ঠকে শিখছেন ভোক্তারা, অধিদপ্তর এখন গতিশীল

জহির রায়হান, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ১৭ জুলাই ২০১৭, ১৫:৫৪ | প্রকাশিত : ১৭ জুলাই ২০১৭, ০৮:১৭
প্রতীকী ছবি

চলতি বছরের ঘটনা। হামিদ আহমেদ ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার একটি খাবার দোকান থেকে এক প্লেট বিরিয়ানি খান। বিল দিতে গিয়ে মেলায় টানানো মূল্য তালিকা থেকে বেশি দাম রাখা হচ্ছে। তিনি ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে অভিযোগ করেন। তা প্রমাণিত হলে সেই প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়। যার থেকে ২৫ শতাংশ পান হামিদ। বাকিটা জমা হয় রাষ্ট্রীয় কোষাগারে।

পণ্যের মানে, দামে, মেয়াদে ঠকা' এসব ক্ষেত্রে ক্রেতারা আর চুপ করে বসে থাকছেন না। চট করে তারা অভিযোগ ঠুকে দিচ্ছেন জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে। এই দপ্তরে রক্ষিত তথ্যমতে, গত সাত বছরে (২০১০ থেকে ২০১৬) এখানে ২৫৩৩টি অভিযোগ জমা পড়েছে। অথচ চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে অভিযোগ এসেছে ৪৯৯৬টি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভোক্তারা সচেতন হওয়ায় অভিযোগ বাড়ছে। প্রতারক ব্যবসায়ীকে যে জরিমানা করা হয়, তার ২৫ শতাংশ ভোক্তা পায় বলে অনেকে এক্ষেত্রে উৎসাহিত হয়ে অভিযোগ করছে। কোনো ব্যবসায়ী ভোক্তাকে ঠকালে শুধু শাস্তিই পাবেন না, বরং ভোক্তাও অভিযোগ করে আর্থিকভাবে লাভবান হবেন, এমন আইনের কারণেই এটা সম্ভব হয়েছে। এখন পর্যন্ত আদায় করা জরিমানা থেকে ২২ লাখ ২৩ হাজার ৬৩৭ টাকা অভিযোগকারী ভোক্তারা পেয়েছেন।

তথ্যমতে, ২০০৯ সালে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন প্রণীত হয়। ২০১০ সালের ৬ এপ্রিল বাজার তদারকির মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে মাঠ পর্যায়ে আইনটির বাস্তবায়ন শুরু করে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। তারা ২৯ জুন ২০১৭ পর্যন্ত ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন মতে দোষী সাব্যস্ত করে ২৯ হাজার ৫৬২টি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ২০ কোটি ৪৭ লাখ ৩৫ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করেছে তারা। ২০০৯ থেকে ২০১৭ সালের জুন পর্যন্ত অভিযোগ পাওয়া গেছে সাত হাজার ৫৫৯টি। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ৬৯৮৯টি, তদন্তাধীন আছে ৫৭০টি।

ব্যবসায়ী রাফায়েত রোমান রাজধানী ঢাকার হাতিরপুলের একটি রেস্তোরাঁয় খাবার খেতে গিয়ে দেখলেন এক বোতল কোমল পানীয়র প্রকৃত দাম ১৫ টাকা। অথচ আদায় করা হচ্ছে ২৫ টাকা। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে রেস্তোরাঁ কর্তৃপক্ষ তাকে বলে এখানে এটাই হয়। পরে তিনি মূল্য-রসিদ নিয়ে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে অভিযোগ করেন। শুনানি শেষে তার জয় হয়। এ বিষয়ে রাফায়েত রোমান ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘ভোক্তারা সচেতন হলে অন্যায়, প্রতারণা অনেক কমে যাবে। এটা সব ক্ষেত্রেই। আমি অভিযোগ করেছি। কারণ ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর আমার অধিকার আদায়ের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।’

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (তদন্ত) মাসুম আরিফিন ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘আসলে ভোক্তারা এখন অনেক সচেতন যার কারণে অভিযোগের সংখ্যা দিনদিন বাড়ছে। ভোক্তাদের অধিকার সচেতনতা বিষয়ে প্রতিনিয়ত মোবাইলে ম্যাসেজ, পত্রিকায় বিজ্ঞাপনসহ অনেক প্রচারণা চালাচ্ছি। আমরা বাণিজ্য মেলায় ভোক্তাদের কথা বিবেচনা করে স্টল নিয়েছিলাম, যেন তারা প্রতারিত হলে সেখানে অভিযোগ জানাতে পারে।’

এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘এখন প্রতি বছরে শতভাগ অভিযোগ নিষ্পত্তি হয়। যেভাবে অভিযোগ আসছে তাতে সামনে হয়তো শতভাগ অভিযোগ নিষ্পত্তি করা নাও যেতে পারে। তবে আমরা দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তি করার চেষ্টা করি। যে কোনো ভুক্তভোগী অভিযোগ করতে পারেন। আমরা দু পক্ষকেই চিঠি দিয়ে শুনানির দিন ধার্য করি। তাদের বক্তব্য শুনে দোষীর ব্যাপারে ব্যবস্থা নেই।’

কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট হুমায়ুন করির ভুঁইয়া ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘এই যে আভিযোগ বাড়ছে, ভোক্তারা সচেতন হয়েছেÑ এটাই তার প্রমাণ। ভোক্তাদের সচেতন করতে ক্যাব নিরলসভাবে কাজ করছে। ভোক্তারা যত সচেতন হবে, তত অন্যায় কম হবে।’

যে কারণে অভিযোগ

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর থেকে জানা যায়, শুরু থেকে ২৯ জুন ২০১৭ পর্যন্ত মোড়কের গায়ে সংশ্লিষ্ট পণ্যের খুচরা বিক্রয় মূল্য, উৎপাদনের তারিখ, মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখ ইত্যাদি লেখা না থাকা, পণ্য ও সেবা মূল্যের তালিকা প্রদর্শন না করা, নির্ধারিত মূল্যের অধিক মূল্য দাবি করার কারণে ১১৪৯৪ প্রতিষ্ঠানকে ৫৯৯৩৫৯৫০ টাকা জরিমানা করা হয়।

ভেজাল পণ্য বা ওষুধ বিক্রয়, ক্ষতিকারক রাসায়নিক দ্রব্য মিশ্রিত পণ্য বিক্রয়, অবৈধ প্রক্রিয়ায় পণ্য উৎপাদন বা প্রক্রিয়াকরণ, মিথ্যা বিজ্ঞাপন দিয়ে ক্রেতাতে প্রতারিত করা, প্রতিশ্রুত পণ্য বা সেবা যথাযথভাবে বিক্রয় বা সরবরাহ না করা। এতে ১১৭৫৬ প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয় ১১০৩৯৯৩০০ টাকা।

ওজনে, পরিমাপে, দৈর্ঘ্য পরিমাপক ফিতা বা অন্য কিছুতে কারচুপি করার কারণে ১৫৬৭ প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয় ৫৪৩৩১০০ টাকা।

পণ্যের নকল প্রস্তুত বা উৎপাদন, মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বা ওষুধ বিক্রয় করা, সেবাগ্রহীতার জীবন বা নিরাপত্তা বিপন্নকারী কাজ করা, অবহেলার কারণে সেবাগ্রহীতার অর্থ, স্বাস্থ্য ইত্যাদির হানি করার কারণে ৫০৫৯ প্রতিষ্ঠানকে ২৮৯৬৭০৫০ ঢাকা জরিমানা করা হয়েছে। যেখানে একই প্রতিষ্ঠান ও দোকানকেও একাধিকবার জরিমানা আদায় করা হয়েছে।


যেভাবে অভিযোগ করবেন

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরেরে পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কোনো ভোক্তা বা অভিযোগকারী তার পূর্ণাঙ্গ নাম, পিতা ও মাতার নাম, ঠিকানা, ফোন, ফ্যাক্স ও ই-মেইল নম্বর (যদি থাকে) এবং পেশা উল্লেখ করে কারণ উদ্ভব হওয়ার ত্রিশ দিনের মধ্যে ভোক্তা অধিকারবিরোধী কার্য সম্পর্কে কোনো পণ্যের উৎপাদনকারী, প্রস্তুতকারী, সরবরাহকারী বা পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতার বিরুদ্ধে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে ই-মেইল, ফ্যাক্স বা অন্য কোনো উপায়ে লিখিতভাবে অভিযোগ দায়ের করতে পারবেন। দায়েরকৃত আমলযোগ্য তদন্তে প্রমাণিত ও জরিমানা আরোপ করা হলে আদায়কৃত জরিমানার ২৫ শতাংশ তাৎক্ষণিকভাবে অভিযোগকারীকে প্রদান করা হবে।

পণ্যের মোড়ক ব্যবহার না করা হলে ৩৭ ধারায় এক বছর কারাদন্ড বা অনধিক পঞ্চাশ হাজার টাকা অর্থদ- বা উভয় দ-। মূল্যের তালিকা প্রদর্শন না করা হলে ৩৮ ধারায় এক বছর কারাদ- বা অনধিক পঞ্চাশ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দ-। এছাড়া আরও অনেক ধারা রয়েছে।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯ এর অধীন লিখিত অভিযোগ ও নিষ্পত্তির বিবরণী নিচে দেওয়া হলো:

২০১০ সালে অভিযোগ সংখ্যা ৭৩টি, ২০১১ সালে অভিযোগ সংখ্যা ৫টি, ২০১২ সালে অভিযোগ সংখ্যা ৬৯টি, ২০১৩ সালে অভিযোগ সংখ্যা ৩২টি, ২০১৪ সালে অভিযোগ সংখ্যা ৫৩৭টি, ২০১৫ সালে অভিযোগ সংখ্যা ২২৫টি, ২০১৬ সালে অভিযোগ সংখ্যা ১৬২২টি, ২০১৭ সালে (জুন পর্যন্ত) অভিযোগ সংখ্যা ৪৯৯৬টি।

অভিযোগ ও জরিমানা

# ২০১০ থেকে ২০১৬ সাল তথা গত সাত বছরে অধিদপ্তরে অভিযোগ এসেছে ২৫৩৩টি।

# চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে আসা অভিযোগ সংখ্যা ৪৯৯৬টি

# প্রতিষ্ঠা থেকে এখন পর্যন্ত অভিযোগ নিষ্পত্তি হয়েছে ৬৯৮৯টি। তদন্তে ৫৭০টি

# প্রতিষ্ঠা থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত শাস্তি পাওয়া প্রতিষ্ঠান ২৯ হাজার ৫৬২টি

# ২০১০ সাল থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত জরিমানা আদায় ২০ কোটি ৪৭ লাখ ৩৫ হাজার টাকা

# অভিযোগকারীরা জরিমানা থেকে পেয়েছে ২২ লাখ ২৩ হাজার ৬৩৭ টাকা

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের ফোন ০১৭৭৭৭৫৪৬৬৮, ই- মেইল: [email protected], [email protected], [email protected]

([email protected]/ডব্লিউবি)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত