‘তেলাপোকা পার্টি’র উত্থান, পতনের শঙ্কায় মোদি সরকার!

ভারতের প্রধান বিচারপতির একটি বিতর্কিত মন্তব্যকে কেন্দ্র করে দেশটির তরুণদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক ক্ষোভ। সেই ক্ষোভ থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক উদ্যোগ ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)-এর জন্ম হয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যেই এটি ভারতের অন্যতম আলোচিত অনলাইন আন্দোলনে পরিণত হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত গত মাসে। এক শুনানির সময় ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত কিছু বেকার তরুণকে ‘তেলাপোকা’ ও ‘পরজীবী’র সঙ্গে তুলনা করে মন্তব্য করেন বলে অভিযোগ ওঠে। পরে তিনি দাবি করেন, মন্তব্যটি মূলত ভুয়া ডিগ্রিধারীদের উদ্দেশে করা হয়েছিল। তবে ততক্ষণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়।
এই ঘটনার পর ৩০ বছর বয়সী অভিজিৎ দীপকে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামে একটি ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম চালু করেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নামের সঙ্গে মিল রেখে তিনি সংগঠনটির নাম রাখেন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’।
দ্য টেলিগ্রাফকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দীপকে বলেন, রাষ্ট্রব্যবস্থার চোখে তরুণদের অনেক সময় মূল্যহীন হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু তেলাপোকার মতোই তারা প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে সক্ষম। তাদের দমন করা যেতে পারে, কিন্তু পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়।
প্রথমে ব্যঙ্গ ও বিদ্রূপের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ দ্রুত জনপ্রিয়তা পায়। শুধু ইনস্টাগ্রামেই সিজেপির অনুসারীর সংখ্যা ২ কোটি ২০ লাখ ছাড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই জনপ্রিয়তা ভারতের তরুণ সমাজের হতাশা, ক্ষোভ ও বঞ্চনার প্রতিফলন।
ভারতের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি মানুষের বয়স ৩০ বছরের নিচে। কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগ, সরকারি চাকরির পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস ও অনিয়ম, মূল্যায়ন ত্রুটি এবং শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতা তরুণদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়িয়ে তুলেছে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ভারতে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার প্রায় ১৬ শতাংশ। অন্যদিকে আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০ থেকে ২৯ বছর বয়সী বেকারদের ৬৭ শতাংশই বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতক।
দীপকের মতে, সিজেপি কেবল একটি ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক উদ্যোগ নয়; বরং এটি বেকারত্ব, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি তরুণদের ক্রমবর্ধমান অসন্তোষের প্রতিফলন।
সম্প্রতি দিল্লিতে সিজেপির প্রথম বড় বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। শত শত তরুণ এতে অংশ নেন। তাদের হাতে ছিল তেলাপোকার প্রতীক ও বিভিন্ন স্লোগানসংবলিত প্ল্যাকার্ড। আন্দোলনকারীদের অন্যতম দাবি ছিল শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ।
দীপকের অভিযোগ, সরকারি চাকরির পরীক্ষা ও শিক্ষা খাতে একের পর এক বিতর্ক সত্ত্বেও সরকার জবাবদিহি এড়িয়ে যাচ্ছে। আন্দোলনে অংশ নেওয়া তরুণদের স্লোগান ছিল—‘তেলাপোকা আসছে, ধর্মেন্দ্র প্রধান যাচ্ছে’।
মহারাষ্ট্রের সম্ভাজি নগরের একটি দলিত পরিবারে জন্ম নেওয়া দীপকে ২০২৪ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যান। এর আগে তিনি আম আদমি পার্টির যোগাযোগ কৌশলবিদ হিসেবে কাজ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক রাজনৈতিক প্রচারণায় অভিজ্ঞ হওয়ায় অনলাইন আন্দোলন সংগঠনে তিনি বিশেষ সুবিধা পেয়েছেন।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ‘ভারত জোড়ো অভিযান’-এর জাতীয় আহ্বায়ক যোগেন্দ্র যাদব মনে করেন, সিজেপিকে এখনই পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক আন্দোলন বলা যাবে না। তাঁর ভাষায়, এটি মূলত মোদি সরকারের প্রতি, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে বাড়তে থাকা অস্বস্তি ও হতাশার বহিঃপ্রকাশ।
যদিও সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রতি ৬৮ শতাংশ ভারতীয়ের সমর্থন রয়েছে, তবুও সিজেপির দ্রুত জনপ্রিয়তা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে—মোদি যুগে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের মধ্যে কি বিজেপির প্রতি আস্থার ঘাটতি তৈরি হচ্ছে?
পর্যবেক্ষকদের মতে, কৌতুক, মিম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমনির্ভর আন্দোলন বিশ্বজুড়েই নতুন রাজনৈতিক প্রবণতা হিসেবে দেখা দিচ্ছে। ভারতের ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ সেই প্রবণতারই একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ, যা তরুণদের ক্ষোভ ও হতাশাকে নতুন ভাষা দিয়েছে।
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













































