ভাষাসৈনিক নাসির উদ্দিন ভূঁইয়া

একুশে ফেব্রুয়ারি হত্যার প্রতিবাদে ট্রেন আটকে রাখি

মোরশেদুল জাহির
| আপডেট : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২২:৩০ | প্রকাশিত : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১৮:৪৯

বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সবচেয়ে আলোড়ন তোলা ঘটনা ছিল শহরের অদূরে পাঘাচং স্টেশনে রেললাইন অবরোধ ও ট্রেন আটক। ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ছাত্রহত্যার পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি সকাল থেকে পাঁচ দিন বাহাদুরাবাদ মেইল ট্রেনটি আটকে রাখে গ্রামের কিছু কিশোর-তরুণ। এতে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট এবং  চট্টগ্রাম ও সিলেটের সঙ্গে ময়মনসিংহসহ পুরো উত্তরবঙ্গের ট্রেন চলাচল। বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার এমন আন্দোলনের একজন সৈনিক সদর উপজেলার চান্দপুর গ্রামের নাসির উদ্দিন ভূঁইয়া। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধও করেন তিনি। পেশাজীবনে শিক্ষকতা করে কাটিয়েছেন। তাই নাসির মাস্টার নামে বেশি পরিচিত তিনি। ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি পড়তেন নবম শ্রেণিতে। তার কাছে ওই আন্দোলনের কথা শুনেছেন মোরশেদুল জাহির

ভাষা আন্দোলনের কথা বলুন। কী স্লোগান দিতেন তখন?

আমি তখন নিয়াজ মোহাম্মদ হাইস্কুলের ছাত্র। নবম শ্রেণিতে পড়ি। আল মাহমুদ তখন একই শ্রেণিতে পড়তেন। ওই বয়সেই পার্টি করতেন- কমিউনিস্ট। শহর থেকে আমাদের বাড়ি ছয় কিলোমিটার দূরে। তখন যাতায়াত অত সহজ ছিল না। সহজলভ্য ছিল না গাড়িঘোড়া। তাই শহরো মৌড়াইলে চাচার বাসায় থেকে পড়াশোনা করতাম আমি। তখন আমাদের স্কুলের নাম ছিল কলেজিয়েট স্কুল। পরে স্কুলের নাম হয় নিয়াজ মুহাম্মদ হাই স্কুল। স্কুলের সামনে বিশাল মাঠ। তার দক্ষিণ পাশে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজ ভবন। এই মাঠেই শহরের ও তৎকালীন মহকুমার বড় বড় অনুষ্ঠান হতো। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের কেন্দ্র ছিল এই কলেজ। এখান থেকে বের হতো রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের মিছিল। এই মিছিলের জনপ্রিয় স্লোগান ছিল ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, নুরুল আমিনের কল্লা চাই’।

কেন এই জনপ্রিয়তা?

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার (তখনকার থানা) শাহবাজপুর গ্রামের নুরুল আমীন ছিলেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী। তিনি উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে ছিলেন। এটা মেনে নিতে পারেনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষ। তাই তার ওপর ক্ষোভ ছিল সবচেয়ে বেশি।

আপনি নিয়মিত মিছিলে যেতেন? 

আমি তখন রাজনীতির সঙ্গে অল্পবিস্তর যুক্ত। আমার নেতা ছিলেন আলি আজম, সিরাজুল হক বাচ্চু, লুৎফুল হক সাচ্চু। স্কুলের মাঠে নানা উপলক্ষে কলেজের বড় ভাইদের মিছিল-মিটিং দেখতাম। সেই বড় ভাইরা খুব বেশি বড় না। কারণ তখনো কলেজে ডিগ্রি চালু হয়নি। ইন্টারমিডিয়েটের ভাইদের সঙ্গে আমাদের বয়স আর শারীরিক গঠনে খুব বেশি পার্থক্য ছিল না। কাজেই ভাষা আন্দোলনের কেন্দ্র ব্রাহ্মণবাড়িয়া কলেজের মিটিং-মিছিলে নিয়মিত শামিল হতাম। আমার সঙ্গে ছিলেন আমাদের পাশের গ্রাম ফুলবাড়িয়ার কুতুবুর রহমানসহ (পরে পুলিশের আইজি)  অনেকে। বায়ান্নর অনেক আগে, সেটা ১৯৪৮ সালে, আমাদের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সন্তান ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত প্রথম বাংলা ভাষার দাবি তোলেন। সেটা আমরা জানতাম। আমাদের ভেতর ভাষা আন্দোলন নিয়ে একটা অহংবোধ ছিলই।

ভাষা আন্দোলন নিয়ে খুব উত্তেজনার মধ্যে ছিলেন।

সত্যি বলতে বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারির আগে শহরে উত্তেজনা বলতে যা বোঝায় তা ছিল না। ভাষার দাবিতে স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীরা দু-একটা মিছিল করতাম, ধর্মঘট করেছি। মূলত ভাষার আন্দোলন উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে একুশে ফেব্রুয়ারির দিন। তার দিন পনেরো আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন হয়। এর সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক কিংবা অন্যদের নাম মনে পড়ছে না। কেননা ভাষা আন্দোলনের সময়টা ছিল খুবই অল্প। দাবি মেনে নেয়ার পর আর তাদের সঙ্গে কখনো যোগাযোগ হয়নি। তারাও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রাজনীতির মাঠে ছিলেন না।

তবে একজন সদস্য ছিল আমাদের স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র ফটিক। তার পুরো নাম এখন মনে পড়ছে না। সম্ভবত ছামিউল আছে নামের অংশে। আমরা তাকে ফটিক ডাকতাম। পরবর্তী সময়েও আমরা তাকে এই নামে চিনি। আমার রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ছিল মূলত আওয়ামী লীগের নেতা আলি আজম ভাই, অ্যাডভোকেট সিরাজুল হক বাচ্চু ভাই (বর্তমান আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের বাবা), লুৎফুল হাই সাচ্চু- তাদের সঙ্গে। আর পরবর্তী সময়ে ছয় দফাসহ অন্য আন্দোলনে আবদুল কুদ্দুস মাখনের (জাতীয় বীর) সঙ্গে।

একুশে ফেব্রুয়ারির সেই দিনের কথা মনে পড়ে?

যেহেতু ভাষা আন্দোলনের নেতত্বে ছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়া কলেজ, সেহেতু আমাদের স্কুলের মাঠ থেকে মিছিল বের হতো। ‘আমাদের মাঠ’ বলছি এ জন্য যে মাঠটি স্কুলের। এখনো এটি নিয়াজ মুহাম্মদ হাই স্কুল মাঠ নামে পরিচিত। ২১ ফেব্রুয়ারি সকাল থেকে ব্রাহ্মণাবাড়িয়া শহরের বিভিন্ন স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা জমায়েত হতে থাকে মাঠে। সকাল ১০টার মধ্যে সবাই এসে যায়। এখানে বক্তারা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সন্তান অলি আহমদের কথা বলেন, যিনি রেসকোর্স ময়দানে রাষ্ট্রভাষা উর্দু ঘোষণার  প্রতিবাদ করেছিলেন সেখানে। ধীরেন্দ্রনাথের কথাও বলেন। সভার পর বিরাট মিছিল হয়।

দুপুর পর্যন্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ভাষা আন্দোলনে উত্তেজনা অতটুকুই ছিল। ঢাকার খবর তখনো কিছু জানা যাযনি। এরপরই পরিস্থিতি বদলে যায়। রেডিওতে খবর আসে ঢাকায় ভাষার মিছিলে পুলিশ গুলি চালিয়েছে, কয়েকজন ছাত্র শহীদ হয়েছেন। সঙ্গে নানা গুজব ছড়াতে থাকে। কেউ কেউ খবর দেয় ছাত্র-জনতার ওপর পুলিশের গুলিতে বহু ছাত্র মারা গেছে। শহরজুড়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ইতিমধ্যে শহরে পুলিশ, ইপিআর (ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস), আনসার নেমেছে। বেশ কয়েকজন আটক হয়েছেন। বাড়ি বাড়ি তল্লাশি করে ছাত্রদের আটক করা হবে এমন খবর ছড়াতে থাকে।

আপনি তখন কী করছিলেন?

রাতে জানাজানি হয় ঢাকায় ছাত্র হত্যার ঘটনায় পরিস্থিতি উত্তুঙ্গ। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পরদিন বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিলের সিদ্ধান্ত নেয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। পরিকল্পনা করা হয় স্টেশনে ট্রেন আটকানোর। কিন্তু পুলিশ-ইপিআরের কারণে ব্রাহ্মণবাড়িয়া কিংবা আখাউড়ায় আটকানো সম্ভব হবে না। আমরা এলাকার ছেলেরা আজম ভাই, সাচ্চু ভাই, বাচ্চু ভাই আর পৌরসভা মেয়র মাহবুবুর রহমানের সঙ্গে পরামর্শ করে গ্রামে চলে আসি। আমাদের গ্রামের পাশে পাঘাচং রেলস্টেশন। বাড়ির পাশ দিয়ে চলে গেছে ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট এবং চট্টগ্রাম ও সিলেটের সঙ্গে ময়মনসিংহসহ উত্তরবঙ্গের ট্রেন যোগাযোগের রেললাইন।

পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি সকাল নয়টায় আমরা বেশ কিছু ছেলে পাঘাচং স্টেশনে গিয়ে উত্তরবঙ্গগামী বাহাদুরাবাদ মেইল ট্রেন আটকাই। স্টেশন মাস্টারকেও আটকে রাখি। এ সময় আরও ছিলেন চান্দপুর গ্রামের ফুলু মাস্টার, আবদুল ওয়াহাব (পিরজি মাস্টার), জারু ভূঁইয়া, উত্তর জগৎসার গ্রামের শহীদ, পাঘাচং গ্রামের শহীদুল (পরে কাপ্টেন) আরও অনেকে। আমরা ট্রেনটি পাঁচ দিন আটকে রাখি। ওদিকে পাঘাচং স্টেশন থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দিকে চার কিলোমিটার দূরে ভাদুঘরে রেললাইন ওপড়ে ফেলেন সেখানকার ছাত্ররা। আর আখাউড়ার দিকে আমাদের গ্রাম থেকে মাইল তিনেক দূরে চিনাইর-ভাতশালায় রেললাইন ওপড়ে ফেলা হয়। দেশের প্রধান রেলপথে যোগাযোগ বন্ধ থাকায় দেশজুড়ে নাড়া পড়ে তখন। রেললাইন অবরোধে পরে যোগ দেয় বিভিন্ন গ্রামের আরও মানুষ।

অ্যাডভোকেট সিরাজুল হক বাচ্চু মিয়া (বাঁয়ে), অ্যাডভোকেট আলী আজম ভূইয়া ও অ্যাডভোকেট লুৎফুল হাই সাচ্চু।

পুলিশ আপনাদের ধরেনি?

পুলিশ এসেছে। কিন্তু আমাদের কিছু করতে পারেনি। স্টেশন মাস্টারকে আমরা হুমকি দিয়েছি, ট্রেন চালানোর চেষ্টা করলে জানে মেরে ফেলব। স্টেশন মাস্টার তখন পাশেই রেলের কোয়ার্টারে থাকত। আর তা ছাড়া স্টেশনের দুই দিকেই তিন-চার কিলোমিটার দূরে রেললাইন উপড়ানো। সম্ভবত ২৬ কিংবা ২৭ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষার দাবি মেনে নেয়ার পর ট্রেনটি ছাড়া হয়।

ভাষা আন্দোলন ঘিরে দেশের আর কোথাও এভাবে রেললাইন অবরোধের ঘটনা ঘটেছে কি না আমরা জানি না। মাতৃভাষার দাবিতে আর ছাত্র হতার প্রতিবাদে আমরা পাকিস্তানি শাসকদের পুলিশ আর মামলার ভয় উপেক্ষা করে দেশের প্রধান রেললাইন আটকে রেখেছি দিনের পর দিন।

এই সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় আমরা একাত্তরের লড়াই করে স্বাধীন বাংলাদেশ অর্জন করেছি। আমি সৌভাগ্যবান যে সেই যুদ্ধেও নিজেকে শামিল করতে পেরেছি। আমি একজন ভাষাসৈনিক ও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গৌরব বোধ করি।

আপনাকে ধন্যবাদ।

আপনাকে এবং ঢাকাটাইমস পরিবারের সবাইকে শুভেচ্ছা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :