মিয়ানমারে ফেরার আকুতি, বিশ্বকে ১০ মিনিটের বার্তা রোহিঙ্গাদের

মিয়ানমারের রাখাইনে সহিংসতার মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের দীর্ঘ শরণার্থী জীবনের নয় বছর পূর্ণ হচ্ছে মঙ্গলবার। দীর্ঘ এই সময়ে প্রত্যাবাসনের নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত একজন রোহিঙ্গাকেও মিয়ানমারে ফিরিয়ে নিতে পারেনি দেশটি। বরং সাম্প্রতিক সময়ে আবারও রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে চিহ্নিত করার পুরোনো বয়ান সামনে এসেছে।
নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া, চলাচলে বিধিনিষেধ, মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা এবং পরিকল্পিতভাবে নিজ ভূমি থেকে উচ্ছেদের অভিযোগের মধ্যেই দীর্ঘদিন ধরে নিপীড়নের শিকার হয়ে আসছিলেন রোহিঙ্গারা। ২০১৭ সালে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর অভিযানে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ ও বাস্তুচ্যুতির ঘটনা ঘটে।
প্রাণ বাঁচাতে রাখাইনে নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে শুরু করেন লাখ লাখ রোহিঙ্গা। প্রিয়জনের লাশ, পুড়ে যাওয়া ঘরবাড়ি এবং ফেলে আসা জন্মভূমির স্মৃতি নিয়ে তারা আশ্রয় নেন কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে।
‘নাইন ইয়ারস গন, থিংক টেন মিনিটস ফর রোহিঙ্গা’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে নবম রোহিঙ্গা গণহত্যা স্মরণ দিবসে কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নিজ দেশে ফেরার দাবিতে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে মিয়ানমারে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের দাবি জানিয়েছেন লাখো রোহিঙ্গা।
আজ মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) সকালে উখিয়ার ক্যাম্প-৪ এক্সটেনশনের ফুটবল মাঠে নাগরিক সংগঠন ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গা (ইউসিআর) আয়োজিত এ সমাবেশে উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন ক্যাম্পে আশ্রিত রোহিঙ্গারা অংশ নেন।
সমাবেশে ২০১৭ সালের গণহত্যায় নিহতদের স্মরণ করা হয়। পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের বর্তমান পরিস্থিতি, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার দাবি এবং মিয়ানমারে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের বিষয়ে আলোচনা করা হয়।
বক্তারা বলেন, ২০১৭ সালের সহিংসতার ক্ষত এখনো রোহিঙ্গাদের মনে গভীরভাবে রয়ে গেছে। নয় বছর পেরিয়ে গেলেও স্বজন হারানোর বেদনা, ঘরবাড়ি হারানোর কষ্ট এবং নিজ দেশে ফিরতে না পারার হতাশা কাটেনি।
রোহিঙ্গা অধিকারকর্মী মোহাম্মদ রফিক বলেন, ‘আমরা বিশ্বের কাছে দশ মিনিট চাই, ৯টা বছর পার করেছি। এ দেশ আমাদের নয়, আমরা আমাদের দেশে ফিরতে চাই। এ নিয়ে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আরকান আমাদের, আমরা আরকানের’—এর চেয়ে বড় কোনো সত্য নেই। মানবিক বিশ্বকে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে।
ইউসিআরের প্রেসিডেন্সিয়াল প্যানেলের সদস্য মোহাম্মদ সৈয়দ উল্লাহ বাংলাদেশকে আশ্রয় ও মানবিক সহায়তা দেওয়ার জন্য কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি বলেন, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের জন্মভূমিতে ফিরে গিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে চান।
তিনি বলেন, প্রত্যাবাসন হতে হবে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ। শুধু সীমান্ত পার করে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো নয়; প্রত্যাবাসনের পর নিরাপত্তা, অধিকার, নাগরিকত্ব, চলাচলের স্বাধীনতা ও জীবিকার নিশ্চয়তাও দিতে হবে।
সমাবেশে বার্মিজ ভাষায় বক্তব্য দেন ইউসিআর নেতা মাস্টার শোয়েব। রোহিঙ্গাদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যাতে রোহিঙ্গারা ভয় ও অনিশ্চয়তা ছাড়াই নিজ দেশে ফিরতে পারেন।
সমাবেশের একপর্যায়ে ১০ মিনিট ধরে রোহিঙ্গা ভাষায় বিভিন্ন স্লোগান দেওয়া হয়। এর মধ্যে ছিল—‘শেষ হতা এক্কান—ফিরতে চাই আরকান’, অর্থাৎ ‘আমাদের শেষ কথা একটাই—আরকানে ফিরতে চাই’। এ সময় নিজেদের প্রত্যাবাসনের আকাঙ্ক্ষার কথা বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরেন রোহিঙ্গারা।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয় জানিয়েছে, প্রতিবছরের মতো এবারও রোহিঙ্গা গণহত্যা স্মরণ দিবসের এ সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সমাবেশকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পের সার্বিক নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও এপিবিএন সদস্যরা তৎপর ছিলেন।
(ঢাকাটাইমস/২৫ আগস্ট/আরজেড)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন












































