কোন পথে টাঙ্গাইল জেলা বিএনপি?

রেজাউল করিম
টাঙ্গাইল থেকে
| আপডেট : ০৩ জুলাই ২০১৯, ২২:৫৪ | প্রকাশিত : ০৩ জুলাই ২০১৯, ২০:২৮

টাঙ্গাইল জেলা বিএনপিকে হঠাৎ উত্তর-দক্ষিণ দুটি সাংগঠনিক অংশে ভাগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় বিএনপি। কেন্দ্রীয় নেতারা বলছেন, দলকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী, নিবির পর্যবেক্ষণ ও নতুন নেতাকর্মী বের করতে এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তবে টাঙ্গাইল জেলা বিএনপির নেতাকর্মীরা বলছেন, দলের কোন্দল নিরসনে এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে। কেন্দ্রের দোহাই দিয়ে কেন্দ্রের সিদ্ধান্তের পক্ষেই কথা বলছেন কেন্দ্রীয় নেতারা। অন্যদিকে, তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা বলছেন, এতে দলের কোন্দল আরও বাড়বে। তারা বলছেন, দলকে না ভেঙে ঐক্যবদ্ধ রাখার কথা।

তৃণমূলের নেতাকর্মী, জেলা ও কেন্দ্রীয় নেতাদের সাথে কথা বলে দলের ভেতরের এ দ্বিমতের বিষয়ে জানা গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, টাঙ্গাইল জেলা বিএনপিতে দীর্ঘদিন ধরে বিরাজ করছে দলীয় অন্তর্কোন্দল।ফলে বিএনপির অঙ্গসংগঠনের নতুন কমিটিও গঠন করতে পারেনি দলটি। জেলা উপজেলার পুরনো সব কমিটি দিয়ে চলছে নামমাত্র কার্যক্রম। ফলে ঝিঁমিয়ে পড়েছে দলটির নেতাকর্মীরা। নতুন কমিটি না হওয়ায় নতুন নেতৃত্বও বের হচ্ছেনা। এতে সাংগঠনিকভাবেও অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়েছে।  কোন্দলের প্রভাব উপজেলা পর্যায়েও ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে কোনো কোনো উপজেলাতে নতুন কমিটি গঠনের উদ্যোগ নিলেও ব্যর্থ হতে হয়েছে। পাল্টা কমিটি গঠনের খবরও রয়েছে। নিজ দলীয় নেতাকর্মীরাই এমন অভিযোগ করছেন।

সর্বশেষ ২০১৭ সালে জেলা বিএনপির কমিটি গঠন হয়। তখন কৃষিবিদ শামছুল আলম তোফাকে সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক করা হয় এ্যাড. ফরহাদ ইকবালকে। তোফা বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি এবং ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি সাবেক উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টুর ভাই। তাদের অপর ভাই কেন্দ্রীয় যুবদলের সাধারণ সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকু।

একাধিক নেতাকর্মীরা জানান. জেলা যুবদলের আহ্বায়ক কমিটির পর পূর্ণাঙ্গ কমিটি এখনও হয়নি। মেয়াদ উত্তীর্ণ কমিটি দিয়ে চলছে জেলা ছাত্রদল। উপজেলাগুলোতে বিএপির অঙ্গসংগঠনের আহ্বায়ক কমিটি হলেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয়নি। ১৪ বছরের পুরনো কমিটি নেতৃত্ব দিচ্ছে দেলদুয়ার উপজেলা যুবদল। দেলদুয়ার উপজেলা কৃষক দলের সভাপতি আব্দুল লতিফ মিয়া ও সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম অনেকদিন আগে মারা গেলেও শূন্য পদ এখনও পূরণ হয়নি। অধিকাংশ উপজেলাতেই এমন চিত্র।

পদবঞ্চিতদের অভিযোগ, তোফা-ফরহাদের কমিটিতে আব্দুস সালাম পিন্টু পরিবারের অনুসারীদেরকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। ফলে কমিটি গঠনের পরই বিদ্রোহ দেখা দেয় জেলা বিএনপিতে।

এ নিয়ে একাধিকবার সংঘর্ষ, মামলা, হামলা, দলীয় কার্যালয়ে তালা দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এখনও পদবঞ্চিতরা আলাদা দলীয় কার্যক্রম পালন করে থাকেন। ২০১৭ সালের ২৬ মে জেলা বিএনপি কমিটি হওয়ার পর ২৩ জুলাই টাঙ্গইল প্রেসক্লাবের অর্ডিটোরিয়ামের কর্মি সভায় দুপক্ষের সংঘর্ষ হয়। এসময় সহ-সভাপতি আলী ইমাম তপন.হাসানুজ্জামান শাহীন. আহমেদুল হক শাতিল, শফিকুর রহমান লিটনকে বহিষ্কার করা হয়। সখীপুরে প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী পালন করতে দু পক্ষের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া হয়। ওইদিন ১৪৪ ধারা জারি করে প্রশাসন। এছাড়া বিএনপির পাল্টাপাল্টি কমিটিও গঠন হয়। জেলা কমিটি গঠনের পর পদবঞ্চিতরা বিএনপি অফিসে হামলা চালানোর ঘটনাও ঘটে।

আরেকটি পক্ষের দাবি জাতীয় পার্টি থেকে আসা সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মে. জে. (অ.) মাহমুদুল হাসান বিএনপিতে যোগ দিয়ে তার অনুসারীদের পদপদবীতে অগ্রাধিকার দেওয়ার পর থেকে জেলা বিএনপিতে কোন্দল শুরু হয়। তবে বর্তমানে পিন্টু পরিবারই আলোচনায় রয়েছে।

স্থানীয় নেতাকর্মীদের দাবি, দলকে শক্তিশালী নয়, কোন্দল কাটাতে কেন্দ্র এমন ছক দিয়েছে। জেলার সদর উপজেলা, নাগরপুর, দেলদুয়ার, মির্জাপুর, বাসাইল ও সখীপুর নিয়ে টাঙ্গাইল দক্ষিণ জেলা হতে পারে। এ অংশে ভৌগলিক কারণে কেন্দ্রীয় নেতা মাহমুদুল হাসান, অ্যাড. গৌতম চক্রবর্তী, আহম্মেদ আযম খান, আবুল কালাম আজাদ থাকবেন।

অপরদিকে কালিহাতী, ঘাটাইল, মধুপুর, ধনবাড়ী, গোপালপুর ও ভূঞাপুর এই ছয়টি উপজেলা নিয়ে টাঙ্গাইল উত্তর জেলা কমিটি করার কথা ভাবছে দলটি। ভৌগলিক কারণে এ অংশে আব্দুস সালাম পিন্টু পরিবার উত্তর অংশে পড়বে। এছাড়াও লুৎফর রহমান আজাদ, ফকির মাহাবুব আনাম(স্বপন ফকির), লুৎফর রহমান মতিন ও সরকার শহীদ এ অংশে থাকবেন।

আলোচনা উঠেছে. দলটির বর্তমান সভাপতি শামছুল আলম তোফা উত্তর অংশের সভাপতি হচ্ছেন। সাধারণ সম্পাদক পদটি সরকার শহীদের দখলে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। এদিকে দক্ষিণ অংশে মাহমুদুল হাসান কেন্দ্রীয় বিএনপির সহ-সভাপতি আহম্মেদ আযম সহ-সভাপতি, আবুল কালাম আজাদ কেন্দ্রীয় শিশু বিষয়ক সমম্পাদক ও গৌতম চক্রবর্তী পল্লী উন্নয়ন বিষয়ক সম্পাদক। এক নেতার এক পদ নিয়মে এরা জেলার পদে আসবেন না। ফলে বর্তমান সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ ইকবাল উত্তর অংশের গুরুত্বপূর্ণ পদ পেতে পারেন। আবুল কালাম আজাদ কেন্দ্রীয় পদ ছেড়ে উত্তর অংশের নের্তৃত্বে আসার কথাও শোনা যাচ্ছে। এদিকে আশরাফ পাহেলী ও শাহীনের নামও আলোচনায় রয়েছে।

কেন্দ্রীয় বিএনপি ধারণা করছে, জেলা বিএনপিকে ভাগ করতে পারলে কোন্দল কমার পাশাপাশি নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টি হবে। তবে দলের এমন সিদ্ধান্ত কতোটা ফলপ্রসূ হবে তা নিয়েও ভাবছেন দলের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা। তৃণমূল নেতাকর্মীরা ধারণা, এতে বরং দলের ক্ষতিই হবে। কোন্দল প্রকাশ্যে রুপ নেবে। তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা দুটি কমিটি করার বিপক্ষে অবস্থান করছেন।

জেলা বিএনপির বর্তমান সভাপতি কৃষিবিদ সামছুল আলম তোফা বলেন, টাঙ্গাইল জেলা বিএনপিতে দুটি কমিটি করার সংবাদ আমাদের কাছেও এসেছে। তবে কবে নাগাদ বাস্তবায়ন হবে এটা বোঝা যাচ্ছে না। এক প্রশ্নের জাবাবে বলেন, ভাগ হলে শুধু বিএনপি হবে না সবই হবে। দুটি কমিটি হলে কেমন হবে এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, সংসার ভাগ হলে যা হয়। তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরাও ভাগ না হয়ে ঐক্যবদ্ধ থাকতে চায় বলে জানালেন জেলা বিএনপি সভাপতি। তবে কেন্দ্র যে সিদ্ধান্ত নেবে সেটা মানার কথাও বললেন তিনি।

মেয়াদ উত্তীর্ণ কমিটির বিষয়ে বললেন জেলা যুবদলের আহবায়ক করা হয়েছে গত বছর। কেন্দ্রীয় ছাত্রদল হলে জেলা ছাত্রদলের কমিটি করার কথাও বলেন তিনি।

জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি আব্দুল আজিজ চান খা বলেন, এক জেলাকে দুভাগে ভাগ করলে সাংগঠনিকভাবে দলটি দুর্বল হবে। নিজেদের মধ্যে অন্তর্কোন্দল বাড়বে। তিনি পুরো জেলা বিএনপিকে ঐক্যবদ্ধ এক ফ্রেমে রাখারও পক্ষে মতামত দিলেন তিনি। নতুন নেতৃত্ব বাড়াতে নবীনদের দিয়ে কমিটি সাজালেও সংগঠন দুর্বল হবে বলে জানালেন বিএনপির এই নেতা।

জেলা বিএনপির সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ফকির মাহবুব আনাম (স্বপন ফকির) জানান, বিষয়টি আমি শুনেছি। তবে কিভাবে হবে, কেন হবে বিষয়টি কেন্দ্রীয়ভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।

কেন্দ্রীয় বিএনপির পল্লী উন্নয়ন বিষয়ক সম্পাদক ও সাবেক পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট গৌতম চক্রবর্তী দুটি কমিটি গঠনের তথ্যটি নিশ্চিত করলেও এ ব্যাপারে নিজস্ব কোন মন্তব্য দেননি। কেন্দ্রীয় বিএনপি ভালো মনে করে এমন সিদ্ধান্ত নিলে  তিনি কেন্দ্রের পক্ষেই থাকবেন বলেও জানান তিনি।

কেন্দ্রীয় বিএনপির সহ-সভাপতি ও জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি আহম্মেদ আযম ঢাকাটাইমসকে বলেন, কেন্দ্র থেকে টাঙ্গাইলকে উত্তর-দক্ষিণ দুটি ভাগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ বিষয়ে কেন্দ্রের দায়িত্বরত টিম আমাকে নিশ্চিত করে বলেছেন, টাঙ্গাইল একটি বড় জেলা। ৮টি সংসদীয় আসন। কাজের সুবিধা, নতুন নের্তৃত্ব সৃষ্টি ও পর্যবেক্ষণের সুবিধার্থে কেন্দ্র এমন সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে।

কোন্দলের প্রশ্নটির তেমন গুরুত্ব না দিয়ে কেন্দ্রের সিদ্ধান্তকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন কেন্দ্রীয় বিএনপির এই নেতা। সালাম পিন্টু পরিবারের পদপদবির বিষয়ে তিনি বলেন, পরিশ্রম করলে সে পদপদবি পাবে, দায়িত্ব পাবে এটাই স্বাভাবিক। তিনি আরও বলেন কেন্দ্রের সিদ্ধান্তের বাইরে আমারতো মতামত দেওয়ার সুযোগ থাকে না।

ঢাকাটাইমস/০৩জুলাই/ ইএস

সংবাদটি শেয়ার করুন

বাংলাদেশ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :