মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিকে ইতিবাচকভাবে দেখছে বাংলাদেশ: প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন

বাংলাদেশ ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি’র বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করছে। এ সংক্রান্ত যেকোনো সিদ্ধান্ত জাতীয় স্বার্থ এবং আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতায় দেশের শান্তিরক্ষা অভিজ্ঞতার সম্ভাব্য অবদানের ওপর ভিত্তি করে নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির।
রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক জাতীয় সেমিনারে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি বলেন, ‘আমরা মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা করছি। আমরা এটিকে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখছি।’
হুমায়ুন কবির বলেন, চুক্তিটি বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের অনুকূলে থাকলে এবং শান্তিরক্ষায় দেশের অভিজ্ঞতা যদি মুসলিম দেশগুলোর কল্যাণ ও মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ভূমিকা রাখতে পারে, তবে বাংলাদেশ এ বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
তিনি বলেন, ‘যদি এটি বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় এবং আমরা অনুভব করি যে আমাদের শান্তিরক্ষার অভিজ্ঞতা মুসলিম দেশগুলোর সেবায় ও একটি স্থিতিশীল, শান্তিপূর্ণ মধ্যপ্রাচ্য গঠনে অবদান রাখতে পারে, তবে এ বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সব সুযোগ রয়েছে।’
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) এবং নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির (এনএসইউ) সেন্টার ফর মাইগ্রেশন স্টাডিজ যৌথভাবে ‘ফ্রম ওয়ার্কফোর্স টু স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ : রিম্যাজিনিং বাংলাদেশ-কেএসএ রিলেশনস’ শীর্ষক এই সেমিনারের আয়োজন করে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আরও জানান, সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্সের রাজকীয় অতিথি হিসেবে সফরের আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
হুমায়ুন কবির বলেন, ‘তিনি আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন এবং খুব শিগগিরই সুবিধাজনক সময়ে সেখানে সফর করবেন।’
তিনি আরও বলেন, সৌদি ক্রাউন প্রিন্সও বাংলাদেশ সফরের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন এবং উভয়ের জন্য সুবিধাজনক সময়ে ঢাকা তাকে স্বাগত জানাবে।
হুমায়ুন কবির বলেন, প্রস্তাবিত এই সফরগুলো দুই দেশের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক সম্পর্কের প্রতিফলন। তিনি সৌদি আরবের জন্য সামুদ্রিক নিরাপত্তায় বাংলাদেশকে একটি শক্তিশালী অংশীদার হিসেবেও বর্ণনা করেন।
একটি সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারিত্বের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে শ্রম অভিবাসন ও রেমিট্যান্সের প্রথাগত কাঠামোর বাইরে সম্প্রসারিত করা উচিত।
তিনি বলেন, ‘সেই ভিত্তিটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও, এটিই আমাদের আকাঙ্ক্ষার শেষ সীমা হতে পারে না।’
সৌদি আরবের ‘ভিশন ২০৩০’ এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তর, দেশের অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ, মানবসম্পদ, প্রযুক্তি এবং সংযোগের মতো ক্ষেত্রগুলোতে অভিন্ন স্বার্থ তৈরি করেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি আরও জানান, অগ্রাধিকারমূলক খাতগুলোতে যৌথ বিনিয়োগ ও অংশীদারিত্ব সহজ করার জন্য একটি সম্ভাব্য ‘বিনিয়োগ তহবিল’ গঠনের বিষয়ে আলোচনা চলছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নবায়নযোগ্য জ্বালানি, অবকাঠামো, বন্দর, লজিস্টিকস, কৃষি, মৎস্য, খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, ফার্মাসিউটিক্যালস, তথ্যপ্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে সৌদি বিনিয়োগের জন্য সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, এই ধরনের বিনিয়োগ আকর্ষণে একটি ধারাবাহিক ও স্বচ্ছ ব্যবসায়িক পরিবেশ, উন্নত প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় এবং সময়োচিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রয়োজন।
সৌদি আরবের শ্রমবাজারের পরিবর্তনশীল চাহিদা মেটাতে প্রশিক্ষিত ও সনদপ্রাপ্ত পেশাদার পাঠানোর ওপর জোর দেন কবির।
সৌদি বাজারের প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দক্ষতা নিশ্চিত করতে প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প খাতের মধ্যে শক্তিশালী সহযোগিতার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, সৌদি আরবে প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিকদের কল্যাণ, মর্যাদা ও অধিকার রক্ষা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার থাকবে।
প্রতিমন্ত্রী জ্ঞান ও প্রযুক্তি অংশীদারিত্বের পাশাপাশি বন্দর, শিপিং, লজিস্টিকস, এভিয়েশন এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে (সাপ্লাই চেইন) সহযোগিতার সুযোগের কথা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ‘তাই বাংলাদেশ-সৌদি আরব সম্পর্কের পরবর্তী অধ্যায় কেবল সংখ্যার পরিমাপে নয়, বরং মূল্য সৃষ্টির (ভ্যালু ক্রিয়েশন) মাধ্যমে সংজ্ঞায়িত হওয়া উচিত।’
সেমিনারে সম্মানিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশে নিযুক্ত সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূত ড. আবদুল্লাহ জাফর বিন আবিয়াহ।
বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (দ্বিপক্ষীয়) ড. মো. নজরুল ইসলাম এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান সচিব মো. মুক্তার আহমেদ।
বিআইআইএসএস-এর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল এ এস এম রিদওয়ানুর রহমান এবং এনএসইউর উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুল হান্নান চৌধুরীও সেমিনারে বক্তব্য দেন।
অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে হুমায়ুন কবির পুনর্ব্যক্ত করেন, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি বিবেচনার ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলিম বিশ্বের শান্তি ও স্থিতিশীলতাই বাংলাদেশের মূল লক্ষ্য।
তিনি বলেন, মক্কা ও মদীনা সংলগ্ন অঞ্চলের শান্তি বজায় রাখা একটি প্রধান উদ্দেশ্য। বাংলাদেশ চাইলে সারাবিশ্বে আরও কার্যকর ও ব্যাপকভাবে শান্তিরক্ষায় তার অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারে।
তিনি আরও বলেন, চুক্তিতে অংশগ্রহণ বা জোটে যোগদানের উদ্যোগগুলো ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে, যেখানে আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।
হুমায়ুন কবির বলেন, উভয় দেশের মধ্যে মন্ত্রী ও কর্মকর্তা পর্যায়ের সফরসহ নিয়মিত উচ্চপর্যায়ের আদান-প্রদান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করছে।
তিনি সৌদি আরবে আরও উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন পেশাজীবী পাঠানোর পাশাপাশি জ্বালানি, প্রযুক্তি ও অন্যান্য সম্ভাবনাময় খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ বহুমুখী করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
তিনি বলেন, ‘সৌদি আরবের সঙ্গে আমাদের অত্যন্ত ইতিবাচক আলোচনা চলছে। ইনশাআল্লাহ, দুই দেশের মধ্যে অনেক নতুন সুযোগ তৈরি হবে।’
প্রতিমন্ত্রী বলেন, লাভজনক খাতগুলোতে বাংলাদেশ ও সৌদি আরব যৌথভাবে বিনিয়োগ করতে পারে, এমন একটি বিস্তৃত বিনিয়োগ অংশীদারত্বের সুযোগ রয়েছে।
সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘অন্যের ওপর নির্ভরশীলতার দিন শেষ। আমরা এখন দুই দেশের মধ্যে সমতাভিত্তিক অংশীদারত্ব এবং টেকসই নীতির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি।
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন












