এখন ইইউ থেকে বের হতে চায় সুইডেন-ডেনমার্কও

অনলাইন ডেস্ক
| আপডেট : ২১ এপ্রিল ২০১৯, ১০:১৭ | প্রকাশিত : ২১ এপ্রিল ২০১৯, ১০:১৩

৪৩ বৎসর পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে এখন ব্রিটেন বের হওয়ার পথে। ইতিমধ্যেই ব্রিটেনের পর এখন ডেনমার্ক, হল্যান্ড, সুইডেন ও অস্ট্রিয়াসহ কয়েকটি দেশ ইইউ ভুক্ত থাকা না থাকার ব্যাপারে পুনরায় গণভোটের দাবি জানিয়েছে। এক জরিপ পরিসংখ্যান অনুসারে ৬৯% এর চেয়েও বেশি সুইডিশ ইইউ থেকে বের হয়ে যাওয়ার পক্ষে। ডেনমার্কে এই মতামতের পরিমান ৬৬%। নেদারল্যান্ড ও ফ্রান্স থেকেও ইইউ বর্জনের কথা উঠেছে।

ফ্রান্সের বর্ণবৈষম্যবাদী রাজনৈতিক দলের প্রধান মেরিন লেপেন এক সময় বলেছিলেন ২০১৭ সালের নির্বাচনে নেশনাল ফ্রন্ট জয়ী হতে পারলে ইইউ’তে থাকা আর না থাকার ওপর নুতন করে গণভোট দেওয়ার কথা। কিন্তু নির্বাচনে পরাজয়ের কারণে তার সেই আশা পূরণ হয়নি। এদিকে এক জরিপ পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে ৪৫% অস্ট্রিয়ানরা ইইউ থেকে বের হয়ে যাওয়ার পক্ষে। এই সংখ্যা বর্তমানে আরো বৃদ্ধি লাভ করেছে বলে অনেকে মনে করছেন। অন্যদিকে নেদারল্যান্ডের ৭৬% নাগরিক ই ইউ তে অবস্থানের পক্ষে মতামত দিলেও সেখানে বর্তমানে ই ইউ থেকে বের হয়ে যাওয়ার যাওয়ার জন্য পক্ষে বিপক্ষে পুনরায় গণভোটের দাবি উঠেছে। এখন প্রশ্ন  হলো  ইউরোপীয় দেশগুলো একের পর এক কেন বর্তমানে ইইউ থেকে বের হয়ে যাওয়ার দাবি তুলছে? 

পর্যবেক্ষক মহলের মতে পশ্চিম ইউরোপীয় ধনী দেশগুলোর মধ্যে একসময় ইমিগ্রেশন ব্যবস্থা সীমাবদ্ধ ছিল। প্রতিটি দেশের অর্থনৈতিক অবস্থান কাছাকাছি থাকার কারণে এক দেশের নাগরিক অন্য দেশে বসবাস কিংবা বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা গ্রহণে তেমন একটা আগ্রহ হয়নি। তখন বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় জনগণ ততটা আলোচনা করেনি। পরবর্তীতে পূর্ব ইউরোপের দরিদ্র দেশগুলো ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য লাভ করলে এবং একই সময় ইউরোপের বাহির থেকে ব্যাপক ভিত্তিতে উদ্বাস্তু প্রবেশ  শুরু  হলে  সমস্যাটি অন্য রূপ ধারণ করে। দিন দিন ইমিগ্রান্ট সংখ্যা বৃদ্ধি স্থানীয় নাগরিকদের দৃষ্টিতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে অর্থনৈতিক, সামাজিক, শিক্ষা ও রাজনৈতিকভাবে পূর্ব ইউরোপের দরিদ্র দেশগুলোর অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন ও অনেক নিম্ন। অন্যদিকে ইউরোপের বাহির থেকে আসা ইমিগ্রান্টদের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়াকে জনগণ সহজভাবে গ্রহণ করতে পারছে না। পূর্ব ইউরোপের দেশ ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সদস্য লাভের পর পর দেশগুলো থেকে প্রচুর ইমিগ্রান্ট ইউরোপের ধনী দেশগুলোতে বসবাসের জন্য পাড়ি দেয়। এছাড়া মিডিয়ায় বহিরাগত বিরোধী অপপ্রচার ইইউ নাগরিকদের কাছে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বর্তমানে বলতে গেলে প্রতিটি দেশে বর্ণ বৈষম্যবাদী চরম ডানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো শুধুমাত্র ইমিগ্রান্ট বিরোধী বক্তব্য দলের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিতে সহযোগিতা করছে। এসকল দলগুলো বর্তমানে স্ব স্ব দেশের আভ্যন্তরীণ নির্বাচন ও ইইউ নির্বাচনে নিজেদের অবস্থানকে আরো শক্তিশালী করে তুলছে। অনেকে মনে করছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নে ইমিগ্রান্ট সমস্যাই মূলত ইইউ থেকে বের হয়ে যাওয়ার স্লোগান সৃষ্টি করেছে।   

আরেকটি বিষয় এখানে লক্ষণীয় যে ইইউ পার্লামেন্টের সদস্য সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়ে থাকে দেশের জনসংখ্যার ওপর নির্ভর করে। যার কারণে বর্তমানে জার্মান ৯৬, ফ্রান্স ৭৯, ইতালি ৭৬, স্পেন ৫৯, পোল্যান্ড ৫২ সিট ধরে রাখাতে পার্লামেন্টে তাদের একক প্রভাব খাটানোর যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। এদিকে ইউরোপের লেফট এলাইন্স শুরু থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিপক্ষে থাকার কারণে নিজ নিজ দেশে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আসন সংখ্যা বেশি না পাওয়ার কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়ন পার্লামেন্টে অনেকটা কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছে। ইইউ পার্লামেন্টে রক্ষণশীল জোটের প্রাধান্যতা থাকায় পুঁজিবাদীদের স্বার্থে অনেক প্রস্তাব তারা সহজেই পাশ করে নিতে পারে। এক্ষেত্রে লেফট এলাইন্সকে বার বার পরাজিত হতে দেখা যায়। বর্তমানে ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের সদস্য সংখ্যা লক্ষ্য করলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে উঠবে। 

ইউরোপীয় পার্লামেন্ট বর্তমান আসন সংখ্যা ৭৫১। তবে আগামী ২৬ মার্চ মোট ৭০৫ আসন সামনে রেখে বিভিন্ন দেশ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে। বাকি আসনগুলো ভবিষ্যতে নুতন দেশ যোগদান করলে তাদের মধ্যে বন্টনের জন্য রেখে দেওয়া হয়েছে। নিচে বিভিন্ন দেশের সদস্য সংখ্যার একটা তালিকা দেওয়া হলো। জার্মান ৯৬, ফ্রান্স ৭৯, ইতালি ৭৬, স্পেন ৫৯, পোল্যান্ড ৫২, রুমানিয়া ৩৩ নেদারল্যান্ড ২৯, বেলজিয়াম ২১, পর্তুগাল ২১, হাঙ্গেরি ২১, চেক ২১, গ্রিস ২১, সুইডেন ২১, অস্ট্রিয়া ১৯, বুলগেরিয়া ১৭, স্লোভাকিয়া ১৪, ডেনমার্ক ১৪,ফিনল্যান্ড ১৪, লিথুনিয়া ১১,আয়ারলেন্ড ১৩, লাটভিয়া ৮,করাশিয়া ১২, স্লোভেনিয়া ৮, মাল্টা ৬, লুক্সেমবার্গ ৬, সাইপ্রাস ৬, এস্টোনিয়া ৭।

পর্যবেক্ষকমহল মনে করেন একদিকে রাশিয়ার সাথে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা ও অন্যদিকে যুক্তরাষ্টের সাথে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় নামতে গিয়ে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সীমানা পরিধি বৃদ্ধির প্রতিযোগিতায় নামাটা হয়তো ঠিক হয়নি। কারণ বর্তমান রাশিয়া তার অতীতের সমাজতান্ত্রিক নীতি থেকে এখন মিশ্র অর্থনীতির দিকে ঝুঁকে পড়েছে। তাছাড়া সেদিনের সেই সোভিয়েত সামরিক জোট এখন আর নেই বললেই চলে। কিছু কিছু ব্যাপারে এখনো অবশিষ্ট থাকলেও অতীতের মতো এতো শক্তিশালী নয়। এব্যাপারে সুইডিশ লেফট পার্টি লিডার ইউনাস সুসটেড এম পি বলেন ইউরোপীয় ইউনিয়নকে ইউনাইটেড স্টেটস অব ইউরোপ প্রতিষ্ঠার ধারণা এখন পরিত্যাগ করতে হবে। 

সুতরাং ইইউ’র বর্তমান নেতৃত্ব যদি সময় থাকতে তাদের ভ্রান্ত নীতি থেকে সরে না আসে তাহলে ধীরে ধীরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ছোট হয়ে আসার সম্ভবনা দেখা দিতে পারে। এই মুহূর্তে কর্মসংস্থান ও ইমিগ্রেশন নীতি নিয়ে ইইউকে নুতন করে ভাবা উচিত বলে অনেকে মনে করছেন। এভাবে একের পর এক দেশের সংখ্যা বৃদ্ধি না করে অন্য পথে চিন্তা করাটাই হবে সবচেয়ে উত্তম। এছাড়া জনসংখ্যার ওপর নির্ভর করে পার্লামেন্টের আসন সংখ্যা নির্ধারণের বিষয়টিও গুরত্বসহকারে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে।

এদিকে প্রথমদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন সাধারণত দুটি ব্লকে বিভক্ত থাকলেও বর্তমানে এই অবস্থা পরিবর্তনের পথে। এখন ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টে বহিরাগত বিরোধী বর্ণবৈষম্যবাদী চরম ডানপন্থী দলগুলো তাদের অবস্থান দিন দিন শক্তিশালী করছে।

ইতিমধ্যে প্রকাশিত এক জরিপ পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে আগামী ২৬ মে নির্বাচনে প্রতিটি দেশেই বর্ণবৈষম্যবাদী দলগুলোর আসন সংখ্যা বৃদ্ধির পথে। অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি, ডেনমার্ক, সুইডেন, পোল্যান্ড, নেদারল্যান্ড, ফিনল্যান্ডসহ বেশ কয়েকটি দেশে তারা এগিয়ে আছে। শুধু তাই নয় ইউরোপের প্রতিটি দেশের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও তারা পিছিয়ে নেই। হাঙ্গেরি, পোল্যান্ড, নেদারল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, ইতালি, ডেনমার্ক, সুইডেন, বেলজিয়াম, গ্রিসে একই অবস্থা। এভাবে চলতে থাকলে একসময় ফ্যাসিবাদী দলগুলো ইউরোপীয় পার্লামেন্টে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব খাটানোর সুযোগ পাবে।

ইইউ আছে, ইইউ থাকবে। তবে আজকের মতো হয়তো নাও থাকতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন যে উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নিয়ে একদিন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল আজকের ইইউ কি আছে সেই পথে? আজকের ইউরোপ চলছে কোন পথে?

লেখক: সুইডিশ লেফট পার্টি কেন্দ্রীয় কমিটির মনোনয়ন বোর্ডের সদস্য, জুরি স্টকহোম আপিল কোর্ট

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :