আইইউবি সেরা, নর্থসাউথ-ব্র্যাকের অবস্থান কত?

সৈয়দ ঋয়াদ, ঢাকটাইমস
| আপডেট : ০৫ মে ২০২১, ১১:২৬ | প্রকাশিত : ০৫ মে ২০২১, ০৯:৪৭

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার সার্বিক মান নিয়ে গবেষণা করা স্পেনভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা সিমাগো ইনস্টিটিউট এবং স্কপাস সম্প্রতি তাদের ২০২১ সালের প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাতে দেখা যায়, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম এবং বেসরকারি ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ (আইইউবি) দশম স্থান অর্জন করে। তবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে সবার শীর্ষে আইইউবি।

ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটির প্রথম হওয়ার মধ্য দিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যলয়গুলোর মধ্যে বিভিন্ন সূচক ও পরিসংখ্যানে এক নম্বরে থাকা নর্থ সাউথ, ব্র্যাক, কিংবা বেসরকারিভাবে প্রতিষ্ঠিত দেশের প্রথম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় আহসান উল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থানই বা কোথায়? এ ছাড়া সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোই বা কেমন করছে শিক্ষাক্ষেত্রে?

গবেষণা, উদ্ভাবন এবং সামাজিক প্রভাব- এই তিনটি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে সিমাগো ইনস্টিটিউটের করা র‌্যাংকিংয়ে দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে প্রথম স্থান অর্জন করে অনেকটাই তাক লাগিয়েছে ইনডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি। র‌্যাংকিংয়ে শীর্ষ আটাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ১০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও একটি আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় জায়গা পেয়েছে।

সিমাগো ও স্কপাসের করা ২০২১ সালের বৈশ্বিক র‌্যাংকিং তালিকায় প্রথম ৫০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বাংলাদেশের সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়েরই স্থান হয়নি। তবে ওই তালিকায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জায়গা হয়েছে ৫৪৮তম, আর প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জায়গা হয়েছে ৫৫৫তম স্থানে।

দেশের সেরা ২৮ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় ১১টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম থাকার বিষয়টিকে অভূতপূর্ব বলে আখ্যা দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। তিনি বলেন,। ‘এই রিপোর্ট থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট হলো, আমাদের দেশের কিছু বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয় ভালো করছে। এর পেছনে রয়েছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সদিচ্ছা। বেসরকারি আর সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সমন্বিতভাবে ভাল করলেই আমাদের শিক্ষার সার্বিক মান এগিয়ে যাবে।’

দেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা না হওয়ার বা আন্তর্জাতিকভাবে অবস্থান তৈরি করতে ব্যর্থ হওয়ার কারণ হিসেবে গবেষণা ও শিক্ষা খাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ না থাকাকে দায়ী করেন সাবেক এই উপাচার্য, ‘আমাদের শিক্ষা খাতেই বরাদ্দ কম। আর গবেষণা খাতে বরাদ্ধ নেই বললেই চলে। গবেষণার জন্য যে ধরণের বরাদ্দ ও সুযোগ-সুবিধা থাকা প্রয়োজন তার অনেক কিছু নেই। তাই শিক্ষার যে বৈশ্বিক র‌্যাংকিং সেখানে আমরা ভাল অবস্থানে নেই।’

সিমাগোর করা দেশের সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমন্বিত র‌্যাংকিংয়ে দেখা যায়, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটির পরেই ১২তম অবস্থানে রয়েছে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি, আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে তাদের অবস্থান দ্বিতীয়। আহসান উল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এই তালিকায় রয়েছে ১৪তম স্থানে, আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে এর অবস্থান দ্বিতীয়। সমন্বিত র‌্যাংকিং তালিকার ২৩তম অবস্থানে রয়েছে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে এটি রয়েছে অষ্টম অবস্থানে।

উচ্চশিক্ষা বিষয়ে গবেষকদের মতে, এটি মূলত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে গবেষণা করা হয়েছে। একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কতজন চাকরি পেল, কিংবা কত জন ক্যাডার সার্ভিসে প্রবেশ করল সেসব নয়। এসব র‌্যাংকিং করা হয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গবেষণার ওপর। গবেষণার অভাবেই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্তর্জাতিকভাবে ভালো অবস্থানে নেই বলে মনে করছেন তারা।

ইনডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটির এই সাফল্যের বিষয়ে ঢাকা টাইমসের সঙ্গে কথা বলেছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির উপ-উপাচার্য্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খান। তিনি বলেন, ‘শিক্ষকদের রিসার্চের প্রবণতা তুলনামূলকভাবে বাড়ানোর চেষ্টা করেছি আমরা। আমাদের দেশে বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয় টিচিং বেইসড। গবেষণাটা অনেক ক্ষেত্রে অবেহেলিত থেকে যায়। এই ক্ষেত্রে গবেষণাটাকে আলাদাভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।’

অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খান আরও বলেন, শিক্ষকতার পাশাপাশি গবেষণাকে গুরুত্ব দিতে হবে, এটা হলো প্রথম এবং মুূখ্য বিষয়। আমাদের এসব গবেষণায় কিছু বিষয় প্রায়োগিক ক্ষেত্রে কাজে লাগছে। সরকারে দেশের সার্বিক উন্নয়নে ডেল্টা প্ল্যান হাতে নিয়েছে। আমাদের শিক্ষার মান নিয়ে এই ধরনের বড় পরিকল্পনা করতে হবে। এই কাজগুলো ঠিকঠাক হলেই এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। আমাদের গোটা ত্রিশেক ভালো কাজ হয়েছে স্টাডি ক্ষেত্রে, যেগুলো সত্যিকার অর্থেই ভালো ফল দিয়েছে।’

এই ধরনের উন্নয়ন ও উত্তরণের পথ সুগম করতে সবার আন্তঃসম্পর্কের প্রতি জোর দেন অধ্যাপক নিয়াজ খান। বলেন, ‘প্রতিযোগিতা যেন আমাদের বিচ্ছিন্ন না করে ফেলে। যারা যেখানে ভালো কাজ করছে, আমরা সব সময় চাইছি অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে। কারণ এই সময়ে এসে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ই এককভাবে সব ধরনের বিশেষায়ণ করতে পারবে না। আমাদের মূল শক্তি হবে যে যেটা ভালো করছে সে তার হাত বাড়িয়ে দেবে।’

এ বছরের র‌্যাংকিংয়ে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান নিয়ে ইনডিপেন্ডেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খান বলেন, ‘আমি খুশি হয়েছি একটি কারণে, আমাদের প্রচলিত ধারণা থেকে বেরিয়ে গিয়ে গাজীপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম হয়েছে। এর প্রধান কারণ কিন্তু গবেষণা। কৃষিক্ষেত্রে তাদের গবেষণা ক্ষেত্রে তাদের এগিয়ে নিয়েছে। আর যেটা খুব দরকার সেটা হলো আমরা যেন আমাদের কাজগুলো সমাজে তুলে ধরতে পারি। এই জন্য একটা সুস্থ প্রতিযোগিতা দরকার।’

২০০৯ সাল থেকে শিক্ষা, গবেষণা, স্বাস্থ্য, গণিত, প্রকৌশল, পরিবেশসহ মোট ২০টি সেক্টরের ওপর র‌্যাংকিং নির্ধারণ করে আসছে প্রতিষ্ঠানটি। স্কপাস ডাটাবেইজে কমপক্ষে ১০০টি গবেষণা প্রকাশিত হলেই কেবল এই র‌্যাংকিংয়ে বিবেচনা করা হয়। ২০২১ সালে সারা বিশ্ব থেকে ৭ হাজার ৫৫৩টি প্রতিষ্ঠান এই তালিকায় জায়গা পেয়েছে।

সিমাগো প্রকাশিত র‌্যাংকিং প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ৪ হাজার ১২৬টি বিশ্ববিদ্যালয় র‌্যাংকিংয়ের জন্য তালিকাভুক্ত হয়েছে। এই তালিকায় স্বাস্থ্য খাতের ১ হাজার ৩৮২টি, ১ হাজার ৫৮৭টি সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠা, ৩৪৪টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং ৯৭টি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ছিল সিমাগোর র‌্যাংকিং বিবেচনায়।

বাংলাদেশে সিমাগো র‌্যাংকিং ২০২১

১. বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়; ২. মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, টাঙ্গাইল; ৩. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; ৪. চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; ৫. বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়; ৬ খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়; ৭. বাংলাদেশে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়; ৮. জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়; ৯ বাংলাদেশ প্রযুক্তি ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট; ১০. শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট এবং ইনডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ (যৌথভাবে)।

এ ছাড়া ১১. রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। ১২. ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়। ১৩. চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, চুয়েট। ১৪. আহসানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। ১৫. ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি। ১৬. জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। ১৭. খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, কুয়েট। ১৮. ইসলামিক প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯. দ্য ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক ও রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, রুয়েট (যৌথভাবে)। ২০. ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ও ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ডুয়েট (যৌথভাবে)। ২১. ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি। ২২. ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি, চট্টগ্রাম। ২৩. নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি। ২৪. আমেরিকান ইন্টারন্যাশ ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ এবং ২৫. মিলিটারি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান

সিমাগোর প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে দেখা যায়, দক্ষিণ এশিয়ার শীর্ষ ১ হাজার ৪৩৭টি বিশ্ববিদ্যালয়কে এই র‌্যাংকিংয়ের জন্য বিবেচনায় আনা হয়। এর মধ্যে শীর্ষ ২৫০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় বাংলাদেশ থেকে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ও স্থান পায়নি। তবে এই তালিকায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ২৮২তম, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, টাঙ্গাইল ২৮৮তম এবং ২৮৯তম স্থানে রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

(ঢাকাটাইমস/৫মে/মোআ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :