অস্বাভাবিক আমদানির কার্যকারণ

কাওসার রহমান
 | প্রকাশিত : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০৮:২৮

চলতি ২০১৮ সাল হচ্ছে নির্বাচনের বছর। ডিসেম্বর মাসে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানে প্রস্তুতি চলছে। আর নির্বাচনের বছর মানেই অর্থ পাচারের বছর। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, নির্বাচন ঘনিয়ে এলেই দেশ থেকে মুদ্রা পাচার বেড়ে যায়। বেড়ে যায় ডলারের মূল্যমানও।

এখন নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশ থেকে মুদ্রা পাচারের আলামত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আমদানি যেভাবে অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে তাতে মুদ্রা পাচারের লÿণগুলোই দেখা যাচ্ছে। সদ্য সমাপ্ত ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বাংলাদেশে পণ্য আমদানির জন্য ঋণপত্র (এলসি) খোলার পরিমাণ অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যে দেখা যাচ্ছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে বিভিন্ন পণ্য আমদানির জন্য সব মিলিয়ে ৬ হাজার ৫৪০ কোটি ৪৬ লাখ ডলারের ঋণপত্র খোলা হয়েছে। বর্তমান বিনিময় হারে এই অর্থ প্রায় সাড়ে ৫ লাখ কোটি টাকা; যা চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের চেয়েও প্রায় লাখ কোটি টাকা বেশি। এলসি খোলার এই পরিমাণ আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ৪৮ দশমিক ২৫ শতাংশ বেশি। বাংলাদেশের ইতিহাসে পণ্য আমদানির এলসি খোলার ক্ষেত্রে এমন উলøম্ফন আগে কখনো দেখা যায়নি।

ফলে অর্থমন্ত্রী স্বয়ং আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন মুদ্রা পাচারের ব্যাপারে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগও (সিপিডি) বলছে, আমদানি প্রক্রিয়ায় মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে অর্থ পাচার হচ্ছে। আমদানির আড়ালে বিদেশে অর্থ পাচার হয়ে যাচ্ছে। সাধারণত নির্বাচনের আগেই অর্থ পাচারের প্রবণতা দেখা যায়। সিপিডি সুনির্দিষ্ট করে বলছে, কটন আমদানির নামে মুদ্রা পাচারের ঘটনা ঘটছে। গত অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর প্রান্তিকে কটন আমদানির প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭৫ ভাগ। এটি একটি চিন্তার বিষয়। কারণ যে হারে কটন আমদানি হয়েছে সে হারে তা তৈরি পোশাক খাতে অবদান রাখেনি।

বাংলাদেশের আরেক বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিচার্স ইনস্টিটিউটও (পিআরআই) বলছে, দেশ থেকে প্রচুর অর্থ পাচার হচ্ছে। তার নজির ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। এই অর্থ পাচারের ঘটনাটি ঘটছে আমদানি-রপ্তানির আড়ালে, যেটি করা হয় ওভার ইনভয়েস ও আন্ডার ইনভয়েসের মাধ্যমে।

শঙ্কার কারণ হচ্ছে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে ৪ হাজার ৪১১ কোটি ৮৭ লাখ ডলারের এলসি খোলা হয়েছিল। ওই সময়ে প্রবৃদ্ধি ছিল ১৪ শতাংশের মতো। আর সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরের ১১ মাসে আমদানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪৮ শতাংশ। আমরা জানি দেশে এখন বেশ কয়েকটি বড় প্রকল্পের কাজ চলছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, পদ্মা সেতু, মেট্রো রেলসহ কয়েকটি বড় প্রকল্পের জন্য সরঞ্জাম আমদানি সাম্প্রতিক সময়ে আমদানির উলøম্ফনে ভ‚মিকা রেখেছে। এছাড়া খাদ্যসহ অন্যান্য পণ্যের আমদানিও ‘অস্বাভাবিক হারে’ বেড়েছে। মেগা প্রকল্পগুলোর কাজে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের আমদানি বাড়ায় এলসি খোলার পরিমাণ বাড়া স্বাভাবিক। কিন্তু খাদ্যসহ অন্যান্য পণ্যের এলসি খোলার পরিমাণ যে ‘অস্বাভাবিক’ হারে বেড়েছে তাতে ভোটের বছরে বিদেশে অর্থ পাচারের সন্দেহও জোরালো হয়ে উঠেছে।

টাকা পাচার নিয়ে বিশ্বব্যাপী বড় গবেষণার কাজটি করে গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই)। তাদের হিসাবে গত দশ বছরে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে ৪ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা, বা ৫ হাজার ৫৮৭ কোটি ডলার। প্রতি বছর গড়ে পাচার হয়েছে ৪৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। বর্তমান খরচ অনুযায়ী যা দিয়ে দেড়টি পদ্মা সেতু নির্মাণ করা সম্ভব।

সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে টাকা পাচার বাড়ছে। গড়ে প্রতি বছর ৪০০ কোটি থেকে দেড় হাজার কোটি টাকা পাচার হচ্ছে। গত বছরের শেষে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশি নাগরিকদের জমা টাকা প্রায় ৪ হাজার ৯০০ কোটি টাকা।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) এক জরিপে দেখা যায়, প্রবাসীরা বিদেশ থেকে দেশে যে রেমিট্যান্স পাঠায় তার ৪০ শতাংশ আসে ব্যাংকিং চ্যানেলে। বাকি ৬০ শতাংশের মধ্যে ৩০ শতাংশ আসে সরাসরি প্রবাসী বা তাদের আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমে নগদ আকারে। আর বাকি ৩০ শতাংশ আসে হুন্ডির মাধ্যমে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বিদেশ থেকে বাংলাদেশে মোট দেড় হাজার কোটি ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। হিসাব অনুযায়ী এর মধ্যে হুন্ডির মাধ্যমে এসেছে প্রায় ৪৫০ কোটি ডলার, যা স্থানীয় মুদ্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকা। এর মাধ্যমে দেশ থেকে বৈদেশিক সম্পদ পাচার হয়ে যাচ্ছে। এখন তো মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অবৈধভাবে দেশে রেমিট্যান্স নিয়ে আসা হচ্ছে।

বেশ কয়েক বছর আগে বাংলাদেশ থেকে টাকা পাচারের বিষয়ে একটি গবেষণা প্রতিবেদন তৈরি করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে উলেøখ করা হয়, ১৯৯৪ সালে ১০৬ কোটি ডলার, ১৯৯৬ সালে ১৮২ কোটি ৩০ লাখ ডলার, ১৯৯৮ সালে ১২২ কোটি ডলার, ২০০০ সালে ১১৪ কোটি ৬০ লাখ ডলার, ২০০১ সালে ১৬৭ কোটি ৯০ লাখ ডলার, ২০০২ সালে ১৪৩ কোটি ১৬ লাখ ডলার, ২০০৬ সালে ৮৯ কোটি ১০ লাখ ডলার এবং ২০০৭ সালে ১৩২ কোটি ৮০ লাখ ডলার পাচারের কথা বলা হয়েছে।

মালয়েশিয়ান সরকারের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, সে দেশের সেকেন্ড হোম প্রকল্পে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে ৪ হাজার কোটি টাকা। মালয়েশিয়ার সরকার বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে ২০০২ সালে চালু করে ‘মাই সেকেন্ড হোম’ কর্মসূচি। বর্তমানে এ তালিকায় শীর্ষে রয়েছে চীন এবং দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। তিন হাজারের বেশি বাংলাদেশি মালয়েশিয়ায় দ্বিতীয় আবাস গড়েছেন। এতে তারা বিনিয়োগ করেছেন প্রায় চার হাজার কোটি টাকা, যা বাংলাদেশ থেকে পাচার করা হয়েছে। এ তালিকায় আছেন রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও আমলা। বাংলাদেশ থেকে টাকা নিয়ে কিছু ব্যবসায়ী কেনিয়ায় বড় বড় গার্মেন্ট শিল্প স্থাপন করেছেন। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ব্রিটেন ও থাইল্যান্ডে হোটেল ব্যবসা করছেন।

স্বাভাবিকভাবে আমদানি বাড়াকে অর্থনীতিতে ইতিবাচক হিসেবেই দেখা হয়। ক্যাপিটাল মেশিনারি, শিল্পের কাঁচামাল আমদানি বাড়া মানে বিনিয়োগ বাড়া। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, এক পণ্য আমদানির নামে অন্য পণ্য আমদানি হচ্ছে। অনেক সময় শূন্য কন্টেইনারও আসছে। আবার ওভার ইনভয়েসের (আমদানি করা পণ্যের বেশি মূল্য দেখিয়ে) মাধ্যমেও অর্থ পাচার করছে অনেকে।

২০১৭-১৮ অর্থবছর শেষ হয়েছে প্রায় এক মাস হতে চলল, কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক সব শেষে প্রকাশ করেছে মে মাসের হালনাগাদ তথ্য। চলতি বছরের ১১ মাসের তথ্যে দেখা যায়, এই সময়ে এলসি খোলার পরিমাণ সবচেয়ে বেশি বেড়েছে চাল আমদানির জন্য। ২০১৭ সালে বন্যায় ফসলহানির কারণে চাল আমদানিতে শুল্ক কমিয়ে আনা হয়েছিল। আর এই সময়ে চাল আমদানির এলসি বেড়েছে ২১১০ শতাংশ। এছাড়া গমের এলসি ৩৫ শতাংশ, পেঁয়াজে ৯০ শতাংশ, জ্বালানি তেলে ৪৯ দশমিক ৫৭ শতাংশ এবং মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির এলসি ২৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ বেড়েছে। পণ্য আমদানিতে ২০১৬-১৭ অর্থবছরের ১৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির বিপরীতে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৪৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি বাড়াটা বেশ অস্বাভাবিকই মনে হচ্ছে। আমদানির এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধি নিয়েই অর্থনীতিক মহল ‘উদ্বিগ্ন’।

আমদানি বাণিজ্যের আড়ালে বিদেশে অর্থ পাচারের একটি পথ হচ্ছে ওভার ইনভয়েস দেখানো। অর্থাৎ যে দামে পণ্য কেনা হচ্ছে, তার চেয়ে বেশি দাম দেখিয়ে বাড়তি অর্থ বিদেশে পাচার হয়। আবার যে পণ্য আমদানি হওয়ার কথা, তার বদলে কম দামি পণ্য বা অন্য পণ্য আনা হয় কখনো কখনো।

আমদানি বাড়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও চাপের মুখে পড়েছে। রিজার্ভ নিয়ে এতদিন আমরা স্বস্তিদায়ক অবস্থায় ছিলাম। রিজার্ভ প্রায় ৩৪ বিলিয়ন ডলারে উঠে গিয়েছিল। কিন্তু আমদানি বাড়ায় সেটা আর থাকছে না। আকুর বিল পরিশোধের পরপরই রিজার্ভ ৩১ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে আসছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, একটি দেশের কাছে অন্তত তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর মতো বিদেশি মুদ্রার মজুদ থাকতে হয়। সেই দিকটায় এখনও আমরা স্বস্তিদায়ক অবস্থায় আছি। তবে যেভাবে আমদানি বাড়ছে তাতে রিজার্ভ কতটা চাপ সামলাতে পারবে তা নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

শঙ্কাটা এ কারণে যে, আমদানি লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়লেও রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় বাড়ছে ধীর গতিতে। রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্স যদি একই হারে বাড়ত তাহলে দুশ্চিন্তার কিছু ছিল না। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী, গত অর্থবছরে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় বেড়েছে ৫ দশমিক ৮১ শতাংশ। আর রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে প্রায় ১০ দশমিক ৩ শতাংশ, যা ৪৮ শতাংশ আমদানির তিন ভাগের এক ভাগেরও কম।

আবার সাম্প্রতিক মাসগুলোতে রপ্তানি আয়েও নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ গত বছরের মার্চ থেকে জুন সময়ে যে পণ্য আমদানি হয়েছিল, এ বছর মার্চ-জুন মাসে তা কমে গেছে। এখানেও শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে, রপ্তানি আয়ের টাকাও ঠিকমতো দেশে আসছে না। কেউ কেউ রপ্তানি করছেন কিন্তু রপ্তানি আয়ের টাকা দেশে আনছেন না। মানে অর্থ পাচার করছেন। নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশ থেকে টাকা বাইরে চলে যাচ্ছে কি না সেটা খতিয়ে দেখা উচিত। তা না হলে অস্বাভাবিকভাবে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি ও রপ্তানি আয় কমে যাওয়ার কারণে ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে বড় ধরনের চাপের মুখে পড়তে হবে। বিনষ্ট হয়ে যাবে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা।

কাওসার রহমান: নগর সম্পাদক, দৈনিক জনকণ্ঠ

সংবাদটি শেয়ার করুন

অর্থনীতি বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :