একজন উপাচার্যের খোঁজে এবং অন্যান্য প্রসঙ্গ

আহমেদ ইমতিয়াজ
  প্রকাশিত : ০৯ মার্চ ২০১৭, ০৮:০৯
অ- অ+

আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মানুষের জন্য ‘জব স্যাটিসফ্যাকশন’ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেই বিবেচনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা পৃথিবীর যে কোনো দেশেই অতিমর্যাদা ও সম্মানের। কিন্তু বর্তমানে শিক্ষকরা এমন কিছু কর্ম করছে (মেধাবীদের যথাযথ মূল্যায়ন না করায় আনপ্রোডাকটিভ কর্ম করতে পরোক্ষভাবে বাধ্য করা হচ্ছে) যাতে কি না অনেক সময়ই তাঁদের মর্যাদা ধুলোয় মিশে যায়।

বিদেশে আমাদের অনেক শিক্ষককে অর্থের লোভে আত্মসম্মান ও লজ্জাবোধ ছুঁড়ে ফেলে নিম্ন শ্রেণির কাজ ও জীবিকা গ্রহণে কুরুচি দেখে অনেকবার স্তম্ভিত হয়েছি। বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি মর্তুজা নূর ‘পিএইচডি করতে গিয়ে ফিরছেন না শিক্ষকরা’ শিরোনামে একটি খবর ছেপেছে (২২/২/২০১৭)। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে ১৯৭২ সাল থেকে এ পর্যন্ত মোট ৭৪ জন শিক্ষক বিদেশে পিএইচডি করতে গিয়ে আর ফিরে আসেনি। বিশ্ববিদ্যালয় গৃহীত বেতন-ভাতা ১০% সুদসহ ফেরত দেয়ার কথা থাকলেও ১৬ জনের নিকট থেকে এখনও অর্থ ফেরৎ পাওয়া যায়নি।

অধ্যাপক অরুণ কুমার বসাক স্যারের বরাত দিয়ে মূলত মেধাবীদের যথাযথ মূল্যায়ন না থাকায় ‘ব্রেইন ড্রেইন’ এর বিষয়টি তুলে ধরে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা যারা বিদেশে ডিগ্রি করতে গিয়ে আর ফেরেননি তাঁদের নিয়ে বিশিষ্ট কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ-এর ‘তাঁরা ফেরেন নাই’ লেখাটিও একই ধরনের ছিল যা আমার পড়ার সুযোগ হয়েছে (প্রথম আলো, ৪/১০/২০১১)।

জনাব আবুল মকসুদের ভাষায়, ‘তাঁদের (শিক্ষকদের) কোনো রেস্তোরাঁয় রান্নাঘরে বসে তরকারি কুটতে, পেঁয়াজের খোসা ছাড়াতে, রাস্তায় গাড়ি মুছতে, কোনো বদমেজাজি বুড়ির বাগানের ঘাস সাফ করতে, কোনো সাহেবের ঘোড়ার ঘাস কাটতে, সপ্তায় পাঁচ বাড়িতে পাঁচ দিন গিয়ে কাপড় ইস্ত্রি করতে, কোনো নিঃসঙ্গ বুড়ির ৪/৫টি কুকুরকে সকালে-বিকেলে পায়খানা করিয়ে হাওয়া খাইয়ে আনতে, কোনো ডিপার্টমেন্ট স্টোরে লরি থেকে মাল নামিয়ে ট্রলিতে করে ঠেলতে অরুচি নেই।’

এই যদি সম্মানিত শিক্ষকদের রুচি হয় তবে জাতীয় রুচি ও মর্যাদার ঝান্ডা উড়াবে কে? যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ায় গর্ববোধ করে, নিজেকে অভিজাত সমাজের সদস্য ফলায় অথচ গভীর রাতে অন্ধকারে হকার সেজে বাড়ি বাড়ি পত্রিকা দিতে, কুলি হয়ে ট্রাক লোড/আনলোড করতে, কোনো জিমে/স্টেডিয়ামে ক্লিনিংয়ের কাজ বা চেয়ার-টেবিল গোছগাছ করার মতো কাজ পেতে লবিং করে তাদের পারিবারিক বড়াই একেবারেই বেমানান।

উর্দিতে শতেরটি বোতাম থাকলে বুঝি উনি চৌকিদার। কিন্তু শিক্ষক চেনার উপায় কী? সকাল দুপুর সন্ধ্যা আর আলো আঁধারের কর্ম-আয়ে যে শিক্ষক (সব শিক্ষক নয়) গিরগিটির মত রঙ বদলায় তাঁদের শ্রেণিচরিত্র বুঝবো কেমনে? অনেকেই বলতে পারেন কোনো কাজই ছোট না। আমিও তাদের সঙ্গে একমত। একজন অধ্যাপক বা প্রকৌশলী তার নিজের গাড়ি নিজে চালানোতে মোটেও দোষ নাই কিন্তু তাঁদের দ্বারা ট্যাক্সি চালানো এক ধরনের অপচয়। অপকর্মও। অবসরে নিজের বাগানের ঘাস নিজে পরিষ্কার করে ফুলগাছে পানি দেওয়া গেলেও অন্যের বাগানে মালির চাকরি করা যায় না।

যে শিক্ষক/কর্মকর্তা বিদেশে ওসব কাজ করেন তারা কিন্তু নিজ দেশে গেলে তা গোপন করবেন। যে কর্মের কথা অন্যকে বলা যায় না তাই এক ধরনের অপকর্ম। এই লুকোচুরির মধ্যেই বিচ্যুতি ও অবিচারের গন্ধ। মানুষের কর্মক্ষমতা যদি সীমাহীন না হয়ে থাকে তাহলে আয়মুখ্য অতিরিক্ত কর্মযজ্ঞের ক্ষতিকর প্রভাব প্রধান দায়িত্ব-কর্তব্যকে কোনো না কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবেই। তাই শিক্ষক বা অন্যান্য দায়িত্বশীল পদে কর্মরত (দেশে বা বিদেশে) মানুষের আত্মসম্মান ও লজ্জাবোধ যথার্থভাবে জাগ্রত হবে সেটাই দেশবাসীর কাম্য।

২. আগামী ২০ মার্চ ২০১৭ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. মিজানউদ্দীনের দায়িত্বকাল শেষ হবে। কেমন চালিয়েছেন মিজানউদ্দীন, তা নিয়ে বেশ আলোচনা-সমালোচনা হতে পারে। অন্যান্য ভিসির মতো কিছুটা সফলতা ও খানিকটা ব্যর্থতা নিয়েই শেষ করতে যাচ্ছেন তাঁর মেয়াদকাল। সফলতা-ব্যর্থতার সমালোচনা আবার সরকার দলীয়দের কাছে এক রকম এবং অদলীয় আমজনতার স্তরে থাকা সাধারণ শিক্ষকের কাছে অন্য রকম। সুবিধাবাদী ও অসুবিধাবাদীদের কাছেও বিশ্লেষণটা ভিন্নতর। আর ভিন্ন পথের লোকদের তো ভিন্ন মত থাকবেই।

একাডেমিক বিষয়ে একটি জটিল কাজের জন্য শিক্ষকদের মধ্যে আমজনতার কাতারে থাকা সত্ত্বেও বর্তমান উপাচার্য মহোদয়ের সঙ্গে একবার সাক্ষাৎ পাওয়ার সুযোগ জুটেছিল। তাতে মানুষ হিসেবে ওনাকে অতটা প্রতিহিংসাপরায়ন মনে হয়নি, যতটা কানকথায় রটেছে। বরং বিভাগীয় সভায় আমার বিষয়টিকে যতটা জটিল করা হয়েছিল তার চেয়ে অনেক সহজতর সমাধান তিনি দিয়েছিলেন। এই হিসেবে আমার কাছে তিনি কিছুটা অতিরিক্ত ধন্যবাদ ও সম্মান সব সময়ই পাবেন।

যাই হোক, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগের যে বিধিসম্মত পদ্ধতি তা আমরা বহুদিন দেখিনি। শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই প্রক্রিয়াটি জীবন্ত জীবাশ্মের মতো কোনোমতে টিকে আছে। যারা নিয়মগুলো সৃষ্টি করেছেন তারাই ওগুলোকে পঠিত সংবাদপত্রের মতো অকেজো কাগজের মর্যাদা দিয়ে জাদুঘরে স্থান পাবার মতো বিষয়ে পরিণত করে বিকল্প পদ্ধতিটি বিশেষ স্বার্থে চালু রেখেছেন।

ওসব নিয়ে খুব বেশি কথা বললে অনেকে প্রতœতত্ত্ববিদও ভাবতে পারেন। আসলে এখন সময়ই চলছে অনির্বাচনের। অনির্বাচিত ফটোকপি উপাচার্যের শাসন ও সংস্কৃতিতে আমরা অনেকটা অভ্যস্ত। বিষয়টি খানিকটা তরতাজা গাছপাকা সিঁদুরে আম রেখে কৃত্রিমভাবে তৈরি স্যাকারিন ও রাসায়নিক ফ্লেভার সমৃদ্ধ প্রিজারভেটিভ মিশ্রিত ম্যাংগো জুস খাওয়ার মতো। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে যে উপাচার্য মহোদয় আসবেন তিনিও ‘টেকনোক্র্যাট ভঙ্গিমায়’ ফটোকপির বলেই হবেন। তবে স্বাধীনতার মাসে উপচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীসহ সাধারণ জনগণের স্বপ্ন তথা অধিকারের স্বাধীনতা টিকে থাকবে নাকি গণতান্ত্রিক দেশের গণতান্ত্রিক সরকারের রাষ্ট্রপতি (আচার্য) কর্তৃক বঙ্গভবনের ক্ষমতার স্বাধীনতা টিকে থাকবে, সেটা দেখার জন্য আরো সপ্তাহ কয়েক বেঁচে থাকার আকাক্সক্ষা রইল।

অনির্বাচিত উপাচার্য স্বভাবতই শিক্ষকদের মতামত হরণ করে শিক্ষা-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে শ্রদ্ধা ও সম্মানের স্থান থেকে সরিয়ে দলবাজদের গারদ বানানোর কৌশল বৈ অন্যথা নয়। কর্মচারী নিয়োগকে কেন্দ্র করে গত কিছুদিন যাবৎ রাবির সব ফটকে তালা লাগিয়ে বাস বন্ধ করে বিশ্ববিদ্যালয়কে নিজেদের প্রতিষ্ঠান বানানোর যে মহড়া দেখেছি, এসব তারই বহিঃপ্রকাশ। কারণ, অনির্বাচিত উপাচার্য মানেই এমন লোকের আবির্ভাব, সরকার তথা দলের কথা শুনলেই যাদের মেরুদ- ৪৫ ডিগ্রি কোণে সামনের দিকে বেঁকে যায়।

নেতাদের দেখলেই যাদের লেজ নাড়ানো শুরু হয়ে যায়। ভিন্নমতের সহকর্মী ও সমর্থকদের দমিয়ে রাখার জন্যও প্রতিভাসম্পন্ন ওই রকম নির্ভীক ব্যক্তির দরকার হয়। সঙ্গত কারণেই এমন বিশেষ উপায়ে খুঁজে পাওয়া ব্যক্তি মানেই অ-একাডেমিক, অগবেষক এমনকি প্রশাসনিক কাজে অদক্ষ বাঙালির আবির্ভাব।

৩. সততা, যোগ্যতা, মূল্যবোধ ইত্যাদি গুণ দিনে দিনে অদামি অপদার্থ বিষয়ের দিকে বিবর্তিত হচ্ছে। গুণবাচক অধিকাংশ শব্দের প্রায়োগিক অর্থ ক্রমশ বিলুপ্তির পর্যায়ে। ‘সত্যদা একজন ভালো মানুষ’-এর অর্থ তিনি একজন অকেজো অপদার্থ মানুষ! যদি তাই না হবে তবে সরকার ফ্যাক্সপত্রের মাধ্যমে যে উপাচার্য নিয়োগ দেয়, কেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সফল ও সার্থক শিক্ষক-গবেষকদের তালিকায় তাঁর নাম থাকে না। কেন বর্বর সমাজের মতো বুদ্ধির জোরকে গলা ও গায়ের জোরের কাছে বারবার হার মানতে দেখতে হয়?

কেন মনন ও সৃষ্টিশীলতাকে দমিয়ে লবিংকে অগ্রাধিকার করা হয়? সরকার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের রাজনীতিমুক্ত থাকার পরামর্শ দেয়, অথচ উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রে ক্লাব মাতানো দুর্বল প্রোফাইলের স্বভাবে অশিক্ষক কর্মে অগবেষক শ্রেণির লবিংপ্রিয় অপ্রশাসনিক অধ্যাপকদের প্রাধান্য দেখা যায়। ফলে কর্মদক্ষতা, নিষ্ঠা, সততা, যোগ্যতা, মূল্যবোধ ইত্যাদি অন্ধকারে গুমরে মরে। অফুরন্ত কালো টাকার মালিক, মানুষের সীমাহীন ক্ষতি করার সামর্থ্যবান ব্যক্তি, অসীম প্রতাপশালী এবং ভোগবিলাসীরাই জনগণের কাছে সফল ও সার্থক হোমোসেপিয়ান হিসেবে পরিগণিত হওয়ার জন্য যা কিছু দরকার রাষ্ট্র তাই করছে।

এত কিছুর পরেও আমরা নিরাশ হবো না। নিভে যাব না। সরকার আমাদের অনেক আশার বাণী শুনাচ্ছে, বাস্তবায়নযোগ্য স্বপ্ন দেখাচ্ছে। আমরা সরকারের প্রতি ভরসা রাখতে চাই। হোক অনির্বাচিত তবুও সরকার একজন সুযোগ্য শিক্ষককে উপাচার্য নিয়োগ দেবে যাঁর গ্রহণযোগ্যতা আছে। একাডেমিক ও প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের উভয় কাজকর্মের মধ্যে নিষ্ঠা বজায় রেখে তা করার মতো দক্ষতা আছে। নীতিবান ও নিবেদিতপ্রাণ মানুষ হিসেবে শ্রদ্ধেয়, একাডেমিশিয়ান হিসেবে প্রাজ্ঞ, গবেষক হিসেবে বিখ্যাত, শিক্ষাঙ্গনের প্রশাসক হিসেবে পরিক্ষিত।

উপাচার্য আর প্রধান নির্বাচন কমিশনার-সিইসির বিষয় দুটি সম্পূর্ণ ভিন্নতর। সিইসির ব্যাপারটা যতটা না শ্রদ্ধার, তার চেয়ে বেশি বিশ্বাস ও আস্থার। কিন্তু একজন উপাচার্যকে হতে হয় প্রথমত সম্মান ও শ্রদ্ধার, অতঃপর বিশ্বাস ও আস্থার। শিক্ষার্থীরা যখন দেখবে তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বোচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত ব্যক্তি একজন সৎ মানুষ, ভালো শিক্ষক, খ্যাতিমান গবেষক, বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের প্রতিনিধি এবং পান্ডিত্বসম্পন্ন, তখন অমন ব্যক্তি হওয়ার স্বপ্ন পূরণের জন্য তারা তাদের শিক্ষকের পদাংক অনুসরণ করবে বৈকি।

পিএইচডি ডিগ্রি ছাড়া একজন শিক্ষক কীভাবে উপাচার্য হন তা মাথায় আসে না। আমার জানামতে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের বর্তমান চেয়ারম্যান সাহেবের পিএইচডি ডিগ্রি নাই (তথ্যটি অসত্য হলে দুঃখিত)। রাষ্ট্রের যে সীমানায় উন্নত দেশের বিশ্বখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সাথে পিএইচডি ও পোস্ট পিএইচডি করা উপাচার্যের প্রাচুর্য সেখানে পিএইচডিহীন ব্যক্তিকে তাদের কর্তা বানানোর প্রথাটি নিশ্চয়ই কোনো অপ্রাতিষ্ঠানিক বিবেচনায় করা হয়ে থাকে।

এভাবে উপাচার্য নিয়োগের মাধ্যমে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের এগিয়ে চলার মিশন অপূর্ণই রয়ে যায়। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বর্তমান চিত্র তারই জীবাশ্ম। হ্যাঁ, বলতে পারেন সত্যেন বোসের তো পিএইচডি ছিল না। ডিগ্রির প্রয়োজন যদি না-ই থাকবে তবে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু, ড. কুদরাত-এ খুদা, আচার্য্য প্রফুল্ল রায় প্রমুখের বিদেশি ডিগ্রি কি নিতান্তই শখ-তামাশা ছিল?

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষকতার জন্য বিশ্বব্যাপী পিএইচডি ডিগ্রির যে আবশ্যকতা তা কি শুধুই অপচাহিদা? যাই হোক, রাজনৈতিক বিবেচনায় এভাবে উপাচার্য নিয়োগ করা হয় বলেই ওনাকে পাড়ার নেতার ইশারায় চলতে হয়, ভিসির সাথে সাক্ষাৎ করতে একজন অধ্যাপক কয়েক সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হলেও ওয়ার্ড কমিশনাররা কোনো পূর্বানুমতি ছাড়াই বীরদর্পে আসা-যাওয়া করে, শিক্ষক নিয়োগে মেধা ও সৃজনশীলতার পরিবর্তে দলীয় প্রার্থীকে প্রাধান্য দেওয়া হয়।

পুলিশ, বিজিবি বা আর্মিতে তাদের ঊর্ধ্বতনকে সম্বোধন করার আনুষ্ঠানিক শব্দচয়ন বা ভাষা আছে। বিসিএস কর্মকর্তারাও তাঁর জ্যেষ্ঠাকে নির্দিষ্ট শব্দ প্রয়োগে উল্লেখ কওে করে, অথচ সর্বোচ্চ শিক্ষিত ও পদাধিকারী একজন অধ্যাপক/শিক্ষককে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের কেরানি বা কর্মচারীরা ভাই/চাচা বলে সম্বোধন করে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, টিভি, মোবাইল ফোন কোম্পানি, ব্যাংক-বিমা, হাসপাতাল ও বাস মালিকরা রমরমা ব্যবসা নিয়ে তরতর করে এগিয়ে চলছে, অথচ দেশ ও জনগণের সম্পদ গরিব মেধাবী ছাত্রদের আশ্রয় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ক্ষমতাসীনদের দাপটে ধ্বংসপ্রায়।

৪. বিদেশ বিভুঁইয়ে নিজেকে, নিজের দেশকে এমনকি আমাদের আচার-আচরণকে অন্যের সঙ্গে তুলনা করে আমাদের হীনতা, দীনতা, নষ্টামি, ভ্রষ্টামি তথা সীমাহীন অবক্ষয়-অধঃপতন ধরা পড়েছে। সবুজ রঙ এর পাসপোর্টটি প্রায়শই অসহনীয় বিড়ম্বনা ও গ্লানির কারণ হয়েছে। সভ্য সমাজে পদে পদে নিজেকে অসভ্য-বর্বর সমাজের উপাদান মনে হয়েছে। সেই অসহনীয় উপেক্ষা থেকে মনের গহিনে বারবার রঙ বদলানোর স্বপ্ন জন্ম নিয়েছে। সেই স্বপ্নে স্বেচ্ছাচারিতা ছিল না, বরং স্বাধীনতা ছিল। প্রতিটি মানুষ/জীব তার নিরাপত্তার জন্য স্বাচ্ছন্দ্যের পরিবেশে যেতে চায়।

তাতে কোনো অন্যায়ও হয়তো হতো না। না ফেরার বিপক্ষে রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা ছিল না, আইনও নাই। বরং আছে শাসকশ্রেণির সীমাহীন অজ্ঞতা, অদূরদর্শিতা আর ব্যর্থতা। যে মানুষ বিদেশে অত্যন্ত দক্ষতা ও বিচক্ষণতার সাথে কাজ করতে পারে সে দেশে ফিরে অচল অকেজো হয়ে যায়।

এটা চলার দোষ? নাকি চালকের দোষ! তবুও দেশকে উন্নতির শিখরে পৌঁছানোর কাক্সিক্ষত স্বপ্ন নিয়েই অনেক শিক্ষক বিদেশে উচ্চ বেতনের অফার এবং নিরাপদ জীবন-যাপনের সুযোগ মাড়িয়ে স্বদেশে ফিরেছেন। কিন্তু সেই কাক্সিক্ষত স্বপ্ন পূরণের জন্য আরো বহুকাল অপেক্ষায় থাকতে হবে আমাদের।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
দেশের অর্থনীতি গভীর চাপে: নাহিদ ইসলাম
শ্রেষ্ঠ কৃষক পুরস্কার' চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে: স্থানীয় সরকার মন্ত্রী
নবাব সিরাজউদ্দৌলা স্বাধীনতা পরিষদের নতুন কমিটি গঠন
নতুন বাজেট বাস্তবায়ন করে মানুষের ভাগ্য বদলাতে চাই: প্রধানমন্ত্রী
বিশেষ প্রতিবেদন তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা