হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন

রাজধানীর শঙ্খনিধিদের ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা বাঁচাবে কে?

তায়েব মিল্লাত হোসেন
 | প্রকাশিত : ০৮ জুন ২০১৮, ১১:৩১

ঢাকার ইতিহাস-ঐতিহ্যে বড় একটি জায়গা নিয়ে আছে শঙ্খনিধি পরিবার। ওয়ারী এলাকায় তাদের স্থাপনা রাজধানী শহরের অতীত গৌরব তুলে ধরে। কিন্তু মূল্যবান এসব নিদর্শন একে একে বিলীন হচ্ছে। কারণ বহুতল ভবন নির্মাণের নামে দখলদাররা একে একে ঐতিহ্যবাহী সব ভবন ভেঙে ফেলছে। অথচ সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় কোনো প্রতিষ্ঠান এগুলো রক্ষায় কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।

গিয়ে দেখা গেছে, গত মাসে খানেকের মধ্যে নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে শঙ্খনিধি পরিবারের রাধাকৃষ্ণ মন্দিরের (৩৮, টিপু সুলতান রোড ও ৪৪, র্যা ঙ্কিন স্ট্রিট) উত্তরাংশ। ভেঙে ফেলা এই অংশের অবস্থান ৪৪, র্যা ঙ্কিন স্ট্রিট। এখানেই ছিল গর্ভমন্দির (যে কক্ষে বিগ্রহ রাখা হয়)। অথচ এই অংশ ভাঙার বিষয়ে উচ্চ আদালত নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল বলে জানা যায়। এর মাধ্যমে বর্তমান দখলদাররা আদালত অবমাননা করেছে, বলছেন আইনজ্ঞরা। তাদের মত হচ্ছে, এভাবে আদালতের নির্দেশনা উপেক্ষিত হতে থাকলে আর কে রক্ষা করবে এই পুরাকীর্তি।

প্রাপ্ততথ্যমতে, উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী ৪৪, র্যা ঙ্কিন স্ট্রিটের রাধাকৃষ্ণ মন্দিরের স্থাপনা সুরক্ষায় যথাযথ ব্যবস্থা নিতে ৩ জুন ওয়ারী থানায় আবেদন করেছে আদালত অবমাননার বিষয়টি বেসরকারি নগর গবেষণা প্রতিষ্ঠান আরবান স্টাডি গ্রুপ। একই প্রতিষ্ঠান ২০১২ সালে মামলা করায় জাতীয় ঐতিহ্য হিসেবে সংরক্ষিত এখানকার স্থাপনাটি ধ্বংসের উপর উচ্চ আদালত স্থগিতাদেশ জারি করে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১১ সালের ডিসেম্বর মাসে শঙ্খনিধিদের মন্দিরটি ভাঙা শুরু করে। খবরটি ছড়িয়ে পড়ে এলাকায়। পরে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) এর ভবন রক্ষার আবেদন জানিয়ে সূত্রাপুর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। এতে কোনো ফল মেলেনি। ভবনটি কৌশলে ভাঙা অব্যাহত রাখে দখলদারেরা। ২০১২ সালে দুই দফায় মন্দিরটির নানা ধরনের অলংকরন সমৃদ্ধ প্রতিমা-কক্ষ ও তার সম্মুখের চাতালের তিন সারি খিলানের দুটি ভেঙে ফেলে।

এর সুরক্ষায় এগিয়ে আসেনি সরকারের সংশ্লিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠান। উল্টো সম্প্রতি ঢাকা সিটি করপোরেশন (ডিসিসি) ও রাজউকের তালিকায় থাকা ৯৩টি ঐতিহাসিক ও নান্দনিক ভবনের তালিকা থেকে এর নাম বাদ দেয়া হয়েছে। অথচ এই তালিকায় নাম থাকলে রাজউকের অনুমোদন ছাড়া আংশিক বা সম্পূর্ণ অপসারণ, পুনর্নির্মাণ, পরিবর্তন, পরিবর্ধন, পরিমার্জন ও সংযোজন কাজ ছিল অসম্ভব। এ স্থাপনা অবশ্য ঢাকা জেলা প্রশাসনের ওয়েবসাইটের তালিকায় দর্শনীয় স্থাপনা হিসেবে আছে। ঐতিহ্য হিসেবে আছে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তালিকায়ও। তবে ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা সংরক্ষণে এগিয়ে আসেনি তাদের কেউ।

এ বিষয়ে আরবান স্টাডি গ্রুপের প্রধান নির্বাহী তাইমুর ইসলাম ঢাকাটাইমস টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, দখলদারদের ক্ষমতা এতোই বেশি যে, তাদের সুবিধা করে দিতে রাজউকের তালিকা থেকে শঙ্খনিধি পরিবারের ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা বাদ দেয়া হয়েছে। অথচ সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিৎ ছিল ঢাকার গৌরবের সাক্ষী এসব পুরাকীর্তি সংরক্ষণে কাজ করা। তারা শুধু তালিকা করেই বসে থাকে। ঐতিহ্য সুরক্ষায় কোনো কাজ করে না।

তিনি আরো জানান, রাধাকৃষ্ণ মন্দিরের উত্তরাংশ নিশ্চিহ্ন করে দখলদাররা যে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা লঙ্ঘন করেছে- এ বিষয়টি তুলে ধরে আরবান স্টাডি গ্রুপ থেকে আবার আদালতের আশ্রয় নেয়া হবে।

এদিকে ঢাকাটাইমস টোয়েন্টিফোর ডটকম থেকে যোগাযোগ করা হলে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আলতাফ হোসেন (অতিরিক্ত সচিব) দাবি করেন, শঙ্খনিধি পরিবারের ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা বিষয়ে খোঁজ রাখা হচ্ছে। ঢাকাটাইমস টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, স্থাপনা ভাঙার খবর জানতে পেরে ঘটনাস্থলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে পাঠানো হয়েছে। তার তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পেলে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

অভিজাত পরিবারের শতবর্ষী ঐতিহ্য

ঐতিহাসিক তথ্যমতে, বিশ শতকের গোড়ার দিকে লালমোহন শাহ বণিক, ভজহরি শাহ বণিক ও গৌর নিতাই শাহ বণিকের পরিবারের বেশ নামডাক ছিল। তখন থেকে এই পরিবার শাহ বণিক উপাধি ফেলে শঙ্খনিধি (শঙ্খের বাহক) উপাধি গ্রহণ করে। তাদের ব্যবসার চিহ্ন হিসেবেও ব্যবহার হতে থাকে শঙ্খ। ১৯২০ থেকে ১৯২৬ সালের মধ্যে এই পরিবার ঢাকা ও ঢাকার আশপাশের বেশ কিছু ভূসম্পত্তির মালিক হয়। আর এসব জমিতে গড়ে ওঠে বেশ কিছু শঙ্খনিধি বৈশিষ্ট্যের ইমারত। সবগুলো ভবনই ছিল নান্দনিক। ঢাকা বিশেষজ্ঞরা এই ভবনগুলোকে শঙ্খনিধি পরিবারের নামেই নামকরণ করেন। কারণ এগুলোর গঠনবৈচিত্র্য ও বৈশিষ্ট্য, ভবনগুলোতে গোথিক-ইন্ডিয়ান ও ইন্দো-সারাসিন রীতির প্রভাব ছিল।

শঙ্খনিধি বৈশিষ্ট্যের অনেকগুলো স্থাপনা রয়েছে। ঢাকার টিপু সুলতান রোড থেকে শুরু করে ওয়ারীর র্যাং কিন স্ট্রিট পর্যন্ত এগুলো বিস্তৃত। এগুলোর মধ্যে এখনো আগেকার আভিজাত্য নিয়ে কোনোমতে টিকে আছে শঙ্খনিধি হাউসটি। লালমোহন শাহ বণিক এটি নির্মাণ করেন। দোতলা এই ভবনের সামনের দিকে রয়েছে একটি কারুকাজ করা ফটক। কেন্দ্রে রয়েছে ষড়ভুজাকৃতি স্তম্ভ। যা এই ভবনের জৌলুশ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ভবনের দুই পাশে তিনটি করে ঢোকার পথ। ভবনটির দেয়ালের পলেস্তারায় রয়েছে লতাপাতা আর ফুলের নকশা।

ঢাকাটাইমস/০৮জুন/টিএমএইচ

সংবাদটি শেয়ার করুন

রাজধানী বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত