সরকারি চাকরিতে আগ্রহ বাড়ার যত কারণ

মহিউদ্দিন মাহী, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ২০ এপ্রিল ২০১৮, ১০:১৭ | প্রকাশিত : ২০ এপ্রিল ২০১৮, ০৮:১০

সরকারি চাকরির চাহিদা সব সময় দেশে ছিল। কিন্তু ইদানীং এই চাহিদা বেড়েছে বগুহুণ। বিশেষ করে ২০১৫ সালে সরকারি চাকরিতে বেতন এক লাফে দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ার পর শিক্ষার্থীদের মধ্যে সরকারি চাকরির প্রতি ঝোঁক আরও বেড়েছে।

দুই দশক আগেও বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে সরকারি চাকরির জন্য অত হাপিত্যেশ দেখা যায়নি। কিন্তু বিশেষ করে তিন বছর ধরে ক্লাসের পড়া বাদ দিয়ে তৃতীয় বর্ষ থেকেই চাকরির নিয়োগ পরীক্ষার জন্য গ্রন্থাগারে ঢুকতে সকাল থেকেই লাইন ধরছে শিক্ষার্থীরা।

এতদিন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সরকারি চাকরি এড়িয়ে চললেও ইদানীং তারাও আসছে এই দিকে। বিসিএস পরীক্ষায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষার্থী অংশ নিচ্ছে।

সম্প্রতি সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীরা যেভাবে মাঠে নেমেছে, সাম্প্রতিককালে কোনো দাবিতে এত বেশি মানুষের পথে নামার ঘটনা দেখা যায়নি। এরপরই আলোচনায় আসে কেন শিক্ষার্থীরা এত উদগ্রীব হয়ে গেছে।

শিক্ষার্থীরা যে আন্দোলন করেছ, সেখানে মূলত বেশি উঠে এসেছে বিসিএসসহ প্রথম শ্রেণির চাকরির বিষয়টি। এই চাকরিগুলোর মর্যাদা এবং ক্ষমতা যেমন বেশি, তেমনি বেতন ভাতাও আকর্ষণীয় এবং ভবিষ্যও উজ্জ্বল।

প্রথম শ্রেণির সরকারি চাকরিতে যোগ দিলে শুরুতেই এখন ৩৫ থেকে ৩৮ হাজার টাকা মিলছে। এর পাশাপাশি প্রতি বছর পাঁচ শতাংশ হারে বেতন বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা বৃদ্ধি, পদোন্নতির সুনির্দিষ্ট নীতিমালা, চাকরির নিরাপত্তা, পর্যাপ্ত ছুটি, পরিবহন ও আবাসন সুবিধা, সন্তানদেরকে স্কুলে ভর্তির ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার, অবসরকালীন সুবিধার পাশাপাশি সামাজিক মর্যাদাও শিক্ষার্থীদেরকে সরকারি চাকরির দিকে ধাবিত করছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ এবং গবেষকরা।

প্রথম শ্রেণির পাশাপাশি দ্বিতীয়, তৃতীয় এবং চতুর্থ শ্রেণির চাকরিতেও এখন বেতন কাঠামো আকর্ষণীয়। এই পদগুলোতে যারা যোগ দেন, তাদের সমান শিক্ষাগত এবং অন্যান্য যোগ্যতা নিয়ে বেসরকারি চাকরিতে এসব সুযোগ সুবিধা অনেক কম। সেখানে সুনির্দিষ্ট কাঠামো না থাকা, পদোন্নতির জন্য কাজের চেয়ে নিয়োগকর্তার সুনজরে পড়ার বিষয়ও থাকে।

এর বাইরেও বেশ কিছু বিষয় রয়েছে। যেমন মাতৃত্বকালীন ছুটি বেশিরভাগ বেসরকারি চাকুরেদের জন্য চার মাস হলেও সরকারি চাকরিজীবীরা এই ছুটি পান ছয় মাসের। নৈমিত্তিক ছুটি সরকারি চাকুরেরা ইচ্ছা অনুযায়ী কাটাতে পারলেও বেসরকারি চাকুরেরা সে সুবিধা পান না অনেক ক্ষেত্রেই। অসুস্থতাজনিত ছুটির ক্ষেত্রেও বৈষম্য রয়েছে। আবার সরকারি চাকুরেদের অর্জিত ছুটি জমলে এর বিনিময়ে টাকার জন্য দুশ্চিন্তা করতে হয় না, কিন্তু বেসরকারি চাকরির অনেক ক্ষেত্রেই এসব নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ফয়সাল আকবর। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতোকত্তোর করেছেন। এখন বিসিএস পরীক্ষা দিচ্ছেন।

শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে বিসিএস ক্যাডার হতে চাইছেন, জানতে চাইলে ফয়সাল বলেন, ‘পরিবারের মানসিকতা হলো যে সরকারি চাকরি করতে হবে, ক্ষমতা থাকতে হবে, বিয়ে করার জন্য এই চাকরির গ্রহণযোগ্যতা বেশি। এছাড়া মর্যাদা, বেতন কাঠামো এবং জব সিকিউরিটি সবকিছু মিলিয়েই আমাকে বিসিএস বেশ আকর্ষণ করছে।’

এরকম আরো অনেক উদাহরণ এখন দেখা যাচ্ছে, যারা অন্য চাকরি ছেড়ে সরকারি চাকরিতে যোগ দিচ্ছেন। সরকারি চাকরির জন্যে হন্যে হয়ে ছুটছেন।

নিউটন দাস। বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের পুলিশ ক্যাডারের কর্মকর্তা। বর্তমানে পুলিশ একাডেমি সারদায় প্রশিক্ষণে আছেন। কেন তিনি এই চাকরি বেছে নিলেন।

ঢাকাটাইমসকে নিউটন বলেন, ‘সরকারি চাকরির নিরাপত্তা, অবসরের পর পেনশন ও গ্রাচুইটি সুবিধা এবং সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা অনেক বেশি।’

জানতে চাইলে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার ঢাকাটাইমসকে বলেন, শিক্ষার্থীদের প্রথম পছন্দ বিদেশে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ। এরপর দ্বিতীয় পছন্দ হচ্ছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। তৃতীয় পছন্দ হচ্ছে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস)।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘সরকারি চাকরি বেতন কাঠামো একটা ব্যাপার আছে। বিশেষ করে ২০১৫ সালের পে স্কেলের পর এই চাকরি আরও দাবি হয়ে উঠেছে। এসব কারণেই সরকারি চাকরির দিকে তরুণ না ঝুঁকছে।’

‘আবার সরকারি চাকরিতে আগ্রহের সবচেয়ে বড় কারণ চাকরির নিশ্চয়তা। এটা বেসরকারি খাতের চাকরিতে নেই। কারণ বেসরকারি খাতে সহজেই চাকরিচ্যুত করা যায়। কিন্তু সরকারি চাকরি সহজে যায় না।’

এই শিক্ষা গবেষক বলেন, সামজিক স্বীকৃতিও একটা বড় কারণ। এছাড়া রয়েছে ক্ষমতা ব্যবহারের চর্চা। একজন সরকারি কর্মকর্তা ক্ষমতা চর্চা করতে পারেন। কিন্তু বেসরকারি খাতে একজন সর্বোচ্চপদধারী ব্যক্তিও ক্ষমতা চর্চা করতে পারেন না।’

ড. জিন্নাহ বলেন, ‘সরকারি চাকরিতে সময় দেয়ার নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা আছে। কিন্তু বেসরকারি খাতে সেটা নেই। এসব মিলিয়ে তরুণদের প্রথম পছন্দ থাকে সরকারি চাকরির দিকে।’

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এম এম আকাশ বলেন, ‘এর পেছনে সরকারি চাকরিতে বেতন বাড়ানো একটি বড় কারণ। পাশাপাশি বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ কম থাকায় চাকরি তৈরি হচ্ছে না এবং উদ্যোক্তা হবার ঝুঁকিও অনেকে নিচ্ছেন না।’

‘পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ হিসেবেও দেখা গেছে, উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বেড়ে গেছে। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ হচ্ছে না এবং চাকরির সুযোগ কম। ফলে সরকারেরই যতটুকু বিনিয়োগ সেজন্য সেখানে একটা ঝোঁক বেশি।’

অধ্যাপক আকাশ মনে করেন, ‘সরকারি চাকরির প্রতি এতটা আগ্রহ বেসরকারি খাতের একটি অনভিপ্রেত ব্যর্থতারও ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। বেসরকারি বিনিয়োগ না বাড়লে এই ধারা অব্যাহত থাকবে বলে তিনি মনে করছেন।’

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশের বেসরকারি খাত এখনও সার্বিকভাবে কর্মীবান্ধব হয়ে উঠেনি। ব্যাংকিং খাতের কর্মীদের আইনি সুরক্ষা এবং অধিকারের বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংক দেখে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই এই সুরক্ষা অন্যদের ক্ষেত্রে নেই।

বেসরকারি খাতে গত দুই দশকে আইনি অধিকারের দিক থেকে কিছুটা হলেও উন্নতি হয়েছে পোশাক খাতের শ্রমিকদের। এই খাতে বিদেশি ক্রেতা সংস্থার পাশাপাশি সরকারি নজরদারি থাকায় শ্রমিকরা আগের চেয়ে কিছুটা হলেও বেশি আইনি সুরক্ষা পাচ্ছে।

নূন্যতম বেতন কাঠামো, যখন তখন ছাঁটাই ঠেকাতে আইনি সুরক্ষা, বেতন বৃদ্ধির সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকায় এই খাতে মালিকপক্ষ যা খুশি করতে পারে না।

 (ঢাকাটাইমস/২০এপ্রিল/এমএম/ডব্লিউবি/জেবি)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত