কৃষি যান্ত্রিকীকরণে বাঁচবে কৃষক

জহির রায়হান, ঢাকাটাইমস
 | প্রকাশিত : ২৫ মে ২০১৯, ১১:৩৭

কৃষকের জন্য ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হলে সরকারের উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ধান কেনা, কৃষকের চাষের খরচ কমাতে আরে বেশি যান্ত্রিকীকরণ নিশ্চিত করা, সমবায় ভিত্তিতে চাষাবাদ করার বিকল্প নেই বলে মনে করেন কৃষি বিশেষজ্ঞরা। সেই সঙ্গে চাহিদা ও উৎপাদনের সুস্পষ্ট ধারণা থাকা জরুরি বলে মনে করেন তারা।

চলতি বছর ধানের কম মূল্যের কারণে কৃষকের বিপাকে পড়ার বিষয়টি নিয়ে তুমুল আলোচনা চলছে। উৎপাদন বেশি হওয়ায় মুছে গেছে কৃষকের মুখের হাসি। কারণ, ধানের দাম অপ্রত্যাশিত পড়ে গেছে। কৃষকরা বলছেন, উৎপাদন খরচই উঠছে না।

এই সমস্যাটি এক দিনের বা কোনো এক বছরের নয়। প্রায়ই এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হয় কৃষককে। কিন্তু এর স্থায়ী সমাধানের কোনো উপায় খুঁজে এখনো বের করতে পারেনি সরকার।

যদিও কৃষি অর্থনীতিবিদ এম আসাদুজ্জামান মনে করেন, সরকারের সমন্বিত পরিকল্পনা থাকলে এই ক্ষতি থেকে কৃষককে রক্ষা করা সম্ভব।

ঢাকা টাইমসকে তিনি বলেন, ‘কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ধান কেনা তাদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার একটি উপায় হতে পারে। সরকার সরাসরি ধান কিছু কিনছে এটা সংবাদে দেখলাম। তবে তারা প্রকৃত  কৃষক কি না তা বলা মুশকিল। কৃষদের কাছে কম দামে কিনে তারা আবার বেশি দামে ধান বিক্রি করছে কি না সেটা খতিয়ে দেখতে হবে।’

তবে পশ্চিমবঙ্গ সরকার এমন একটি ব্যবস্থা করেছে যাতে কৃষক লোকসানে না পরে। সে দেশে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘কমিশন ফর এগ্রিকালচারাল ক্রপস অ্যান্ড প্রাইসেস (সিএসিপি)’ নামে একটি সংস্থা আছে যেটা কৃষিতে মিনিমাম সাপোর্ট প্রাইস (এমএসপি) বা ন্যূনতম সহায়ক মূল্য নির্ধারণ করে দেয়। সরকার এই দামে কৃষকের কাছ থেকে কৃষিপণ্য কিনবে। সরকার বর্তমানে কৃষকের কাছ থেকে ২৩ ধরনের পণ্য কিনে কৃষক যেন তার ন্যায্যমূল্য পায়। ফসল বোনার সময়ই পণ্যের দাম ঠিক করা হয় এবং তা বাজার মূল্য থেকে কিছুটা বেশি থাকে। আবার যে পরিমাণ কেনা হয়, তা বাজারে প্রভাব ফেলার মতো যথেষ্ট।

পশ্চিমবঙ্গ সরকার ধান কিনছে মোট উৎপাদনের পাঁচ ভাগের এক ভাগ আর বাংলাদেশ সরকার কিনছে মোট উৎপাদনের ২০ ভাগের এক ভাগ।

চলতি বোরো মৌসুমে পশ্চিমবঙ্গে ধান উৎপাদিত হয়েছে আড়াই কোটি টন এবং প্রাদেশিক সরকার ৫২ লক্ষ টন ধান সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে কিনছে। বাজারে প্রতি কুইন্টাল ধানের দাম ১৪৫০ থেকে ১৫০০ রুপি হলেও সরকার কিনছে ১৭৫০ রুপিতে।

আবার মিনিমাম সাপোর্ট প্রাইসের সঙ্গে প্রতি কুইন্টাল ধানে ২০ টাকা বোনাস দিচ্ছে সরকার। আবার একজন কৃষক সর্বোচ্চ ৯০ কুইন্টাল ধান দিতে পারবে।

বাংলাদেশেও ধানের সরকারি ক্রয়মূল্য বাজার মূল্যের চেয়ে বেশি। কিন্তু সরকার পরিমাণে কম কিনবে বলে আবার এখনো সেভাবে ক্রয় অভিযান শুরু না হওয়ায় বাজারে তেমন কোনো প্রভাব পড়েনি। কাগজে কলমে গত ২৫ এপ্রিল থেকে ধান কেনা শুরু হওয়ার কথা। তবে এখন পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রার ১০ ভাগের এক ভাগও কেনা হয়নি। 

এবার প্রতি কেজি ধান ২৬ টাকা ধরে মোট দেড় লাখ মেট্রিকটন টন ধান কেনা হবে সরকারি ক্রয় কেন্দ্র থেকে। আর চাল কেনা হবে ১২ লাখ টাকা কেজি দরে ১২ লাখ মেট্রিক টন। এই চালের পুরোটাই কেনা হয় চাতাল মালিকদের কাছ থেকে। ধানেরও বেশিরভাগ কেনা হয় ফরিয়াদের কাছ থেকে। তবে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে কেনার দাবি রয়েছে বহু বছরের।

তবে সরকার যে পরিমাণ ধান ও চাল কিনবে, তা বাজারে প্রভাব ফেলার মতো যথেষ্ট নয়। এবার উৎপাদন এক কোটি ৪০ লাখ মেট্রিকটন ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর মধ্যে দেড় লাখ মেট্রিকটন ধান কিনে সরকার বাজারে কতটা প্রভাব ফেলবে পারবে, এ নিয়ে প্রশ্ন আছে।

আর এই বিষয়টি নিয়ে সরকারের একটি পূর্ণাঙ্গ ও দীর্ঘমেয়াদী ব্যবস্থা থাকা দরকার বলে মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, ‘যখন সংকট হবে তখন দৌড়ঝাঁপ করবে, এভাবে তো হয় না। তাদের কোন ফরোয়ার্ড প্লানিং বলে কোনো জিনিস আছে বলে আমার মনে হয় না। এইখানে তিনটি মন্ত্রণালয় এক সঙ্গে এ হতে হবে। কৃষি ,খাদ্য আর বাণিজ্য। কৃষির কাজ উৎপাদন করা। পরের ব্যপারটা খাদ্য মন্ত্রণালয়ের। আর যদি আমদানি রপ্তানির উপরে করতে যায় তাহলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় দেখবে। তিন সংস্থার সমন্বয় অবশ্যই থাকতে হবে। কিন্তু আমরা এখন পর্যন্ত তার কোন লক্ষণ দেখেছি বলে মনে হয় না।’

‘ভবিষ্যতে কী করা যেতে পারে সেটাও দেখতে হবে। একটা করা সম্ভব কৃষকে সরকার বলবে আমি তোমাকে ঋণ দেব এত টাকা। তিন মণ ধান তুমি বিক্রি করতে চেয়েছিলে তিন হাজার টাকায়। আমি তোমাকে দুই হাজার টাকা দিলাম এটা ক্রেডিটের মতো থাকবে তুমি যখন এ ধান বিক্রি করবে তখন তুমি আমাকে এ টাকা দেবে। ধান তোমার ঘরেই থাকবে তুমি বিক্রি করে টাকা আমাকে দেবে। ধানটা অনেকটা কোল্যাটারেলের মতো থাকবে। আর তুমি যদি টাকা না দাও তাহলে ধান আমি নিয়ে যাবে।’

এটা করা কঠিন- মানছেন এই বিশেষজ্ঞ। তবে কিন্তু নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত নিলে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে এটা সম্ভব বলেও মনে করেন তিনি।

কৃষির খরচ কমানোর দিকেও নজর দিতে হবে বলে বলছেন আসাদুজ্জামান। বলেন, কৃষি যান্ত্রিকীকরণের দিকে যেতে হবে। একটি ধান কাটার বড় মেশিন দিয়ে এক দিনে একটি বড় এলাকার ধান কেটে ফেলা সম্ভব। সেভানে অনেক শ্রমিক ভাড়া করার দরকার নেই।

তবে এ ক্ষেত্রে একটি বড় সমস্যা হলো কৃষকরা ছোট ছোট জমিতে ধান চাষ করে। বড় একটি এলাকা নিয়ে সমবায় ভিত্তিতে চাষ করলে সেখানে বড় বড় যন্ত্র দিয়ে চাষ ও মাড়াই সম্ভব। আবার যান্ত্রিকীকরণ হলে পানির খরচও কমে আসবে। এক কেজি ধান উৎপাদনে তিন হাজার লিটার পানি খরচ করে বাংলাদেশের কৃষকরা। যেটা ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়ায় এটি দুই হাজার লিটারের বেশি না। কোথাও কোথাও ১২০০ থেকে ১৫০০ লিটার পানি লাগে।

বাংলাদশে রাইস এক্সর্পোর্টাস অ্যাসোসয়িশেনরে সভাপতি শাহ আলম বাবু বলেন, বেশি উৎপাদন হলে চাল রপ্তানির বিষয়টি নিয়মিত হওয়া উচিত। তিনি বলেন, ‘আজ বললাম কাল রপ্তানি করলাম বিষয়টা এমন না। রপ্তানির ধারাবাহিকতা থাকতে হয়। আমাদের দেশে সুগন্ধি ছাড়া অন্য চাল রপ্তানির সুযোগ দেয়া হয়নি। সরকারে হয়তো বিশেষ কোনো লক্ষ্য রয়েছে এতে। কিন্তু অনেক কোম্পানি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করে চাল রপ্তানি করে।

‘রপ্তানি করতে হলে ভারত, থাইল্যান্ড, পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের প্রতিযোগিতা করতে হবে। এজন্য জাহাজিকরণ সুবিধাসহ সরকারকে  দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিতে হবে।

 

সরকার যা ভাবছে

ধানের দাম পড়ে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে কৃষিমন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক কথা বলেছেন। তিনি সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ধান কেনার একটি সমস্যার কথা বলেছেন। বলেন, ‘একজন কৃষক চাল নিয়ে আসবেন ভ্যানে করে। আসার পর দেখা যাবে, চালে আর্দ্রতা সঠিক মাত্রায় নেই। ফলে কৃষক আরো নিরুৎসাহিত হবেন।’

‘উন্নত বিশ্বের কিছু দেশ যেমন জাপান, কোরিয়া কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের সবটাই কিনে নেয়। পরে আবার সেটা কম দামে বিক্রি করে। জাপানের জিডিপিতে কৃষির অবদান দুই ভাগ কিন্তু ভর্তুকি আরো বেশি। তবে আমরা কৃষি উপকরণে সহায়তা আরো বাড়ানোর পক্ষে। এটা করা গেলে সব ধরনের কৃষকের কাছে সরকারের সুবিধা পৌঁছা সম্ভব হবে। এর মাধ্যমে উৎপাদন খরচ কমানো যাবে। ফলে কম মূল্যে বিক্রির পরও কৃষকের মুনাফা কমবে না।

এবার সংকটের যেসব কারণ

২০১৭ সালে হাওর এবং উত্তরাঞ্চলে বন্যায় ফসলহানির পর ধানের দাম বেড়ে যায়। গত বছর কৃষক উৎপাদনের ক্ষতি কাটিয়ে উঠে অনেকটাই। আর সরবরাহ বাড়ার পর ২০১৭ সালের তুলনায় দাম কিছুটা কম হলেও কৃষক বেশ ভালো মুনাফা করে। তবে আগের বছর বিনা শুল্কে ব্যাপকহারে চাল আমদানির কারণে উচ্চমূল্যে ধান কিনে চাতাল কল মালিকদের বেশ লোকসান হয়।

এর মধ্যে শূন্য সুবিধা তুলে নিয়ে ২৮ শতাংশ কর আবার আরোপ করে। তবে এরপরও চালের আমদানি থামেনি। বেশি দামের ধান কিনে চাল করে চাতাল মালিকরা আমদানি করা চালের দামের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় কাটিয়ে উঠতে পারেনি। আবার তাদের গুদামেও বিপুল পরিমাণ ধান এবং চাল রয়ে গেছে। 

চলতি বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসলহানি হয়নি। এতে উৎপাদন হয়েছে ব্যাপক। কিন্তু চাতাল কল মালিকরা এখনো সেভাবে ধান কেনা শুরু করেনি। এর একটি কারণ, গত বছরের রয়ে যাওয়া মজুদ। দ্বিতীয়ত এই মুহূর্তে ধানে আদ্রতা রয়ে গেছে। ফলে শুকালে ওজনে কমে যাবে। তাই তারাও অপেক্ষায়।

কিন্তু সামনে ঈদ। কৃষকের পক্ষে ধান রেখে দেওয়া কঠিন। বাজারে ক্রেতা কম থাকায় প্রভাব দামে। মণপ্রতি ৫০০ বা তার চেয়ে কম দামে বিক্রি হচ্ছে কোথাও কোথাও। কৃষকের দুর্দশায় পাশে থাকার ঘোষণা দিয়ে বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তি তাদের ধান কেটে দিচ্ছেন বিনামূল্যে। যাদের ধান কেটে দেওয়া হচ্ছে তাদের খরচ কিছুটা কমছে বটে, কিন্তু বাকিদেরকে উচ্চ মজুরি দিয়েই ধান কাটতে হচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে সরকার অবশ্য চালের আমদানি শুল্ক দ্বিগুণ করে আমদানি নিরুৎসাহিত করেছে। এতে চাল উৎপাদকরা স্থানীয় বাজার থেকে ধান কিনে চাল তৈরি করে আমদানি করা চালের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকবে। এতে ধানের চাহিদা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। আবার চাল রপ্তানির সুযোগ দেওয়ার চিন্তাও করা হচ্ছে।

নানা সময় যে বছর উৎপাদন বেশি হয় সে বছর ধানের দাম পড়ে যায় এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয় কৃষক। এ ক্ষেত্রে বছরে চাহিদা কতো, উৎপাদন কত হলে চাহিদা পূরণ হবে সে বিষয়ে সুষ্পষ্ট পরিসংখ্যান নেই। আবার প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলে উৎপাদন কম হতে পারে, এই আশঙ্কায় চাষ নিরুৎসাহিতও করা হয় না।

ঢাকাটাইমস/২৫মে/জেআর/এমআর

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :