একান্ত সাক্ষাৎকারে বাহাউদ্দিন নাছিম

জেলের তালা ভেঙে খালেদা জিয়াকে কীভাবে আনতে চায় বিএনপি?

জাফর আহমেদ, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ০২ নভেম্বর ২০২২, ০৯:১৮ | প্রকাশিত : ০২ নভেম্বর ২০২২, ০৯:০৭

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেছেন, ‘অতীতে বিএনপি আন্দোলনের নামে আগুন-সন্ত্রাস করে গাড়িতে বোমা মেরে মানুষ হত্যা করেছে, গবাদি পশুও হত্যা করেছে। তারা মানুষ হত্যা আর গবাদি পশু হত্যাকে এককাতারে রেখে আবারও আন্দোলনে করতে চায়। এদের হাতে বাংলাদেশ নিরাপদ নয়, এজন্য জনগণকে সতর্ক থাকতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘গত ১৩ বছর ধরে তারা হুঙ্কার দিয়েই যাচ্ছে। কিন্তু বিএনপি যদি মনে করে আগুন সন্ত্রাস করে গবাদি পশু যেভাবে হত্যা করেছে মানুষও সেভাবে হত্যা করবে তাহলে ভুল করবে।’

ঢাকা টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম। সাক্ষাৎকারে তিনি আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলন, বিএনপির আন্দোলন, দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনসহ নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন।

বাহাউদ্দিন নাছিম আগে টানা তিন মেয়াদে দলটির সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২১তম জাতীয় সম্মেলনে দলের য্গ্মু সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হন।

আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করে আসা নাছিম প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারীও ছিলেন। ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতিতে সম্পৃক্ত নাছিম।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকায় শেখ হাসিনার জনসভায় গ্রেনেড হামলায় মারাত্মকভাবে আহত হয়ে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছেন তিনি।

প্রশ্ন: আওয়ামী লীগের ২২তম জাতীয় সম্মেলন নির্বাচন উপলক্ষে নেতাকর্মীদের কী বার্তা দেবে?

নাছিম: বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এ দেশের সবচেয়ে প্রাচীন, ঐতিহ্যবাহী ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক সংগঠন। বাঙালির সব মহৎ অর্জনে নেতৃত্ব দিয়েছে আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের প্রতিটি কাউন্সিলই ঐতিহাসিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের পাশাপাশি অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কাউন্সিলে গৃহীত হয়। দল কীভাবে চলবে এবং দলের সিদ্ধান্তের রূপরেখা কী হবে তা নির্ধারিত হয় কাউন্সিলে। আরও উল্লেখযোগ্য হলো, দলের সব নেতাকর্মীর অভাবনীয় আগ্রহজনক উপস্থিতি যা রূপ নেয় সমমনাদের মিলনমেলায়, যাতে আগামীর দিকনির্দেশনা পাওয়া যায়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে একমাত্র আওয়ামী লীগই সব পরিস্থিতি মোকাবিলা করে নিয়মিত সম্মেলন করতে সক্ষম হয়েছে। আগামী নির্বাচনের এখনো অনেক সময় বাকি আছে। আমাদের নেতাকর্মীরা সবসময় মাঠে আছে জনগণের পাশে আছে। আমাদের একটাই বার্তা আওয়ামী লীগের সব নেতাকর্মী ঐক্যবদ্ধ হয়ে মানুষের জন্য কাজ করা এবং জঙ্গিবাদ সাম্প্রদায়িক অশক্তিকে প্রতিহত করা।

বিএনপির কড়া সমালোচনা করে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, ‘বাংলাদেশের আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। দেশের প্রতিটা মানুষের জন্য আইনের শাসন রক্ষা করা নাগরিকদের দায়িত্ব। কিন্তু বিএনপি আইনের প্রতি কোনো শ্রদ্ধা না রেখে নীতি বহির্ভূতভাবে একজন সাজাপ্রাপ্ত আসামিকে জেল থেকে তালা ভেঙে আনার কথা বলছে। ২০১৮ সালেও বিএনপি-জামায়াত জোটের অনেক নেতা বলেছিল নির্বাচনের পরে নিজ হাতে জেলের তালা খুলে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করা হবে। যারা এ ধরনের বক্তব্য দেয় তারা বিএনপির দলে আছে। একজন সাজাপ্রাপ্ত আসামি খালেদা জিয়া, তাকে জেলের তালা ভেঙে কীভাবে আনতে চায় বিএনপি নেতারা। যে সাজাপ্রাপ্ত আসামি সে জেলে বসে দেশ পরিচালনার স্বপ্ন দেখে। বিএনপি এদেশের জনগণের সমর্থন কতটুকু পাবে এটা অতীতেও বারবার প্রমাণিত হয়েছে। বিএনপির নেতাদের বক্তব্যে হচ্ছে দেশের আইনের বিরোধিতা করে। খালেদা জিয়া দুর্নীতির কারণে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে মামলা করা হয়েছে। এ মামলা তো আওয়ামী লীগ সরকার করেনি। বিএনপির নেতারা চায় না খালেদা বাসায় থাকুক। চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ থাকুক। বিএনপির নেতারা খালেদা জিয়াকে জেলে দিতে চায়, তাদের মধ্যে এ ধরনের ধ্যানধারণা আছে। খালেদা জিয়াকে জেলে রাখতে বিএনপির নেতাকর্মীদের ভেতরে নীলনকশা আছে কিনা এটা তারাই জানে!’

প্রশ্ন: ২০২৩ সালের সংকট মোকাবিলায় আওয়ামী লীগ কোনো পরিকল্পনা নিয়েছে কিনা?

নাছিম: বিশ্ব সংকটের জন্য আওয়ামী লীগ আগাম প্রস্তুতি নিয়েছে বলেই তো সংকটের বিষয়ে বাংলাদেশের মানুষকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। বিশ্বের সংকটের মধ্যে দিয়েই আমরা যাচ্ছি। সংকটের কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলছেন, একটু জমিও যেন খালি না থাকে। আমরা যদি নিজেদের খাদ্য নিজেরা যোগান দিতে পারি, তাহলে যে কোনো সংকট মোকাবিলা করতে সহজ হবে। তাই সংকটের বিষয়ে আগেই সতর্ক করেছেন শেখ হাসিনা। তাই সবাইকে এই সংকট থেকে উত্তরণে কাজ করতে হবে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে বিএনপির কোনো ভূমিকা নেই। তারা মিথ্যা অপপ্রচার করে দেশকে আরও পিছিয়ে দিতে চায়। সারাবিশ্বে দ্রব্যমূল্য বাড়ায় আমাদের দেশেও দাম বাড়ছে। তাই এ দেশের প্রতিটা রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব সত্যকে তুলে ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা, তা কি আমরা পাচ্ছি? প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করার পরেই কর্মপরিকল্পনা ঠিক করে দেশ পরিচালনা করে যাচ্ছেন। কিন্তু বিশ্ব সংকটে বড় দেশগুলোও সংকটে, বাংলাদেশ এর বাইরে নয়। এমনকি বিশ্বের অর্থনৈতিক দিক দিয়ে চীন এতো সমৃদ্ধিশালী, তারাও সংকটে। সংকটে জনগণের পাশে না দাঁড়িয়ে পানি ঘোলা করে ফায়দা নিতে চায় বিএনপি। বিএনপির হলো ক্ষমতার লোভ।’

বিএনপি অভিযোগ করছে, জেলায় জেলায় প্রশাসনের কাছে চিঠি দিয়ে বিএনপির সমাবেশের অর্থদাতাদের খোঁজা হচ্ছে। এ বিষয়ে নাছিম বলেন, ‘১৯৭৯ সাল থেকে ভোট কারচুপি শুরু করেছে বিএনপি। তাদের আমলে আবার দেশের মধ্যে জঙ্গি গোষ্ঠীর আর্বিভাব হয়েছিল। এখন যদি আবার বিএনপির হাতে দেশ চলে যায়, তাহলে বাংলাদেশে আবার জঙ্গি সৃষ্টি হবে। তাই কোন সমাবেশ করা, কোন উদ্দেশ্যে অর্থ দিয়েছে, প্রশাসন তা খুঁজতে পারে। দেশের জনগণের নিরাপত্তায় কাজ করে প্রশাসন। এক্ষেত্রে কেউ বেআইনি অর্থের যোগান দিচ্ছে কিনা তাও জানার দরকার আছে। কারণ বিএনপির অনেক নেতার বেআইনি ও কালো টাকা আছে, এ টাকা কোথায় যায়?’

বিএনপি বলছে, ১০ ডিসেম্বরের পরে খালেদা জিয়া দেশ পরিচালনা করবে। এ বিষয়ক প্রশ্নের জবাবে নাছিম বলেন, ‘বিএনপির নীতি হচ্ছে আমি খেতে পারব না, তার মানে আর কেউ খেতে পারবে না। এ নীতিতে যারা বিশ্বাসী তারাই গণতন্ত্র ধ্বংসকারী। বিএনপি সৃষ্টি থেকেই গণতন্ত্র ধ্বংস করছে। গণতন্ত্রকে ধ্বংস করার চূড়ান্ত জায়গা হচ্ছে বিরাজনীতিকরণ, সেই জায়গাতেই বারবার ফিরে চায় বিএনপি। কারণ তাদের জন্মই হচ্ছে গণতন্ত্র ধ্বংসের মাধ্যমে, সামরিক শাসনের মাধ্যমে। যেখানে গণতন্ত্রের বিন্দু পরিমাণ অস্তিত্ব নাই, সেই জায়গায় তাদের ফিরে যাওয়ার উদ্দেশ্য। শোষণ নিপীড়ন অগণতান্ত্রিক পথে হেঁটে কবর রচনা করতে চায় বিএনপি। আর এসব কথা আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা, আওয়ামী লীগের সমর্থকরা মেনে নেবে না। বিএনপি চায় দেশের মধ্যে বড় একটা বিশৃঙ্খলা করে সামরিক শাসনের উত্থান ঘটিয়ে গণতন্ত্র ভূলুণ্ঠিত হোক। কিন্তু বিএনপি কি জানে সামরিক শাসন এলে দেশের প্রশাসন, বাহিনী বা যেসব সামরিক বাহিনী বিশ্বের শান্তিতে কাজ করে বাংলাদেশের সুনাম বয়ে আনছে এবং অর্থনৈতিকভাবেও লাভবান হচ্ছে তাদের কী পরিণতি হতে পারে? বিএনপি-জামায়াত এসব না ভেবে তাদের স্বার্থের কথা ভাবে।’

প্রশ্ন: দুই দলই রাজনীতির মাঠে মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। বিএনপির বলছে, সরকারের পতনই তাদের মূল লক্ষ্য। এ ব্যাপারে কী মনে করেন?

নাছিম: গণতন্ত্রের প্রতি যাদের শ্রদ্ধাবোধ, সম্মানবোধ থাকে, দায়িত্ববোধ থাকে তারা এসব কথা বলতে পারে না। একথা বলার উদ্দেশ্য দেশের আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটানো। বিশৃঙ্খলার জন্য অনেক ধরনের টালবাহানা করছে বিএনপি। বিএনপির এ ধরনের বক্তব্য আগে শুনেছি। ২০১৮ সালের নির্বাচনের সময় তারা বলেছে, নির্বাচনের পরে নিজ হাতে চাবি নিয়ে জেলের তালা খুলে খালেদা জিয়াকে বের করে আনবে। দেশে কি কোনো নিয়ম শৃঙ্খলা, গণতন্ত্র বলতে কিছু নেই? বিএনপি-জামায়াতের হাতে যদি ক্ষমতা যায়, তাহলে এদেশে গণতন্ত্র বলতে কিছু থাকবে না, জ্বালাও-পোড়াও সন্ত্রাসী কার্মকাণ্ড বেড়ে যাবে। বিএনপি জনগণের সমর্থন পায় না বলেই তারা অযাচিত কথা বলে। এক সময় তারা গাড়িতে আগুন দিয়ে গবাদি পশুর মেরেছে। এখন যদি তারা আগুন সন্ত্রাস করতে চায়, তাহলে মানুষ ছাড় দেবে না। আগুন দিয়ে গবাদি পশু আর মানুষ মারা এক জিনিস নয়।’

প্রশ্ন: ডিসেম্বর মাসে বিএনপি বড় আন্দোলন করবে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি না মানলে হরতালের মতো কর্মসূচি দেবে। বিষয়টা কীভাবে দেখছেন?

নাছিম: বিএনপি হরতাল দিলে গণতন্ত্রের জন্য, জনগণের জানমাল রক্ষায় জনগণের পাশে থাকব। আমরা জনমতের মূল্য দিই। জনগণের মতামতের ভিত্তিতে ও তাদের ভোটে যারা নির্বাচিত হবে, তারাই দেশ পরিচালনা করবে। নিরাপত্তার স্বার্থে, মানুষের স্বার্থের জন্য আওয়ামী লীগ জনগণের সঙ্গেই থাকবে এটাই চূড়ান্ত। বিএনপির হুংকারে কেউ ভয় পায় না। যাদের সঙ্গে জনগণ নেই তাদের কথার মূল্য নেই। গত ১৩ বছর ধরে তারা হুংকার দিয়েই যাচ্ছে। কিন্তু বিএনপি যদি মনে করে আগুন সন্ত্রাস করে গবাদি পশু যেভাবে হত্যা করেছে মানুষও সেভাবে হত্যা করবে তাহলে ভুল করবে।’

প্রশ্ন: তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি না মানলে সংসদ থেকে বিএনপি নেতারা পদত্যাগ করবে বলে মনে করেন?

নাছিম: বিএনপির নেতারা কবে পদত্যাগ করবে আদৌ করবে কিনা তাও তারা জানে না। বিএনপি কী করবে আদৌ তারা জানে না, ভবিষ্যতে কী করবে তাও জানে না। আগে বিএনপি একটি পথ ঠিক করে জনগণের কাছে যাক, তাদের আশা-আকাঙ্খার কথা জানুক। সংসদ থেকে বিএনপি নেতারা পদত্যাগ করলে সংসদে প্রভাব পড়বে না। বাংলাদেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এই নির্বাচনে যারা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হবে, তারাই তো দেশ পরিচালনা করবে। দেশের সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এর বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। যারা নির্বাচন বন্ধ করতে চায়, তাদের উদ্দেশ্য কি লক্ষ্য কি? প্রশ্ন: নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপের কোনো প্রয়োজন আছে কিনা?

নাছিম: আওয়ামী লীগ মনে করে না সংলাপের সময় শেষ হয়ে গেছে। সুযোগ থেকেই যায়, সেজন্য প্রয়োজন মন-মানসিকতা। মিডিয়ার সামনে বসে কথার ঝড় তোলা যায়, কিন্তু দেশ কাঁপানো যায় না। মানসিকভাবে বিশ্বাস করতে হবে গণতন্ত্রের কোনো বিকল্প নেই। সংবিধানকে আমাদের মর্যাদা দিতে হবে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, মিথ্যাচার এখন রাজনীতির অংশ। দেশের ভালোর জন্য দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদদের অনেক প্রয়োজন। আর বিএনপির রাজনীতি হলো যে কোনো মূল্যে ক্ষমতায় এসে লুটপাট করে নিজের পকেট ভারি করা।

(ঢাকাটাইমস/০২নভেম্বর/এফএ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

সাক্ষাৎকার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :