স্পষ্ট হয়ে গেল কেউ পার পাবে না

নজরুল ইসলাম
 | প্রকাশিত : ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১১:২০

ছাত্রলীগের শোভন-রাব্বানীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পর বুধবার অস্ত্রসহ যুবলীগের ঢাকা দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে গ্রেপ্তারের ঘটনা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শুদ্ধি অভিযানের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখছেন আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতারা। তারা বলছেন, স্পষ্ট হয়ে গেল কেউ অন্যায় করে পার পাবে না। অবৈধ কর্মকাণ্ডে দল বা প্রশাসনের যারাই জড়িত থাকুক, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত শনিবার আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় যুবলীগ নেতাদের নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন বলে জানান কয়েকজন নেতা। প্রধানমন্ত্রী যুবলীগের কয়েকজন নেতাকে ইঙ্গিত করে তারা ‘শোভন-রাব্বানীর চেয়েও খারাপ’ বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, যুবলীগের ঢাকা মহানগরের একজন নেতা যা ইচ্ছে করে বেড়াচ্ছে, চাঁদাবাজি করছে। আরেকজন এখন দিনের বেলায় প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে চলেন। এসব বন্ধ করতে হবে। তা না হলে, যেভাবে জঙ্গি দমন করা হয়েছে, একইভাবে তাদেরও দমন করা হবে।

খালেদ গ্রেপ্তার হওয়ার পর যুবলীগ ঢাকা দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট বুধবার রাতে হাজারো নেতাকর্মী নিয়ে সংগঠনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে যান। অনেকে বলছেন, তিনি গ্রেপ্তার এড়াতে সেখানে অবস্থান নেন। প্রধানমন্ত্রী যাদের নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন তাতে স¤্রাটের প্রতিও ইঙ্গিত ছিল।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে যে শুদ্ধি অভিযান চলছে তা আগামী ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগের ২১তম জাতীয় কাউন্সিলের আগ পর্যন্ত চলবে বলে জানান জ্যেষ্ঠ নেতারা। তারা বলছেন, এই অভিযানে দুর্নীতিবাজ কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।

গতকাল ঢাকা টাইমসের সঙ্গে একান্ত আলাপে আওয়ামী লীগের নেতারা জানান, যুবলীগের নেতার বিরুদ্ধে অভিযান অন্যান্য সহযোগী সংগঠনের দুর্নীতিগ্রস্ত নেতাদের জন্য সতর্কবার্তা।

আওয়ামী লীগে শুদ্ধি অভিযান চলছে- এটা নিশ্চিত করে দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন এটা ডিসেম্বর পর্যন্ত চলবে। কেউ ছাড় পাবে না। দলের যারাই দুর্নীতি করবে, তাদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এখন যেসব চলছে, সেটা তারই ধারাবাহিকতা।’

মাহবুবউল আলম হানিফ রাজধানীর ফকিরাপুলের ইয়ংমেনস ক্লাবে অবৈধভাবে ক্যাসিনো চালানোর অভিযোগে যুবলীগের নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার গ্রেপ্তারের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তার মতে, এ বিষয়ে কথা বলবেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল ও দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।

হানিফ বলেন, ‘যাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গ্রেপ্তার করছে এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কথা বলবেন। আর দলীয় দিক থেকে দলের সাধারণ সম্পাদক কথা বলবেন।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল গতকাল বলেন, অবৈধ ব্যবসার সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক না কেন, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তা রাজনৈতিক ব্যক্তি ও প্রশাসনের লোক যেই জড়িত থাকুক।

রাজধানীসহ দেশের কয়েকটি বিভাগীয় শহরে ৬০টির মতো ক্যাসিনো চলে বলে খোঁজ পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এগুলোর বেশির ভাগ নিয়ন্ত্রণ করছেন ক্ষমতাসীন দল ও সহযোগী সংগঠনের  নেতারা- এমন খবর এসেছে গণমাধ্যমে। থানাসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এ ব্যাপারে জানত বলে দাবি করেছেন গ্রেপ্তার যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ।

সদ্য যোগ দেওয়া ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার (ডিএমপি) মো. শফিকুল ইসলাম জানান, ক্যাসিনো বা এ ধরনের অবৈধ ব্যবসার সঙ্গে যত প্রভাবশালীই জড়িত থাকুক না কেন, তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে। ইতিমধ্যে কিছু এলাকার তালিকা তৈরি করা হয়েছে।  

দলে শুদ্ধি অভিযানকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিম। সাবেক এই স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে এই শুদ্ধি অভিযান চলছে। এটা দল ও সুশাসনের জন্য ভালো দিক।’

যুবলীগ নেতার ক্যাসিনোতে অভিযান ও তাকে গুলশানের বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন সংগঠনের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন আওয়ামী লীগ নেতা নূহ-উল-আলম লেনিন। প্রধানমন্ত্রী শুদ্ধি অভিযানের যে নির্দেশ দিয়েছেন, ক্যাসিনো অভিযান তারই ধারাবাহিকতা বলে মন্তব্য করে লেনিন বলেন, ‘আওয়ামী লীগসহ সহযোগী সংগঠনগুলোর জন্য এটা একটা সতর্কবার্তা। আসলে সবকিছুরই একটা সহনশীল পর্যায় থাকে। এখন এটা স্পষ্ট হয়ে গেল কেউ অন্যায় করে পার পাবে না।’

এই অভিযান নিয়ে যুবলীগের সভাপতির বক্তব্য প্রসঙ্গে লেনিন বলেন, ‘এসব বিষয়ে কে কী মনে করল সেটা বড় কথা নয়। আমি মনে করি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে অভিযান চলছে। এটা বিলম্ব হলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এটা শুরু করেছে।’

গতকাল ঢাকার ফকিরাপুল ইয়ংমেনস ক্লাবে অবৈধভাবে ক্যাসিনো চালানোর অভিযোগে সেখানে অভিযান চালায় র‌্যাব। একই সঙ্গে গুলশান ২ নম্বরের ৫৯ নম্বর সড়কের বাসায় অভিযান চালিয়ে  যুবলীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া গ্রেপ্তার করা হয়। সেখান থেকে একটি লাইসেন্সবিহীন, দুটি লাইসেন্সের শর্তভঙ্গ করে রাখা আগ্নেয়াস্ত্র; ৪০০ ইয়াবা, ১০০০, ৫০০ ও ৫০ টাকার কয়েক বান্ডিলে ১০ লাখ ৩৪ হাজার টাকা, ৫-৬ লাখ টাকার সমপরিমাণ ডলার জব্দ করা হয়।

যুবলীগ নেতার ক্যাসিনোতে অভিযান ও তাকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় সেদিন রাতেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেন যুবলীগের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘৬০টি ক্যাসিনো আছে; আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আপনারা কি এতদিন আঙুল চুষছিলেন? যে ৬০ জায়গায় এই ক্যাসিনো, সেই ৬০ জায়গার থানাকে অ্যারেস্ট করা হোক। সেই ৬০ থানার যে র‌্যাব ছিল, তাদের অ্যারেস্ট করা হোক।’ এই অভিযান আওয়ামী লীগের ভাবমূর্তি নষ্টের জন্য করা হয়েছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘আমাকে আগে জানালে আমি ব্যবস্থা নিতে পারতাম।’

যুবলীগ চেয়ারম্যানের এই বক্তব্য তার ব্যক্তিগত মত বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘এটা ওনার নিজস্ব মন্তব্য। আমাদের নজরে যেগুলো আসছে আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি। আরও যারা চিন্তা-ভাবনা করেছে আমরা অ্যাকশনে যাওয়ার পর বন্ধ করেছে। তদন্ত ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতেই অভিযান হয়েছে।’

বুধবার সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত ঢাকার চারটি ক্যাসিনোতে অভিযান চালায় র‌্যাব। প্রথমে মতিঝিলের ইয়াংমেন্স ক্লাব থেকে ২৪ লাখ ২৯ হাজার টাকাসহ ১৪২ জনকে আটক করা হয়। ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাবে ১০ লাখ ২৭ হাজার টাকা, ২০ হাজার ৫০০ জাল টাকা জব্দ করা হয়। গুলিস্তানের মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্লাবে ৪ লাখ ৯৮ হাজার ৬০০ টাকাসহ ক্যাসিনো পরিচালনা ও খেলার অভিযোগে ৪০ জনকে আটক করা হয়। বনানীর আহম্মেদ টাওয়ারের গোল্ডেন ঢাকা নামের ক্যাসিনোতে কাউকে না পেয়ে সেটি সিলগালা করা হয়।

(ঢাকাটাইমস/১৯সেপ্টেম্বর/এনআই/মোআ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

রাজনীতি বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :