২০ দিনে কুমিল্লা হারাল দুই জনপ্রিয় রাজনীতিক

কুমিল্লা প্রতিনিধি, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ১৬ এপ্রিল ২০২১, ২০:৩৬ | প্রকাশিত : ১৬ এপ্রিল ২০২১, ২০:৩২

২০ দিনের ব্যবধানে দুজন জনপ্রিয় ও বর্ষীয়ান রাজনীতিককে হারাল কুমিল্লার মানুষ। এই দুই নেতার মৃত্যুতে কুমিল্লার রাজনীতে যে ক্ষতি হয়েছে, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। স্থানীয় নেতাদের মতে, শুধু বুড়িচং-ব্রাহ্মণপাড়া নয়, গোটা কুমিল্লার রাজনীতিতে ভদ্র ও স্বচ্ছ রাজনীতির প্রতিভূ ছিলেন দুই বীর মুক্তিযোদ্ধা আওয়ামী লীগের আবদুল মতিন খসরু এবং বিএনপির মোহাম্মদ ইউনুস।

মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের হয়ে লড়াই করা বর্ষীয়ান এই দুই রাজনীতিবিদের মধ্যে দেশের বিশিষ্ট আইনজীবী, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক আইনমন্ত্রী কুমিল্লার বুড়িচং-ব্রাহ্মণপাড়ার কৃতী সন্তান আবদুল মতিন খসরু মারা যাওয়াটা ছিল আকস্মিক আঘাত। কুমিল্লার রাজনৈতিক নেতাদের দাবি, আবদুল মতিন খসরুর মৃত্যুতে কুমিল্লার রাজনীতিতে তারা এক সম্পদ হারিয়েছেন।

গত ১৪ এপ্রিল বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে সংসদ সদস্য আবদুল মতিন খসরু ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। আগের দিন থেকে এই বর্ষীয়ান নেতা লাইফ সাপোর্টে ছিলেন।

এর আগে গত ২৭ মার্চ এই আসনেরই চারবারের সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউনুস ঢাকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। অধ্যাপক ইউনুস বেশ কিছুদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগছিলেন।

৭১ বছর বয়সে মারা যাওয়া আবদুল মতিন খসরু সম্প্রতি অনুষ্ঠিত সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে সভাপতি নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগের এই প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক আইনমন্ত্রী কুমিল্লা-৫ (বুড়িচং-ব্রাহ্মণপাড়ার) আসনের পাঁচবারের সংসদ সদস্য ছিলেন। ১৯৭১ সালে সক্রিয়ভাবে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন।

১৯৯১ সালে নৌকা প্রতীক নিয়ে কুমিল্লার বুড়িচং-ব্রাহ্মণপাড়া থেকে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তারপর ১৯৯৬ সালে টানা দ্বিতীযবারের মতো এবং ২০০৮, ২০১৪ ও ২০১৯ সালে টানা তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এর মধ্যে সপ্তম সংসদে (১৯৯৬-২০০১) আইনমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। একাদশ জাতীয় সংসদের আইন বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ছিলেন আবদুল মতিন খসরু।

২০১৭ সালে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী ফোরাম সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হন আবদুল মতিন খসরু। ২০১৯ সালেও তাকে একই পদে বহাল রাখা হয়। এর আগে তিনি আওয়ামী লীগের আইনবিষয়ক সম্পাদক ছিলেন।

শুধু রাজনীতে নয়, আইন অঙ্গনেও তিনি জনপ্রিয় ছিলেন কুমিল্লাসহ সারা বাংলাদেশে। আইনজীবীদের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ বার কাউন্সিলে তিনি কয়েকবার সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। সর্বশেষ ২০২১-২০২২ সেশনে তিনি সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন।

আবদুল মতিন খসরু কুমিল্লা জেলার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার মাধবপুর ইউনিয়নের মিরপুর গ্রামে ১৯৫০ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। এলএলবি এবং বিকম ডিগ্রি অর্জনের পর ১৯৭৮ সালে কুমিল্লা জজকোর্টে যোগদান করেন এবং ১৯৮২ সালের ১৩ জুলাই হাইকোর্ট বিভাগে আইনজীবী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন।

বর্ষীয়ান এই রাজনীতিবিদের পরিবারসূত্রে জানা যায়, গত ১০ ও ১১ মার্চ নির্বাচনের পর ১৫ মার্চ করোনা টেস্ট করাতে দেন তিনি। ১৬ মার্চ সকালে রিপোর্ট পজিটিভ পাওয়ার পর হাসপাতালে ভর্তি হন। পরে তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। পরে শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলে তাকে কেবিনে নেওয়া হয়। কিন্তু পরবর্তীতে অবনতি হওয়ায় তাকে ফের আইসিইউতে নেওয়া হয়। গত ১৩ এপ্রিল তাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়।

১৪ এপ্রিল মারা যান তিনি। গতকাল সকাল সাড়ে আটটায় তার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয় ঢাকার বকশিবাজার আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে। সকাল ১০টায় বাংলাদেশ সপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে দ্বিতীয জানাজা শেষে কুমিল্লার বুড়িচং কলেজ মাঠে বাদ জোহর তৃতীয়, বিকাল ৪টায় ব্রাহ্মণপাড়া হাই স্কুল মাঠে চতুর্থ এবং বাদ আসর গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণপাড়া মিরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে পঞ্চম জানাজা শেষে তার মরদেহ দাফন করা হয়।

সাংসদ আবদুর মতিন খসরুর মৃত্যুর বিশ দিন আগে ২৭ মার্চ এই সংসদীয় আসনের আরেক বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউনুস ৭৭ বছর বয়সে মারা যান। বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগছিলেন তিনি।

চারবারের এই সংসদ সদস্য ১৯৭৩ সালে প্রথমবারের মতো আওয়ামী লীগ থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৮৬ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে, ১৯৮৮ সালে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে কুমিল্লা-৫ আসন থেকে চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হন। জাতীয় পার্টি ছেড়ে অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউনুস বিএনপিতে যোগ দেন। ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চতুর্থবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এর আগে ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় নির্বাচনে জাতীয় পার্টি এবং সর্বশেষ ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির হয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনি পরাজিত হন।

মোহাম্মদ ইউনুস মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ছিলেন। তিনি ৬ দফা আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণসহ তৎকালীন সব রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।

মোহাম্মদ ইউনুস ১৯৪৪ সালের ৪ জুলাই কুমিল্লা জেলার বুড়িচং উপজেলার পীরযাত্রাপুর ইউনিয়নের গোবিনাথ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মো. মোস্তাক মিয়া বলেন, বুড়িচং-ব্রাহ্মণপাড়ার এমপি বিশিষ্ট আইজীবী আবদুল মতিন খসরু ও বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউনুস কুমিল্লার রাজনীতিতে ভালো মানুষ ছিলেন। দুজনই জনপ্রিয় ছিলেন। তাদের মৃত্যুতে স্থানীয রাজনীতিতে বড় শূন্যতা তৈরি হবে। তবে একদিন তাদের জায়গায় নতুন নেতৃত্ব আসবে। যেই আসুক তাদের মতো যেন মানুষের সেবায় এগিয়ে আসতে পারে সেই কামনা করি।’

কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি জসিম উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘আমি আবদুল মতিন খসরু এমপির বিকল্প কোনো রাজনীতিবিদ দেখি না। ভদ্র ও স্বচ্ছ রাজনীতিবিদ হিসেবে আবদুল মতিন খসরু ভাই শুধু কুমিল্লায় নয় সারা দেশে পরিচিত ছিলেন। তিনি কখনো গ্রুপ, দ্বন্দ্বের রাজনীতি করেননি। বিনয়ী এই রাজনীতিবিদের মৃত্যুতে আমরা একটি সম্পদ হারিয়েছি।’

জসিম উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী আরও বলেন, ‘কয়েক দিন আগে এই আসনে আরও একজন রাজনীতিবিদ হারিয়েছি। তিনি আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি ছিলেন। পরবর্তীতে জাতীয় পার্টি ও বিএনপির এমপি ছিলেন। অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউনুস সাহেবও অনেক ভালো মানুষ ছিলেন।’

কুমিল্লার দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক রেলমন্ত্রী মুজিবুর হক এমপি বলেন, ‘কুমিল্লার রাজনীতিতে আমাদের যে ক্ষতি হয়ে গেল আবদুল মতিন খসরু এমপির মৃত্যুতে এটা অপূরণীয় ক্ষতি। তিনি ছিলেন সব দিক দিয়ে অত্যন্ত জ্ঞানের অধিকারী। সারা জীবন তিনি আওয়ামী লীগের নেতা হিসেবে মানুষের সেবা করে গেছেন। কুমিল্লা জেলা আওয়ামী লীগ তথা সমগ্র দেশে খসরু ভাইয়ের জনপ্রিয়তা ছিল। আল্লাহর কাছে খসরু ভাইয়ের আত্মার মাগফেরাত কামনা করি।’

(ঢাকাটাইমস/১৬এপ্রিল/মোআ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

রাজনীতি বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :