পয়লা বৈশাখ অসাম্প্রদায়িক উৎসব হিসেবে পালিত হচ্ছে

শামসুজ্জামান খান
 | প্রকাশিত : ১৪ এপ্রিল ২০১৯, ১০:০১
ফাইল ছবি

বাংলা সন যখন থেকে চালু করা হয় তখন থেকেই আমাদের এখানে বাংলা নববর্ষ পালন করা শুরু হয়। বিশেষ করে এটা গ্রামে হতো, এই ঢাকা শহরে তখন এটা উদযাপন করা হতো না। এখনকার মতো উদযাপন ওভাবে হতো না। আমার শৈশবে আমি দেখেছি, গ্রামে মেলা বসেছে। সেখান থেকে আমরা বন্ধুরা মিলে বিভিন্ন ধরনের মাটির খেলনা ও শুকনো খাবার কিনতাম। আমার শৈশবের যে সময়টা আমি কলকাতায় ছিলাম তখন এই বিষয়টা দেখেছি বলে এখন মনে পড়ছে না।

দুই বাংলার বৈশাখ নিয়ে কথা বলার আগে যেতে হবে বাংলা নববর্ষের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটা কোথায় বা এটাকে আমরা কীভাবে আপন করে নিয়েছি। যেটা কি না এখন আমাদের জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে।

এখন বাংলাদেশে এটা বুঝতে হবে পাকিস্তান হওয়ার পর থেকে মুসলিম মধ্যবিত্তের জাগরণ ঘটল। এটা আগে তেমন ছিল না। এর কোনো স্বীকৃতিও ছিল না। নতুন রাষ্ট্রের জাগরণে মুসলিম মধ্যবিত্ত সমাজ গড়ে উঠল। তারপর একসময় দুই পাকিস্তানের মধ্যে একটা আন্দোলনের সূত্রপাত হলো। পশ্চিম পাকিস্তান শোষণ করছিল পূর্ব বাংলাকে। যোগ হলো ভাষা আন্দোলন। ভাষা আন্দোলনের পরে বাঙালি জাতিসত্তা বিকশিত হলো মুসলিমদের মধ্যে। আগে আমরা মুসলমানরা বাঙালি এ নিয়ে অনেক বিতর্ক ছিল। তারপর বাঙালি হওয়ার চেষ্টা। ভাষা আসল। ’৫৬ সালে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক সরকার গঠন করলেন। তারপরই সামনে আসল বাংলা নববর্ষের মাধ্যমে বাঙালির চেতনা বিকাশ ঘটানোর বিষয়টি। এভাবেই শুরু হয় পয়লা বৈশাখ বিকাশের বিষয়টি। ’৬১ সনের দিকে ছায়ানট প্রতিষ্ঠিত হলো। ’৬১ সন থেকে বাংলা নববর্ষ আন্দোলন ছোট আকারে শুরু হলো। ’৬৭ সনের দিকে রমনার বটমূলে এটার আকার বাড়তে থাকল। ক্রমেই এখানে লোকসমাগম বাড়তে থাকে। তখন থেকে এটা বাঙালিদের নতুন এক চেতনায় উদ্বুদ্ধ করল। তখন থেকে পয়লা বৈশাখ আমাদের জাতীয় উৎসবের মর্যাদার দিকে ধাবিত হতে থাকল। সেই সময়ে বাংলা রাষ্ট্রভাষা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এটি আমাদের একটি অসাম্প্রদায়িক সবচেয়ে বড় জাতীয় উৎসবে পরিণত হলো। দিন দিন এটার কলেবর বাড়তে থাকল। গত দুই দশকে এটা আমাদের জাতীয় উৎসবে পরিণত হলো। একটা সময়ে আমাদের নববর্ষ সেই অর্থে মূল্যায়ন না করা হলেও এখন এখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই এই আয়োজনে শামিল হচ্ছে।

তবে আমরা যে অর্থে এটা পালন করছি সেই অর্থে কলকাতার লোকেরা করছে না। আমাদের সঙ্গে তাদের পার্থক্য আছে। বাংলাদেশ হচ্ছে স্বাধীন রাষ্ট্র। ঢাকা আমাদের রাজধানী। তাদের সাংস্কৃতিক যোগাযোগটা অনেক বেশি উত্তর ভারতের সঙ্গে। রামায়ণ, মহাভারতের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের যে যোগাযোগ পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা সেখান থেকে সহজে বিচ্ছিন্ন হতে পারবে না। আমাদের সেই সমস্যা নেই। তাদের আশা-আকাক্সক্ষার সঙ্গে দিল্লির একটা সংযোগ আছে। তারাও এখন করতে শুরু করেছে আমাদের দেখাদেখিতে, তবে আমাদের মতো তাদেরটা অত বড় হয় না। আমাদের এখানে এটা একটা অসাম্প্রদায়িক উৎসব হিসেবে পালন হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গে এই নববর্ষ পালনটা ধর্মীয়ভাবে নেওয়া হচ্ছে।

আমাদের সব উৎসব ধর্মীয় উৎসব। যার জন্য একটা জাতীয় অসাম্প্রদায়িক উৎসব প্রয়োজন ছিল, সেই উৎসব পালনে পয়লা বৈশাখ আমাদের এখানে বড় হয়ে গেছে। ওখানে সংস্কার করেছে। তারাই নির্দিষ্ট করেছে, আমরা মানি তারা মানে না। তাদের ওখানে জ্যোতিষীদের পঞ্জিকায় অবৈজ্ঞানিক এটা তারা মানে।

শামসুজ্জামান খান: বাংলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক

অনুলিখন: নজরুল ইসলাম

 

 

 

 

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :