তীব্র গরমে বাড়ছে হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি, সতর্ক করলেন বিশেষজ্ঞরা

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা টাইমস
  প্রকাশিত : ২৬ এপ্রিল ২০২৬, ১০:৫৫
অ- অ+

দেশজুড়ে চলমান তীব্র তাপপ্রবাহে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে উঠেছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছুঁয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দীর্ঘ সময় রোদে অবস্থান বা অতিরিক্ত পরিশ্রমে বাড়ছে হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি, যা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে বলে সতর্ক করছেন চিকিৎসকরা।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায়, শরীরের তাপমাত্রা ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি হলে এবং তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে হিট স্ট্রোক দেখা দেয়। এতে রক্তচাপ কমে যাওয়া, অচেতন হয়ে পড়া এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে।

মানবদেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাস। সাধারণত ঘাম ও রক্তনালির প্রসারণের মাধ্যমে শরীর অতিরিক্ত তাপ বের করে দেয়। কিন্তু প্রচণ্ড গরমে দীর্ঘ সময় থাকলে বা কায়িক পরিশ্রম করলে শরীরের এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়, ফলে হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি তৈরি হয়।

বিশেষজ্ঞরা জানান, রিকশাচালক, কৃষক ও শ্রমিকদের মতো কায়িক শ্রমে যুক্ত ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। এছাড়া শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রেও ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।

হিট স্ট্রোকের আগে কিছু উপসর্গ দেখা দেয়। যেমন—অতিরিক্ত তৃষ্ণা, মাথাব্যথা, বমিভাব, কথা বলতে কষ্ট হওয়া, ঝিমঝিম ভাব, ঘাম বন্ধ হয়ে যাওয়া, ত্বক লালচে ও শুষ্ক হয়ে যাওয়া, দ্রুত শ্বাসপ্রশ্বাস ও নাড়ির স্পন্দন বেড়ে যাওয়া। গুরুতর অবস্থায় খিঁচুনি, অস্বাভাবিক আচরণ ও অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণও দেখা দিতে পারে।

গরমে হিট স্ট্রোক এড়াতে হালকা ও ঢিলেঢালা পোশাক পরার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। সাদা বা হালকা রঙের সুতির কাপড় সবচেয়ে উপযোগী। প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না যাওয়া এবং ছায়াযুক্ত স্থানে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

বাইরে গেলে ছাতা, টুপি বা ক্যাপ ব্যবহার করতে হবে। পর্যাপ্ত পানি, স্যালাইন বা ফলের রস পান করা জরুরি। চা-কফি এবং বাইরের অস্বাস্থ্যকর খাবার এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

কেউ হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত হলে দ্রুত ঠান্ডা স্থানে নিয়ে যেতে হবে। ভেজা কাপড় দিয়ে শরীর মুছে দেওয়া, ফ্যান বা বাতাসের ব্যবস্থা করা এবং প্রচুর পানি বা খাবার স্যালাইন পান করানো জরুরি। শরীরের বগল, কাঁধ বা কুঁচকিতে বরফ প্রয়োগ করাও উপকারী।

চিকিৎসকদের মতে, দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া এবং হাসপাতালে নিয়ে সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে অধিকাংশ রোগীই সুস্থ হয়ে ওঠেন।

হাইপোথ্যালামাস গ্রন্থি আমাদের শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। যখন আমরা খুব গরম অনুভব করি, তখন হাইপোথ্যালামাস গ্ল্যান্ড ঘর্মগ্রন্থিকে সংকেত পাঠায় এবং ঘাম নিঃসৃত হয়। ঘামের মাধ্যমে শরীর শীতল হয়, সেই সঙ্গে ঘামের ফলে শরীর থেকে লবণ ও পানি বের হয়ে যায়। আর এই লবণ ও পানি শূন্যতা কমাতে এবং শরীর শীতল রাখে যেসব পানীয় ও খাবার সে সম্বন্ধে আলোচনা করা হলো।

হিট স্ট্রোক এবং সাইনাসের ব্যথা এড়াতে এবং শরীর ঠান্ডা রাখতে কিছু পানীয় বেশ কার্যকর। এতে শরীরের একাধিক সমস্যা কিন্তু দূর হয়ে যাবে। সেই সঙ্গে বাড়বে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা আর শরীর থাকবে ঠান্ডা। কেউ কেউ গরম থেকে তাৎক্ষণিক মুক্তি পেতে কোল্ড ড্রিংকসও রাখেন। কিন্তু এই পানীয়তে ক্ষতির সম্ভাবনাই বেশি থাকে। তাই এ সময় বাসায় তৈরি বিভিন্ন ড্রিংকের ভরসা রাখা উচিত।

লবণ-চিনির শরবত

অতিরিক্ত ঘামলে শরীর থেকে জল বেরিয়ে যায়। তাই এই সময়ে বেশি করে পানি পান করার পরামর্শ দিচ্ছেন সকলেই। হাতের কাছে ঘোল, ছাঁচ কিংবা লস্যি না থাকলে চট করে ক্লান্তি কাটাতে ঘরোয়া নুন-চিনির শরবত দারুণ কাজ করে। লবণ হল সোডিয়াম ক্লোরাইড। চিনির মধ্যে রয়েছে গ্লুকোজ় এবং ফ্রুক্টোজ়। এই দুই উপাদান শরীরে থেকে বেরিয়ে যাওয়া খনিজগুলির সমতা ফেরাতে পারে। চিকিৎসকদের মতে, শারীরিক কোনও সমস্যা না থাকলে ঘরোয়া এই পানীয় খাওয়াই যায়। কিন্তু উচ্চ রক্তচাপ এবং ডায়াবিটিস থাকলে চিকিৎসকের পরমর্শ ছাড়া নুন-চিনির শরবত কেন, ওরাল রিহাইড্রেশন সলিউশন (ওআরএস), ইলেক্ট্রল— কোনওটাই খাওয়া চলে না। যতই কষ্ট হোক, সে ক্ষেত্রে শুধু পানির উপরেই ভরসা রাখতে হবে।

লেবুর শরবত

লেবুর শরবত হলো গরমের সময়ে অন্যতম পরিচিত প্রাকৃতিক পানীয়। ১০০ গ্রাম লেমনেডে ২৯ ক্যালোরি, ১.১ গ্রাম প্রোটিন, ২.৫ গ্রাম চিনি, ২.৮ গ্রাম ফাইবার এবং ৯.৩ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট রয়েছে। প্রচণ্ড গরমে লেবুর শরবত পান করলে শরীর সতেজ এবং আরো বেশি কর্মদ্যোমী হয়ে উঠে। এক গ্লাস লেবুর শরবত গরমে শরীরের পানি স্বল্পতা দূর করে আমাদের এনে দেবে প্রশান্তি। লেবুতে থাকা ভিটামিন ‘সি’ এপিনেফ্রিন হরমোনকে উদ্দীপ্ত করে, যা নার্ভ স্টিমুলেশনে সাহায্য করে।

বেলের শরবত

অতিরিক্ত ঘামের সঙ্গে বেরিয়ে যাওয়া লবণ শরীরকে আরও ক্লান্ত করে দেয়। এই সময় কিন্তু বেলের শরবত কাজে আসতে পারে। কারণ, বেলের মধ্যে রয়েছে রাইবোফ্ল্যাবিন এবং ভিটামিন বি, যা ঘামলেও শরীরে শক্তির অভাব হতে দেয় না। এ ছাড়াও এর মধ্যে রয়েছে আয়রন, সোডিয়াম, পটাশিয়ামের যৌগ যা হজম শক্তিকে উন্নত করে এবং প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে তোলে।

ডাবের পানি

গরমের সময়ে ডাবের পানি হতে পারে আপনার জন্য উপযুক্ত পানীয়। এক কাপ ডাবের পানিতে থাকে ৬০ ক্যালোরি, ১৫ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট, ৮ গ্রাম চিনি এবং পর্যাপ্ত পটাসিয়াম। ডাবের পানিতে ৯৪% পানি থাকে। ডাবের পানি মিনারেলের ভালো উৎস। ঘামের মাধ্যমে শরীরে যে পানিশূন্যতা তৈরি হয়, তা রোধ করে শরীরের আর্দ্রতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। স্ট্রেস কমাতে সাহায্য করে। ডাবের পানি উচ্চ পটাসিয়ামযুক্ত হওয়ায় প্রেসার কমাতে সাহায্য করে। ডায়াবেটিক রোগীরা নিশ্চিন্তে ডাবের পানি পান করতে পারেন। কারণ ডাবের পানি ব্লাড সুগার বাড়ায় না।

আঙুরের রস

আঙুরের রসের সাথে মধু আর বরফ মিশিয়ে খেলেও গরমে আরাম পাবেন। পাবেন শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি। আবার শরীরকে ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতা দূর করতেও এই পানীয়ের জুড়ি মেলা ভার।

তেঁতুল-গুড়ের শরবত

তেঁতুলে উচ্চ পটাসিয়াম থাকে, যা শরীরে পানি ধরে রাখতে সাহায্য করে। সেই সঙ্গে ম্যাগনেসিয়াম ও আয়রনের বেশ ভালো উৎস। ম্যাগনেসিয়াম নার্ভ সিমুলেশনে সাহায্য করে এবং গুড় আয়রনের ঘাটতি পূরণ করে।

টক দইয়ের মাঠা

পানিশূন্যতা রোধের পাশাপাশি এটি হজমশক্তি বৃদ্ধিতে সাহায্য করে, পেট ফাঁপা কমায়।

আম পান্না ড্রিংক

গরমে আম পাওয়া যায়। শরীর ঠান্ডা রাখার জন্য কাঁচা আম অনেক উপকারী। এ জন্য প্রথমে কাঁচা আম সিদ্ধ করে নিন। তাতে এবার পরিমাণমত লবণ, পানি, চিনি ও মসলা দিয়ে জাল করলেই হয়ে যাবে আম পান্না। চাইলে কয়েকটি পুদিনা পাতার কুঁচিও মেশাতে পারেন।

পুদিনা-লেবুর ড্রিংক

পুদিনা পাতার সঙ্গে লেবুর রস মিশিয়ে সহজেই তৈরি করা যায় এই উপকরণটি। সঙ্গে বিট লবণ, গোল মরিচ এবং চিনিও মেশানো যেতে পারে। চাইলে কয়েক টুকরো বরফও দিতে পারেন।

তেঁতুল ড্রিংক

তেঁতুলে রয়েছে প্রচুর মাত্রায় খনিজ, ইলেকট্রোলাইটস এবং ভিটামিন, যা শরীরের তাপমাত্রা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অল্প পরিমাণ তেঁতুল পানি ১০ মিনিট ফুটিয়ে ঠান্ডা করে পান করুন।

টক দই-আমের শরবত

আম ও টক দই শরীর শীতলকরণের পাশাপাশি ইনসোমনিয়া কমাতে সাহায্য করে। এই গরমে যাঁদের ঘুমের সমস্যা আছে, তাঁরা খেতে পারেন।

তেঁতুল-গুড়ের মাখানো সালাদ

এটি অত্যন্ত সুস্বাদু ও উপাদেয় খাবার, যা গ্রামে খুব প্রচলিত গরমের দিনে। যেসব কৃষক এই গরমে মাঠে কাজ করেন, তাঁরা এই খাবার দুপুরের দিকে খেয়ে শরীর শীতল করেন। চাইলে আপনিও গরমে খাবারটি খেয়ে শরীর শীতল করতে পারেন।

শসা-পুদিনাপাতার সালাদ

পুদিনাপাতার নিজস্ব কুলিং প্রপার্টিজ আছে। শসায় প্রচুর পরিমাণে পানি আছে। এই গরমে দুটি মিক্স করে খেতে পারেন।

অ্যালোভেরা ড্রিংক

গরম থেকে বাঁচতে এই প্রাকৃতিক উপাদান দারুণ সাহায্য করে। প্রতিদিন এক গ্লাস অ্যালোভেরা জুস পান করলে শরীর গরম সহ্য করার জন্য তৈরি হয়ে যায়।

সফট ড্রিঙ্কসকে না বলুন

সফট অথবা হার্ড ড্রিঙ্কস নেওয়া থেকে বিরত থাকুন। ড্রিঙ্কস শরীরের পানিকে নিরূদিত করে যা শরীরে পানি স্বল্পতা তৈরী করে। এছাড়াও ঘন ঘন পানি পিপাসা পায় এবং গলা শুখিয়ে আসে। তাই গরমে সাময়িক তৃষ্ণা মেটাতে অবশ্যই ড্রিঙ্কস না।

তাপপ্রবাহের এই সময়ে সতর্কতা ও সচেতনতাই পারে প্রাণঘাতী ঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে।

(ঢাকাটাইমস/২৬ এপ্রিল/আরজেড)

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
অলিগার্কদের ধ্বংস করা বিএনপি সরকারের অন্যতম লক্ষ্য: মির্জা ফখরুল
শহীদ ওয়াসিমের কবর জিয়ারত করেছেন প্রধানমন্ত্রী
যে কারণে ব্রাজিলের প্রথম ম্যাচে খেলবেন না নেইমার
ভারতের নতুন সেনাপ্রধান হচ্ছেন ধীরাজ শেঠ
বিশেষ প্রতিবেদন তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা