কীভাবে এলো ঐতিহ্যবাহী কাচ্চি বিরিয়ানি?

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ২৭ এপ্রিল ২০২১, ১৬:১৪ | প্রকাশিত : ২৭ এপ্রিল ২০২১, ১৩:৪৪

কাচ্চি বিরিয়ানির কথা শুনলে জিভে জল চলে আসবে না কেন? বিয়ে-শাদির মতো গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান হোক কিংবা নিছক কোনো আনন্দ আয়োজন। বাঙালির কাছে কাচ্চি বিরিয়ানির কদর যেন অন্যরকম। আর এই কাচ্চি যদি হয় একদম পুরান ঢাকার আদি ও আসল স্বাদের, তাহলে তো সোনায় সোহাগা! পুরান ঢাকার স্থানীয়দের মতো সকালবেলার নাস্তা থেকে শুরু করে দিনের যেকোনো বেলায় কাচ্চি বিরিয়ানি খাওয়ার সুযোগ সবার না থাকলেও, ঢাকায় এলে অন্তত খাওয়ার চেষ্টা করেন অনেকেই। অনেকে আবার নিজেরাই রান্না করে খাওয়ার চেষ্টা করেন। 'কাচ্চি 'বিরিয়ানির মতো এই লোভনীয় খাবারটি কীভাবে এলো ! চলুন জেনে নেওয়া যাক ঐতিহ্যবাহী কাচ্চির ইতিহাস।

কাচ্চির নামকরণ

বিরিয়ানি শব্দটি এসেছে ফারসি শব্দ ‘বিরিয়ান’ এবং ‘বিরিঞ্জি' থেকে। ‘বিরিয়ান’ অর্থ রান্নার আগে ভেজে নেওয়া এবং ‘বিরিঞ্জি’ মানে চাল। বিরিয়ানি রান্না করার আগে সুগন্ধি চাল ঘি দিয়ে ভেজে নিতে হয়, সেজন্যই এই নামকরণ।

আর ‘কাচ্চি’ শব্দটির উৎপত্তি উর্দু ‘কাচ্চা' শব্দ থেকে। বাংলায় ‘কাঁচা'-র প্রতিশব্দ ‘কাচ্চা'। কাচ্চি বিরিয়ানিতে সেদ্ধ করা ছাড়াই কাঁচা মাংস সুগন্ধি চালের সাথে মিশিয়ে রান্না করা হয়। হিন্দি এবং উর্দুতেও এই মোগলাই খাবারটি ‘কাচ্চি বিরিয়ানি’ নামেই পরিচিত। কাচ্চি বিরিয়ানিতে টক দই এবং বিভিন্ন মশলা দিয়ে মাখানো খাসির মাংসের উপর সুগন্ধি চাল ও আলুর আস্তরণ দেওয়া হয়। তারপর যে হাঁড়িতে রান্না করা হয় তাতে আটা বা ময়দার ডোর মাধ্যমে ঢাকনা এমনভাবে আটকে দেওয়া হয় যেন ভেতরে বাতাস ঢুকতে না পারে। রান্না করার এই পদ্ধতির নাম ‘দম পোক্ত'। আর কাঁচা মাংস দিয়ে দমে রান্না করা হয় বলেই এর নাম ‘কাচ্চি বিরিয়ানি’।

কাচ্চি বিরিয়ানির ইতিহাস

তাজিকিস্তান এবং উজবেকিস্তানের চাঘতাই জাতির মাধ্যমেই এই খাবারের প্রচলন শুরু। শীতপ্রধান এসব অঞ্চলের বাসিন্দাদের লাল মাংস, বিশেষ করে ভেড়ার মাংস বেশ পছন্দের। লাল মাংসের সাথে চাল ও বিভিন্ন উপাদান, যেমন- মাখন, গোলমরিচ, লবণ, এলাচ এবং স্থানীয় মশলা জয়ফল ব্যবহার করে তারা একটি বিশেষ খাবার প্রস্তুত করতে শেখে। আর এভাবেই যাত্রা শুরু কাচ্চি বিরিয়ানির। ধারণা করা হয়, ১৩৯৮ সালে ভারতবর্ষে তুর্কী-মোঙ্গল সেনাপতি তৈমুর লংয়ের আগমনের সাথে সাথে এই বিরিয়ানিরও আগমন ঘটে। তৈমুরের সেনাবাহিনীর জন্য পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করার তাগিদে চাল, বিভিন্ন মসলা এবং মাংস দিয়একটি হাড়িতে ভর্তি করা হতো। তারপর গনগনে গরম একটা গর্তে হাঁড়িটি চাপা দিয়ে দমে রান্না করা হতো এই খাবার।

ইতিহাসের পাতায় ভারতবর্ষে বিরিয়ানির আগমনের পেছনে যেসকল গল্প রয়েছে সেগুলোর মধ্যে মুঘল সম্রাজ্ঞী মমতাজ মহলের গল্পটিই সবচেয়ে পরিচিত। শোনা যায় যে, একবার সম্রাজ্ঞী ব্যারাকে গিয়ে সৈন্যদের শোচনীয় অবস্থা দেখতে পান। তাদের দুর্বল ও ভগ্ন স্বাস্থ্য মমতাজকে চিন্তিত করে তোলে। তিনি সৈন্যদের জন্য নিয়োজিত বাবুর্চিকে ডেকে চাল ও মাংস দিয়ে এমন একটি খাবার প্রস্তুতের নির্দেশ দিলেন, যা তাদের স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটাবে। নির্দেশ অনুসারে একটি বিশাল হাঁড়িতে চাল, মাংস এবং হরেক রকমের মসলা দিয়ে অল্প আঁচে ও দমে কয়েক ঘণ্টা রান্না করে তৈরি হয় একটি বিশেষ খাবার, তথা বিরিয়ানি।

ঢাকাইয়া কাচ্চি বিরিয়ানি

বর্তমানে ঢাকার বিখ্যাত ও ঐতিহ্যবাহী খাবারের তালিকার অন্তর্ভুক্ত ‘ঢাকাইয়া কাচ্চি’। ১৯৩৯ সালে ঢাকায় কাচ্চি বিরিয়ানির যাত্রা শুরু। মাত্র এক হাঁড়ি বিরিয়ানি নিয়ে শুরু হওয়া ব্যবসা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এর অতুলনীয় স্বাদ এবং ভালো মানের কারণে প্রসারিত হয়। বর্তমানে পুরান ঢাকায় গেলেই দেখা মিলবে কাচ্চি বিরিয়ানির সারি সারি দোকান। প্রতিটি দোকানের বিরিয়ানিতেই কোনো না কোনো বিশেষত্ব রয়েছে। কোথাও বিরিয়ানিতে ঘি বা মাখনের পরিবর্তে ব্যবহৃত হয় শুধুই সরিষার তেল, আবার কোথাও খাসির বদলে গরুর মাংস দিয়ে বানানো হয় এই কাচ্চি বিরিয়ানি।

সকালে-দুপুরে-রাতে সর্বক্ষণই জমজমাট পুরান ঢাকার কাচ্চি বিরিয়ানির দোকানগুলো। আসল কাচ্চির স্বাদ নিতে ঢাকার বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ ছুটে আসে এখানে। প্রায় ৪০০ বছর ধরে বাংলায় রাজত্ব করা মুঘল খাদ্য ভাণ্ডারের এই সুস্বাদু খাবারটির ব্যবসায়িক বিশাল বাজার দেখতে এবং এর অতুলনীয় স্বাদ উপভোগ করতে আপনিও ঘুরে আসতে পারেন পুরান ঢাকায়।

ঢাকাটাইমস/২৭এপ্রিল/এসকেএস

সংবাদটি শেয়ার করুন

ফিচার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :