নেপালে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে মৃত্যু বেড়ে ১৬২, নিখোঁজ ১৫০০

নেপালে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে ভয়াবহ প্রাণহানি ঘটেছে। দেশটি ও চীনের তিব্বত অঞ্চলে এ দুর্যোগে প্রায় ৮০০ বিদেশিসহ মোট ১ হাজার ৫০০ জন নিখোঁজ রয়েছেন। আজ বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) কর্তৃপক্ষের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
বুধবার নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর সঙ্গে তিব্বতের লাসার সংযোগকারী দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল রাসুয়ায় আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধস আঘাত হানে। পর্যটক, ট্রেকার ও তীর্থযাত্রীদের কাছে জনপ্রিয় ওই এলাকায় মুহূর্তেই ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টি হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। পুলিশের মুখপাত্র আবি নারায়ণ কাফ্লে রয়টার্সকে বলেন, উদ্ধারকাজ পুনরায় শুরু হওয়ায় আরও মরদেহ উদ্ধারের আশঙ্কা রয়েছে। ফলে মৃতের সংখ্যা ১৬৫ ছাড়িয়ে যেতে পারে।
পুলিশ ও পর্যটন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নেপালে নিখোঁজ ৮২৬ জনের মধ্যে প্রায় ৫০০ জন বিদেশি নাগরিক। দুই ডজনের বেশি দেশের এসব নিখোঁজ পর্যটকের মধ্যে ভারতের ১৭৭ জন, যুক্তরাষ্ট্রের ৬৩ জন, অস্ট্রেলিয়ার ৩৪ জন, যুক্তরাজ্যের ৩৩ জন এবং কানাডার ২৫ জন নাগরিক রয়েছেন।
অন্যদিকে, চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, তিব্বতের জিরং কাউন্টিতে ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক। চীনা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে নিহতের সংখ্যা তিনজন।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, একটি হিমবাহের বড় অংশ ধসে উপত্যকার তলদেশে আছড়ে পড়ার কারণেই নেপালে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। প্ল্যানেট ল্যাবসের স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে তাঁরা এ ধারণা দিয়েছেন।
ইউনিভার্সিটি অব ক্যালগারির সহযোগী অধ্যাপক ও ভূ-বিজ্ঞানী ড্যান শুগার জানান, প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতা থেকে একটি হিমবাহের অংশ ভেঙে প্রায় ১ হাজার ২০০ মিটার নিচে উপত্যকার তলদেশে আছড়ে পড়ে থাকতে পারে। এর ফলে বিপুল পরিমাণ বরফ, পাথর ও পলিমাটি নিচের দিকে নেমে এসে বন্যা ও ভূমিধসের সৃষ্টি করে।
রয়টার্সকে শুগার বলেন, স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যাচ্ছে, দুর্যোগের আগের ২৪ ঘণ্টায় ওই এলাকায় বিপুল পরিমাণ বরফ গলে যেতে পারে। কিছু হিমবাহের অংশ আগে বরফে ঢাকা থাকলেও পরবর্তী ছবিতে সেখানে খালি বরফ দেখা গেছে।
তিনি বলেন, ওই সময় আবহাওয়া তুলনামূলক উষ্ণ ছিল কি না, তা নিশ্চিত হতে আরও আবহাওয়া তথ্য প্রয়োজন। একই সঙ্গে নির্মাণকাজও পাহাড় ও হিমবাহের অস্থিতিশীলতার একটি সম্ভাব্য কারণ হতে পারে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
শুগার আরও বলেন, প্ল্যানেট ল্যাবসের স্যাটেলাইট চিত্রে একটি হিমবাহের নিচের অংশ প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতায় ভেঙে পড়ার এবং প্রায় ১ হাজার ২০০ মিটার নিচে উপত্যকার তলদেশে আছড়ে পড়ার চিহ্ন দেখা যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হিমবাহ ধসের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। ২০২৩ সালে জাতিসংঘ জানিয়েছিল, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে তিন দশকের কিছু বেশি সময়ে নেপালের তুষারাবৃত পর্বতগুলো প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বরফ হারিয়েছে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, নেপালের হিমবাহগুলো আগের দশকের তুলনায় পরবর্তী দশকে প্রায় ৬৫ শতাংশ দ্রুত গলেছে। ভারত ও চীনের মাঝখানে অবস্থিত নেপালের হিমবাহগুলোর এই দ্রুত পরিবর্তন ভবিষ্যতে পাহাড়ি অঞ্চলে দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
তবে এবারের ঘটনার সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি সম্পর্ক এখনো নিশ্চিত নয় বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। হিমবাহটি ঠিক কী কারণে ধসে পড়েছে, সেটিও এখনো স্পষ্ট নয়।
নেপালি কর্মকর্তারা দুর্যোগের কয়েক মিনিট আগে ওই অঞ্চলে অনুভূত একটি ভূমিকম্পকেও সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বিষয়টি নিয়েও তদন্ত চলছে।
রয়টার্সের পর্যালোচনা করা প্ল্যানেট ল্যাবসের আগের ও পরের স্যাটেলাইট ছবিতে ওই অঞ্চলের ব্যাপক পরিবর্তন দেখা গেছে। সবুজ পাহাড়ের ঢালের বড় অংশ এখন বাদামি রঙের ধ্বংসাবশেষ ও পলিমাটির নিচে চাপা পড়ে আছে।
ভারতের সিকিম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল ভূতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বিক্রম গুপ্তা বলেন, হিমবাহের সম্মুখভাগের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ধসে পড়ার মধ্য দিয়েই এ ঘটনার সূত্রপাত হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। এর সঙ্গে বিপুল পরিমাণ পাথর ও পলিও যুক্ত হয়ে পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।
উদ্ধারকারী দলগুলো এখন নিখোঁজদের সন্ধানে অভিযান চালাচ্ছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, ব্যাপক ধ্বংসাবশেষ এবং যোগাযোগব্যবস্থার ক্ষতির কারণে উদ্ধারকাজে নানা চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। ফলে হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছে কর্তৃপক্ষ।
(ঢাকাটাইমস/২৭ আগস্ট/আরজেড)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













































