পাকিস্তানের দালালির ‘উচিত শিক্ষা’

আবুল কাশেম, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ২৬ মার্চ ২০১৮, ২৩:০৯ | প্রকাশিত : ২৬ মার্চ ২০১৮, ১৪:৩৯

নিজ দেশের বদলে পাকিস্তানকে ভালোবাসার ফল পেয়েছে লাখ তিরিশেক বাঙালি। লেজুরবৃত্তি করলেও ৪৭ বছরেও এদেরকে নাগরিকত্ব দেয়নি পাকিস্তান। আর শিক্ষা, মানসম্মত কর্মসংস্থানের অভাবে মানবেতর জীবন যাপন করছে।

গত কয়েক বছর ধরে দেন দরবার করে পাকিস্তান সরকারের মন ভুলানোর চেষ্টা করে কিছুটা সাফল্য আসবে মনে হচ্ছিল যখন, তখন পাকিস্তানি বিভিন্ন দল এদেরকে নাগরিকত্ব দেয়ার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভে নেমেছে।

এখন সব মিলিয়ে এদের সংখ্যা হয়েছে ২৮ লাখের মতো, যাদের একটি বড় অংশের বসবাস করাচিতে।

পাকিস্তানপ্রেমী এই বাঙালিরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে করাচির ১০৫টি বসতিতে। ওরাঙ্গি টাউন, ইব্রাহিম হায়দারি কলোনি, বিলাল কলোনি, জিয়াউল হক কলোনি, মূসা কলোনি, মাচার কলোনি এবং ল্যারির বাঙালি পাড়ায় বাঙালি বসতি সবচেয়ে বেশি।

১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের সময়ে বর্তমান পাকিস্তানের ভূখণ্ডের বাইরে থেকে যারা এসেছিলেন, তাদের বলা হয় মুহাজির। এই মুহাজিররা পাকিস্তানের জনসংখ্যার প্রায় ৮ শতাংশ। এদের রাজস্থানী, কনকানি, মারাঠী, হায়দরাবাদী বংশোদ্ভূত মুহাজিরদের বেশিরভাগেরই অবস্থান সিন্ধ প্রদেশে। তবে অন্য জাতিদেরকে মুহাজির হিসেবে একটু সহমর্মীতার দৃষ্টিতে দেখলেও বাঙালিদেরকে দেখা হয় চরম অপমানের চোখে।

এক হিসাবে করাচিতে পাকিস্তানপ্রেমী বাঙালি জনসংখ্যা শহরে মোট জনসংখ্যার ৭.৫ ভাগ শতাংশ। সংখ্যায় তা ১৫ থেকে ২০ লাখের মতো।

পাকিস্তানি গণমাধ্যম দ্য ডনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, শুধু করাচিতেই তিন লক্ষাধিক বাঙালি বসবাস করে। তাদের বেশিরভাগ পোশাক শ্রমিক হিসেবে এবং বাসাবাড়িতে কাজ করে। এছাড়া নিম্নমানের কাজ করে মানবেতর জীবনযাপন করেন তারা।

এদের পূর্বপুরুষরা ১৯৭১ সালে তখনকার পশ্চিম পাকিস্তানে মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল। আর এখনও বাংলাদেশবিরোধী সভা-সমাবেশ করে যাচ্ছে। তবু মন গলছে না পাকিস্তানি সরকারের।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বাংলাদেশেও জামায়াত ইসলামী, মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলাম পার্টিসহ ধর্মভিত্তিক দলের পাশাপাশি চীনপন্থী কিছু বাম দল দাঁড়িয়েছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে। নিজ দেশের মানুষদের গণহত্যায় করেছে সহযোগিতা।

সে সময় পাকিস্তানের পশ্চিম অংশেও বসবাস করতো উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাঙালি। এদের একটি অংশ যুদ্ধের সময়ও নানাভাবে দেশে ফিরে আসেন। কেউ কেউ আসের যুদ্ধ শেষে।

আর একটি অংশ পাকিস্তান প্রেমে মশগুল হয়ে ভুলে যায় নিজ দেশকে। কেবল তাই না, পাকিস্তানিদের মন জয়ে বাংলাদেশের দুর্নাম করতে থাকে।

স্বাধীনতার প্রায় চার দশক পর বাংলাদেশে ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের প্রতিবাদেও পাকিস্তানে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে ৭১ এর উত্তরসূরীরা।

কিন্তু এতসব করেও মানুষ হিসেবে মর্যাদা অর্জন করতে পারেনি পাকিস্তানপ্রেীরা। ৪৭ বছর পরও অধিকার চেয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হচ্ছে তাদের।

নানা ধরনের নিম্নমানের কাজ করে বেঁচে থাকতে হচ্ছে তাদের। নাগরিকত্ব না থাকায় দুদর্শার মাত্রা সীমাহীন।

দ্য ডন এর একটি প্রতিবেদন বলছে, নাগরিকত্ব না থাকায় এবং তাদের বৈধ কোনো ডকুমেন্ট না থাকায় কোন ব্যবসা বা কাজের সাথে সংশ্লিষ্ট হতে পারে না তারা। এমনকি কেউ কেউ গোপনে কাজ করলেও পুলিশের হাতে ধরা খেলে থাকতে হয় কারাগারে।

নিম্নমানের কাজ করা এসব বাঙালিকে পরবর্তীতে ছেড়ে দিলেও তাদেরকে মোটা অঙ্কের ঘুষ দিতে হয়।

এসব বাঙালিকে জুলফিকার আলী ভুট্টোর সরকার বৈধতা দিলেও সে কাগজপত্র আর পুনরায় বৈধ করা হয়নি। এছাড়া পাকিস্তানের জাতীয় তথ্য রেজিস্ট্রি দপ্তর (এনএডিআরএ) পুরোনো এ কার্ডের বৈধতার নবায়ন করতে রাজি নয় বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে।

এনএডিআরএ থেকে বলা হয়, তাদের কার্ড নবায়ন করা হবে না। কারণ তারা বাংলাদেশি, পাকিস্তানি নয়।

পাকিস্তানপ্রেমী বাঙালিদের চলাফেরা এবং সাধারণ কাজ কর্ম করা জন্য ‘ন্যাশনাল আইডেন্টিটি কার্ড’ নামের অস্থায়ী একটি কার্ড দেয় সরকারি দপ্তর। খুব চড়া দামে প্রাপ্ত এ কার্ডও সকলের ভাগ্যে জোটে না।

খাইরুদ্দিন নামের এক বাঙালি ডনকে বলেন, ‘আমার জন্ম পাকিস্তানে। এখানেই বসবাস করছি। বাবাও পাকিস্তানে বসবাস করেছে। বাংলাদেশের সাথে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই।’

পাকিস্তানপ্রেমী বাঙালিদের অধিকার আদায়ে গড়ে উঠেছে সংগঠন ‘পাকিস্তানি বাঙালি অ্যাকশন কমিটি’র। এদের তথ্য অনুযায়ী, করাচির সবচেয়ে বড় জেলে বস্তিতে বসবাস করেন আনুমানিক ৮৫ হাজার মানুষ। এদেশে ৭৫ শতাংশই বাঙালি।

পাক মুসলিম অ্যালায়েন্স নামের একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান খাজা সালমান খাইরুদ্দিন। তার পিতা খাজা খাইরুদ্দিন পাকিস্তান গঠনের সময় অন্যতম নেতা ছিলেন। ১৯৬০ সালে পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকার মেয়র ছিলেন খাইরুদ্দিন।

দলটি করাচির বাঙালি সম্প্রদায়ের মধ্যে সক্রিয়। সালমান খাইরুদ্দিন বলেন, ‘বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর অনেক বাঙালি পাকিস্তান ছেড়ে বাংলাদেশে চলে যায়। আবার অনেকে পাকিস্তানেই থেকে যায়। তারা সে সময় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কারণে পাকিস্তান ছেড়ে যায়নি।’

গত বছর পাকিস্তানে বসবাসরত বাঙালিদেরকে স্থায়ী নাগরিকত্ব দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। তবে তা এখনো কার্যকর করা হয়নি। আর বাঙালিদের নাগরিকত্ব দেয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে তখন পাকিস্তানে বিক্ষোভ প্রদর্শিত হয়।

বাঙালিদের নাগরিকত্ব না দেয়ার দাবিতে বিক্ষোভ

সিন্ধি রাজনৈতিক দলগুলো আবার শুরু থেকেই বিরোধিতা করে আসছে পাকিস্তানপ্রেমীদের নাগরিকত্ব দেয়ার উদ্যোগের।

২০১৬ সালের  ডিসেম্বরেও করাচিতে প্রেস ক্লাব অভিমুখে বিক্ষোভ করে ‘জয় সিন্ধ মাহাজ’ নামে একটি দল।

দলটির প্রধান আবদুল খালিক জুনেজো বলেন, ‘দেশের ভেতরে ও বাইরে ব্যাপক হারে স্থানান্তর-অভিবাসনের দ্বারা সিন্ধি জনগণকে যেন নিজ প্রদেশেই সংখ্যালঘু করে দেওয়া হচ্ছে।’

বাঙালিদের বৈধকরণের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়ে জুনেজো বলেন, ‘সরকারের উচিত এদের বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া এবং তার আগে নিশ্চিত করা যে, তারা যেন ভোট দিতে বা রাষ্ট্রীয় অন্যান্য অধিকার ভোগ করতে না পারে।’

ঢাকাটাইমস/২৬মার্চ/একে/ডব্লিউবি

সংবাদটি শেয়ার করুন

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত