এটাই স্বাভাবিক। নির্দিষ্ট স্টপেজ, সময়সূচি, ই-টিকিটিং এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

বর্তমান সরকারের কাছে নাগরিকদের প্রত্যাশা অনেক। উন্নয়নমূলক নানা প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকার ইতোমধ্যে অবকাঠামোগত পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু যানজটের মতো দৈনন্দিন সংকট সমাধানে কেবল প্রকল্প নয়, প্রয়োজন কঠোর প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও জনসচেতনতা। জনগণও দায়িত্ব এড়াতে পারে না। ট্রাফিক আইন মানা, অপ্রয়োজনে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার কমানো, কারপুলিং উৎসাহিত করা- এসব সামাজিক আচরণ পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ।

রাজধানী ঢাকার যানজট আজ এক জটিল বাস্তবতা। এর জন্য এককভাবে কোনো একটি যানবাহনকে দায়ী করা সহজ, কিন্তু পূর্ণ সমাধান পেতে হলে প্রয়োজন সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি। অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার নিঃসন্দেহে সমস্যাকে তীব্র করেছে। তবে সমাধান হতে হবে বাস্তবসম্মত, মানবিক এবং দীর্ঘমেয়াদি। শহর কেবল ইট-পাথরের অবকাঠামো নয়; এটি মানুষের চলাচল, কাজ ও স্বপ্নের সমন্বিত ক্ষেত্র। সেই শহরকে সচল রাখতে হলে শৃঙ্খলা, পরিকল্পনা এবং রাজনৈতিক দৃঢ়তা—এই তিনের সমন্বয় অপরিহার্য।

অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটি তাই কেবল যানবাহন ব্যবস্থাপনার নয়; এটি নগর-দর্শনেরও প্রশ্ন। যদি আমরা সত্যিই একটি গতিশীল, বাসযোগ্য এবং আধুনিক ঢাকা চাই, তবে এখনই সময় কঠিন কিন্তু প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার। অন্যথায় যানজটের এই অচলাবস্থা আমাদের সম্ভাবনাময় রাজধানীকে ধীরে ধীরে স্থবিরতার নগরে পরিণত করবে।

লেখক: সংবাদকর্মী।

(ঢাকাটাইমস/২৬ফেব্রুয়ারি/মোআ)

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
সালমান শাহ হত্যায় ১২ লাখের চুক্তি, সাংবাদিক ইলিয়াসের সেই অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ফের আলোচনায়
ম্যানেজিং কমিটি কর্তৃক শিক্ষক নিয়োগের কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি: শিক্ষামন্ত্রী
ধানমন্ডিতে গাছ পড়ে দুমড়ে-মুচড়ে গেছে দুটি গাড়ি
১২ আগস্ট পূর্ণ সূর্যগ্রহণ, দেখা যাবে যেসব অঞ্চল থেকে
বিশেষ প্রতিবেদন তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা