এনার্জি ট্রানজিশনের ট্রেন কি মিস করছে বাংলাদেশ?

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা টাইমস
  প্রকাশিত : ২৪ এপ্রিল ২০২৬, ১৯:৪০
অ- অ+

বাংলাদেশ আজ এক গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা—বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাত—জ্বালানি বাজারকে অস্থির করে তুলেছে। এর প্রভাব সরাসরি পড়েছে আমাদের অর্থনীতি, শিল্প উৎপাদন এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়।

বর্তমানে একটি LNG জাহাজ আমদানি করতে ৬০০ কোটিরও বেশি টাকা ব্যয় হচ্ছে। অথচ দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৪৩ শতাংশ এখনো গ্যাসনির্ভর। যেখানে মোট গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪,০০০ এমএমসিএফডি, সেখানে সরবরাহ সীমাবদ্ধ ১,৮০০ থেকে ২,৩০০ এমএমসিএফডির মধ্যে। LNG আমদানির সক্ষমতাও সীমিত—দুটি FSRU মিলিয়ে সর্বোচ্চ প্রায় ১,১০০ এমএমসিএফডি।

অন্যদিকে, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো আমদানীকৃত কয়লার ওপর নির্ভরশীল। বকেয়া পরিশোধে জটিলতার কারণে কয়লা আমদানে বিঘ্ন ঘটছে, ফলে উৎপাদনেও প্রভাব পড়ছে। HFO ও ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন অত্যন্ত ব্যয়বহুল—যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করছে।

এই বাস্তবতায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি হতে পারত একটি কার্যকর সমাধান। বর্তমানে দেশে প্রায় ১,৭৪০ মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ গ্রিডে যুক্ত হয়েছে। তবুও আমরা প্রত্যাশিত অগ্রগতি দেখতে পাচ্ছি না, যেখানে প্রতিবেশী দেশগুলো ৩০–৪০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।

এর পেছনে রয়েছে কিছু সুস্পষ্ট কারণ—নতুন প্রযুক্তি গ্রহণে অনীহা, জমি ও গ্রিড অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা, অর্থায়নের চ্যালেঞ্জ এবং জ্বালানি আমদানি-নির্ভর একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক কাঠামো।

সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে ১০,০০০ মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে—যা অবশ্যই প্রশংসনীয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য সুনির্দিষ্ট, দৃশ্যমান ও সময়বদ্ধ কোনো উদ্যোগ দেশবাসী এখনো স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছে না। লক্ষ্য নির্ধারণ হয়েছে, কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে এগোনোর গতি ও রোডম্যাপ এখনো অস্পষ্ট।

যদি আমরা এই লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হই, তাহলে সামনে আরও বড় জ্বালানি সংকট অপেক্ষা করছে। রপ্তানি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে, শিল্প উৎপাদন কমবে, বেকারত্ব বাড়বে এবং মুদ্রাস্ফীতি ও সামাজিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পাবে।

এ পরিস্থিতিতে কিছু বাস্তবসম্মত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

প্রথমত, দেশে ডিস্ট্রিবিউটেড সোলার জেনারেশন চালু করতে হবে। অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের জমি ও বিনিয়োগের সক্ষমতা রয়েছে, কিন্তু নিজস্ব বিদ্যুৎ চাহিদা নেই। নির্দিষ্ট ট্যারিফ নির্ধারণ করে তাদের গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের সুযোগ দিলে—সরকারি বিনিয়োগ ছাড়াই বড় পরিসরে উৎপাদন সম্ভব।

দ্বিতীয়ত, ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম (BESS) দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে, যাতে পিক আওয়ারে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়।

তৃতীয়ত, চলমান নবায়নযোগ্য প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন গতি বাড়াতে হবে এবং নীতিগত ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে।

বর্তমানে দেশে গড় বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ প্রায় ১২ টাকা প্রতি ইউনিট, যেখানে বিক্রয়মূল্য প্রায় ৮ টাকা। বাস্তবসম্মত ট্যারিফ নির্ধারণ করা গেলে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বেসরকারি বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।

বাংলাদেশ আজ একটি সিদ্ধান্তের মুখোমুখি—

আমরা কি শুধু লক্ষ্য নির্ধারণেই থেমে থাকব, নাকি বাস্তব উদ্যোগ নিয়ে এনার্জি ট্রানজিশনের ট্রেনে উঠব?

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
লেবাননে যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভঙ্গ করে ইসরায়েলের আবারও বিমান হামলা, নিহত ২৭
গাজায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় আলজাজিরার ক্যামেরাম্যানসহ নিহত ৬
কুষ্টিয়ায় পাথর বোঝাই ট্রাক উল্টে ড্রাইভার ও হেলপার নিহত
শিশু হত্যার অভিযোগে ধানমন্ডিতে পাউবো প্রকৌশলী ও স্ত্রী গ্রেপ্তার
বিশেষ প্রতিবেদন তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা