হাদি হত্যার ‘মাস্টারমাইন্ড’ নিয়ে বিতর্ক, মমতা ব্যানার্জির বক্তব্যে তোলপাড়

ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান বিন হাদি হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা ব্যানার্জির সাম্প্রতিক মন্তব্যকে কেন্দ্র করে। তার বক্তব্যের পর বাংলাদেশ ও ভারত—দুই দেশেই রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তীব্র হয়েছে।
চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত আসামিদের প্রোটেকশন দিতে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকারের বিশেষ হস্তক্ষেপ ছিল-তার এমন মন্তব্য মুহূর্তেই হইচই পড়ে যায়। এমনকি ‘কাকে দিয়ে খুন করিয়েছিলেন? কার কার নাম বেরিয়েছিল? সবটাই জানি...’ এমন বক্তব্য আগুনে ঘি ঢেলে দেওয়ার অবস্থা হয়।
কলকাতার একটি জনসভায় মমতা ব্যানার্জি দাবি করেন, বাংলাদেশ-সংশ্লিষ্ট একটি হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্তদের বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা ছিল এবং বিষয়টি নিয়ে তিনি দীর্ঘদিন নীরব ছিলেন। তিনি ইঙ্গিতপূর্ণভাবে বলেন, কিছু নাম ও তথ্য তার জানা থাকলেও পরিস্থিতির সংবেদনশীলতার কারণে তা প্রকাশ করেননি। এই মন্তব্যকে ঘিরে নতুন করে আলোচনায় আসে হাদি হত্যাকাণ্ডের পেছনের পরিকল্পনাকারী বা ‘মাস্টারমাইন্ড’ প্রসঙ্গ।
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিষয়টি কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা চলছে এবং অভিযুক্তদের দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তদন্তকারী সংস্থা সিআইডি জানিয়েছে, মামলার তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে এবং আন্তর্জাতিক আইনি সহায়তার মাধ্যমে বিদেশে অবস্থানরত সন্দেহভাজনদের ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলছে।
সিআইডি আরও জানায়, তদন্তে অর্থায়ন ও অস্ত্র সরবরাহ-সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া গেছে এবং একাধিক ব্যক্তি গ্রেপ্তার ও জবানবন্দি দিয়েছেন। তবে পুরো ঘটনা রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিকভাবে সংবেদনশীল হওয়ায় এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়নি।
এদিকে মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষ থেকে ভিন্ন ভিন্ন দাবি ও পাল্টা অভিযোগ উঠেছে। একটি রাজনৈতিক সংগঠনের নেতারা অভিযোগ করেছেন, হত্যাকাণ্ডে আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত রয়েছে। অন্যদিকে তদন্তকারীরা বলছেন, বিষয়টি এখনো বিচারাধীন এবং সব তথ্য যাচাই করা হচ্ছে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে রাজধানীর একটি এলাকায় প্রকাশ্যে গুলিতে ওসমান হাদি নিহত হন। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এই হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনা ও আলোচনা চলছে।
প্রসঙ্গত, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার মাত্র ২০ ঘণ্টার মাথায় চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর দুপুরে রাজধানীর পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডে প্রকাশ্য জুমার নামাজ শেষে ফেরার পথে একটি মোটরসাইকেলে আসা দুই আরোহী হাদিকে লক্ষ্য করে খুব কাছ থেকে নিখুঁত নিশানায় মাথায় গুলি করে। পরে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর তার মৃত্যু হয়। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের রামপুরা এলাকার অন্যতম সমন্বয়ক এবং পরবর্তী সময়ে ভারতীয় আধিপত্যবাদবিরোধী আন্দোলনের এক প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর ছিলেন এই তরুণ। ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়া এবং অল্প সময়ে তুমুল জনপ্রিয়তা অর্জন মহলবিশেষের জন্য তীব্র অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
দীর্ঘদিন চাপা পড়ে থাকা ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড নিয়ে মমতার বক্তব্যের পর জনমনে তৈরি হয়েছে তীব্র কৌতূহল। সবার মনে প্রধান প্রশ্ন-হাদি হত্যার আসল মাস্টারমাইন্ড বা পরিকল্পনাকারী কে? কারা জড়িত ছিল এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে? তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হাদি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে করা হচ্ছে। তবে আন্তর্জাতিক ও রাজনৈতিক স্পর্শকাতরের কারণে এ নিয়ে পুলিশ এখনই চূড়ান্ত কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। তারা জানিয়েছেন, হত্যাকাণ্ডটি কোনো সাধারণ অপরাধ ছিল না। এটি ছিল একটি সুদূরপ্রসারী পূর্বপরিকল্পিত খুন। হত্যাকাণ্ডের কিছুদিন আগে বাংলাদেশে একটি গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই বৈঠকে হাদিসহ আরও তিনজনকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। আন্তর্জাতিক একটি গোয়েন্দা সংস্থার গুপ্তচর এ বিষয়ে সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছিলেন, ‘আপনারা সাবধান হয়ে যান।’ ভারতে যখন এই হত্যাকাণ্ডের আসামিরা ধরা পড়ে, তখন তাদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও বাংলাদেশের তদন্ত টিমের কাছে অনেক তথ্যই গোপন করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সাধারণ মানুষ এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে অনেক সচেতন। যখন একটি প্রতিবেশী দেশের সদ্য সাবেক মুখ্যমন্ত্রী সরাসরি এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সেই দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জড়িত থাকার বা ধামাচাপা দেওয়ার ইঙ্গিত দেন, তখন তা ভারতের ‘প্রচ্ছন্ন ছত্রছায়ায়’ এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে কি না, সেই সন্দেহকে আরও ঘনীভূত করে। হাদি মূলত ভারতবিরোধী রাজনীতির অন্যতম অগ্রনায়ক ছিলেন। ফলে এ হত্যাকাণ্ডের পেছনে কোনো গভীর রাজনৈতিক যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। মমতা ব্যানার্জির বক্তব্যের পর এখন দুই দেশের জনগণই চাচ্ছে, হাদি হত্যার পেছনের প্রকৃত সত্য এবং এর আসল মাস্টারমাইন্ডের নাম অবিলম্বে জনসমক্ষে আসুক।
এদিকে ভারতের জাতীয় তদন্ত সংস্থা এনআইএ ইতোমধ্যে ভারতে গ্রেফতার মূল শুটার ফয়সাল করিম মাসুদ ও তার সহযোগী আলমগীর শেখকে দিল্লি নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। তাদের সাহায্যকারী ফিলিপ সাংমাকেও পশ্চিমবঙ্গ থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানা গেছে। অপরদিকে মমতা ব্যানার্জির বক্তব্যের রেশ কাটতে না কাটতেই ২ জুন রাতে যুক্তরাজ্যের বার্মিংহামে সহকারী হাইকমিশনে দ্বিতীয় সচিব পদে কর্মরত (চুক্তিভিত্তিক) হাদির বড় ভাই শরীফ ওমর বিন হাদি ফেসবুকে দুটি বিস্ফোরক পোস্ট দেন। একটি পোস্টে তিনি বলেন, ‘শহীদ ওসমান হাদির খুনের সঙ্গে ইন্টেরিম (অন্তর্বর্তী) সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টা এবং বিএনপি সরকারের কয়েকজন এমপি-মন্ত্রী সরাসরি জড়িত।’ অপর পোস্টে বলেন, ‘শহীদ ওসমান হাদি হত্যার প্রেক্ষাপট তৈরিতে আমিরে জামায়াতের একজন ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) জড়িত। হাদিকে ঢাকা-৮ থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য ব্যাপক প্রেশার দিয়েছে আমাদের।’ একজন সরকারি কর্মকর্তা হয়েও কেন তিনি এই ঝুঁকি নিলেন, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। তবে এর পেছনে হাদির পরিবারের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবং মামলার চার্জশিট ও অধিকতর তদন্ত প্রতিবেদন বারবার (১২ বার) পেছানোর হতাশা কাজ করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সিআইডি সূত্র জানায়, তদন্তে ২১৮ কোটি টাকার একটি স্বাক্ষরিত চেকের হদিস পাওয়া গেছে। ওই চেক হত্যাকাণ্ডের পেছনে অর্থায়নের দিকে ইঙ্গিত করে। চট্টগ্রামের অস্ত্র বিক্রেতা মাজেদুল এবং সাভারের হেলালকে রিমান্ডে নিয়ে জানা গেছে, হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত পিস্তলটি সীমান্ত পার হয়ে আসার পর পাঁচবার হাতবদল হয়ে মূল শুটার ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা ফয়সাল করিম মাসুদের হাতে পৌঁছায়। সূত্রমতে, এই সুনির্দিষ্ট হত্যাকাণ্ডের মিশন সফল করতেই সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ফয়সালকে বিশেষ তদবিরে কারাগার থেকে জামিনে বের করা হয়েছিল। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) পক্ষ থেকে ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুলসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করা হয়। তবে মামলার বাদী (ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব) এই তদন্তে অসন্তোষ প্রকাশ করে আদালতে নারাজি আবেদন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে আদালত চার্জশিটটি গ্রহণ না করে মামলাটির নিখুঁত ও অধিকতর তদন্তের জন্য সিআইডিকে নির্দেশ দেন।
বর্তমানে মামলাটি সিআইডি তদন্ত করছে। এ মামলায় এখন পর্যন্ত ভারতে তিনজন এবং বাংলাদেশে ১১ জন গ্রেফতার হয়েছেন। বাংলাদেশে গ্রেফতার ১১ জনের মধ্যে নয়জনই আদালতে নিজেদের দোষ স্বীকার করে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। সবশেষ ১২ জানুয়ারি মাদারীপুরের রুবেলকে কেরানীগঞ্জ থেকে গ্রেফতারের পর ২২ জানুয়ারি জবানবন্দি দেন। তার জবানবন্দিতে আওয়ামী লীগ নেতা জাহাঙ্গীর কবির নানকের পিএস বিপ্লব এবং আদাবর থানা ছাত্রলীগের সেক্রেটারি কামরুজ্জামান রুবেলের নাম উঠে আসে। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র সরবরাহকারী মাজেদুল তার জবানবন্দিতে জানান, ঢাকা দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার কাছে তিনি অস্ত্রটি বিক্রি করেছিলেন
বর্তমানে তদন্ত ও রাজনৈতিক বক্তব্য—দুই দিক থেকেই ঘটনাটি নতুন মোড় নিয়েছে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, চূড়ান্ত প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত ‘মাস্টারমাইন্ড’ প্রসঙ্গে নিশ্চিত মন্তব্য করা সম্ভব নয়।
(ঢাকাটাইমস/৪ জুন/আরজেড)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন












































