বাসে যাতায়াত এখন নারীর আতঙ্ক, যেভাবে হয় যৌন হয়রানি

পুলক রাজ, ঢাকাটাইমস
 | প্রকাশিত : ০১ জুলাই ২০২২, ০৭:৫৭

‘বাসে ওঠার সময় নারীর গায়ে হাত দেয় দরজায় দাঁড়ানো চালকের সহকারী। বাসে ওঠার পর বসার সিট না পেলে দাঁড়িয়ে যাওয়ার সময় পাশপাশ থেকে নোংরা কথা শুনতে হয়। আমাদের দেশে পাবলিক বাসে যাতায়াতের সময় যৌন হয়রানির শিকার হয়নি এমন মেয়ে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। হোক শরীরে হাত দিয়ে বা মুখে খারাপ ভাষা ব্যবহারে।’

ঢাকাটাইমসের সঙ্গে আলাপকালে এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন বাসযাত্রী মালিহা আক্তার।

মালিহা আক্তার বলেন, গণপরিবহনে একা একা নারী চলাচলে অসহায়, প্রতিনিয়ত যৌন হেনস্তার শিকার হতে হচ্ছে। একজন ভুক্তভোগীই বোঝেন এর অন্তর্নিহিত যাতনা।

গণপরিবহনে নারীর জন্য আসন সংরক্ষণের নিয়ম থাকলেও এটি পালন করা হয় না বললেই চলে। ঢাকাটাইমসের সঙ্গে আলাপে একাধিক নারী যাত্রী জানান, নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসনে পুরুষ যাত্রী বসে থাকেন, এমনকি বাসে কোনো নারী উঠে আসনের কাছে গেলেও পুরুষ ব্যক্তিটি নড়াচড়া করেন না।

মূলত গণপরিবহনে যাতায়াতে এই কদর্য পরিস্থিতির কারণে সব সময় আতঙ্কে থাকেন নারী যাত্রীরা। তাদের ভাষ্য, যৌন হয়রানি শুধু শারীরিকভাবে হয় না, মানসিকভাবেও হয়। তাদের এই হয়রানি প্রলম্বিত হয়, সড়কে দীর্ঘ যানজটের কারণে।

তাদের অভিযোগ, গণপরিবহনে যৌন হয়রানি বা কোনো অশালীন আচরণের প্রতিবাদ করলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নারীর পক্ষে কোনো বাসযাত্রী এগিয়ে আসে না। উল্টো আরও কথা শুনতে হয়। তাই অনেকে কোনো পুরুষ যাত্রীর অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ বুঝতে পেরেও চুপ করে থাকেন কিংবা সরে যান।

গণপরিবহনে নারী যাত্রীদের প্রতি নানাভাবে যৌন হয়রানির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে তা চলছে প্রতিকারহীনভাবে। যৌন নিপীড়নকারী ব্যক্তিদের মধ্যে যাত্রীর সংখ্যাই বেশি। গণপরিবহনে ভিড়ের সুযোগ খুঁজে বেড়ায় কিছু বিকৃত মানসিকতার পুরুষযাত্রী।

আর আছে বাসের হেল্পাররা। নারীরা বাসে ওঠা-নামার সময় তাদের গায়ে প্রয়োজন ছাড়া হাত দিয়ে থাকে চালকের সহকারীরা। নারীদের অভিযোগ, এই সহকারীরা আবার বিভিন্ন সময় নানা ইঙ্গিতপূর্ণ অঙ্গ-ভঙ্গি করে। এ রকম কিছু বিকৃত মানসিকতার পুরুষের ভিড়ে যাতায়াত করতে হয় নারীদের।

আঁচল ফাউন্ডেশনের করা এক সমীক্ষায় উঠে এসেছে গণপরিবহন ব্যবহারকারী ৪৫.২৭ শতাংশ তরুণীই যৌন হয়রানির শিকার। এর মধ্যে ৮৪.১০ শতাংশ তরুণী বাসে এবং বাসস্ট্যান্ডে যৌন হয়রানির শিকার হন। এ ছাড়া রেল বা রেলস্টেশনে ৪.৫৮ শতাংশ এবং রাইড শেয়ারিং সার্ভিসে ১.৫৩ শতাংশ তরুণী যৌন হয়রানির শিকার হন।

গত মার্চে করা ওই জরিপে আরও উঠে এসেছে, যৌন হয়রানির মধ্যে আপত্তিকর স্পর্শের শিকার হন ৬৪.৯২ শতাংশ তরুণী। ২০.০৪ শতাংশ কুদৃষ্টি এবং অনুসরণের শিকার হন। তরুণীরা যৌন হয়রানির শিকার হন মূলত একাকী চলার সময়। জরিপে শতকরা ৭৫.৬০ শতাংশ তরুণীর বেলায় দেখা গেছে এমনটি।

এ ছাড়া সমীক্ষায় অংশ নেওয়া মোট তরুণীর ৬৫.৫৮ শতাংশ যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন বলে জানান। এর মাঝে ৩৫.৪৯ শতাংশ তরুণী জানান যে তারা বিকৃত যৌন ইচ্ছার প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত বা কুদৃষ্টির শিকার হয়েছেন। ২৯.৬২ শতাংশ তরুণীকে আপত্তিকর স্পর্শের ভুক্তভোগী হতে হয়েছে।

নৃত্যশিল্পী আফরোজা লিপি ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘আমি সব সময় বাসে চলাচল করতাম। এখন ভয়ে আর বাসে চড়ি না। এই রাজধানীতে ভালো মানুষের মতো খারাপ মানুষও আছে। গণপরিবহনে চলাচলে প্রতিটা নারীকে যৌন হয়রানির শিকার হতে হয়।

আফরোজা লিপি বলেন, ‘নারীদের জন্য বাসে আলাদা সিট থাকলেও ব্যবহার করে পুরুষ। এর একটু প্রতিবাদ করলে তারা রাগারাগী করে। তবে নিজের নিরাপত্তার জন্য আমার সঙ্গে ধারালো ছুরি থাকে। আমি মনে করি প্রতিটি নারীর নিজেকে নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য কিছু না কিছু সঙ্গে রাখা উচিত।’

সংস্কৃতিকর্মী মিছবাহ ফারাজী ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘আমাদের কর্মজীবী নারীরা পথ চলার সময় নানাভাবে যৌন হয়রানির শিকার হয়ে থাকে। বিশেষ করে গণপরিবহনের কথা বলতেই হয়। এখানে নারী যাত্রীদের ভোগান্তির শেষ নেই। যৌন হয়রানির মতো অসভ্য পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয় তাদের। এই গুরুতর বিষয়টির দিকে প্রশাসনের নজর দেওয়া উচিত।’

তবে গণপরিবহনে নারীর দাঁড়িয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো আপত্তি নেই নাট্যকর্মী ও এক্টিভিস্ট মেহেরান সানজানার। কিন্তু নারী যাতে যৌন হয়রানির শিকার না হন সেটি নিশ্চিত হতে চান তিনি।

ঢাকাটাইমসকে সানজানা বলেন, ‘যেহেতু নারী পুরুষ সমান অধিকার, সেহেতু আমি মনে করি বাসে নারীও দাঁড়িয়ে যেতে পারা উচিত। তবে অসুস্থ ও বয়ষ্ক নারী যদি হয়ে থাকে সেক্ষেত্রে অবশ্যই সিট দেয়া উচিত।’

মেহেরান সানজানা বলেন, ‘নারী সবখানেই হেনস্তার শিকার হয়। ধর্ষণ শুধু শারীরিকভাবে হয় না, মানসিকভাবেও হয়। নারীর পক্ষে আজ পর্যন্ত কোনো বাসযাত্রীকে কথা বলতে দেখিনি। কেউ না এলও সব জায়গায় নারীকে কথা বলতে হবে, প্রতিবাদ করতে হবে।’

(ঢাকাটাইমস/০১ জুলাই/মোআ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :